বোস সাহেব হঠাৎ বলে, প্রসাদ খুব ভুল বলেনি। আপনাকে আজকাল একটু বেশিই বিষ দেখায়। সামথিং পার্সোনাল? সেই আপনার ভগ্নিপতির নিরুদ্দেশ হওয়ার ব্যাপারটাই কী?
শুধু তা নয়। আসলে পৃথিবীটা আমি যেমন চাই, পৃথিবীটা তেমন নয়।
এ কথায় বোস হেসে উঠতে পারত কিন্তু হাসল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, আপনি একটা পাহাড়ে চলে যাবেন বলে মাঝে মাঝে আমাদের শাসাতেন। এটা তারই প্রোলোগ নয় তো!
পাহাড়! বলতেই দীপনাথের সামনে মহাকায় সেই উত্তুঙ্গ শৃঙ্গের একটা ছায়া ভেসে ওঠে। হিম তুষারে ঢাকা, নির্জন, নিস্তব্ধ, প্রশান্ত। পৃথিবীতে তার কোনও তুলনা নেই। কোনওদিনই সেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছবে না সে। শুধু আমৃত্যু আরোহণ করবে। সঙ্গে খাবার থাকবে না, জল থাকবে না, জাগতিক কোনও উপকরণ থাকবে না। সানফ্লাওয়ারের একজিকিউটিভের পায়ের তলায় জমি নড়ে উঠল হঠাৎ। মাঝে মাঝে সে যখন ডাকে তখন সব দড়িদড়া ছিড়ে যেতে চায় যে!
দীপনাপ মাথা নেড়ে বলে, না। সেটা হয়তো একটা রোমান্টিক চিন্তা। কিন্তু আমি সুখী নই অন্য কারণে। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই অগভীর।
আপনি বরাবরই একটু ফিলজফার ধরনের। হাই থট। আই র্যাদার লাইক ইট। কিন্তু কথাটা হল, ফিলজফাররা জীবনে সুখী হয় খুব কমই। অবশ্য নন-ফিলজফাররাই যে সুখী হয় তাও নয়।
দীপনাথ একটু করুণভাবে হাসল। প্রসঙ্গটা পালটানোর জন্য একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, ইজ দি হোমফ্রন্ট ও-কে?
বোস একটু অপ্রতিভ হয়। তারপর মৃদু মাথা নেড়ে বলে, সো সো। নাথিং হ্যাপেন।
তার মানে?
তার মানে নাথিং। রিং-এর মধ্যে দু’জন বক্সার, দুজনেই ডেঞ্জারাস। ঘুরছে, ঘুরছে, পরস্পরের দিকে সতর্ক চোখ রাখছে, কিন্তু কেউ কাউকে হঠাৎ অ্যাটাক করতে সাহস পাচ্ছে না। দি অ্যাটমোসফিয়ার ইজ চার্জড উইথ হেট্রেড, ক্রুয়েলটি, রেজ, বাট দেয়ার অলসো ইজ এ ভ্যাকুয়াম অফ নো অ্যাকশন। এ লাল।
দীপনাথ একটু লজ্জা, সংকোচ আর ভয়ের সঙ্গে খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, নো সেক্স রিলেশন?
বোস সামান্য অবাক হয়। তবে মৃদু গলায় সহজভাবেই বলে, আই অ্যাম নো গুড ফর সেক্স নাউ। ডাক্তারের বারণ। ফিজিক্যালিও আমি আনফিট। তবে ফিট থাকলেও হয়তো সেক্স রিলেশন হত না। সেক্স তো শুধু শরীর নয়, অনেকটাই মন।
দীপনাথ মাথা নাড়ল, বুঝেছে।
বোস বলল, ড়ু ইউ থিংক উই শুড হ্যাভ সেক্স টাইম টু টাইম?
দীপনাথ একটু হাসল। তারপর বলল, দেয়ার ইজ এ পয়েন্ট টু পন্ডার। ইট মে হ্যাভ ইটস্ ইউজফুলনেস।
বোস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বুঝলাম। কিন্তু হাউ টু অ্যাপ্রোচ? শি মে রিফিউজ, শি মে ইনসাল্ট মি। বহুদিন আমাদের সম্পর্ক নেই। বহুদিন।
পরদার ওপাশ দিয়ে একটা সুগন্ধ হেঁটে গেল। দীপনাথ আর বোস চুপ করে যায়।
একটু বাদেই সুগন্ধটা ফিরে আসে। দাঁড়ায়। তারপর পরদা সরিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে আসে।
এতদিনে সময় হল?
দীপনাথ চোখ তোলে। কিন্তু ভাল করে তাকায় না। হঠাৎ তার চোখ দুটো আবছা হয়ে আসে।
একটু হাসবার চেষ্টা করে সে বলে, এত কী রাঁধছেন?
একজন বিগ একজিকিউটিভকে নেমন্তন্ন করলে তার উপযুক্ত আয়োজন তো করতে হয়।
আমি আজকাল খেতে পারি না।
একজিকিউটিভরা খায় নাকি? ফেলে দেয় তো। আর তারা ফেলে দিয়ে ধন্য করবে বলেই তো এত যত্ন করে রান্না।
দীপনাথ মৃদু একটু হেসে বলল, ফেলব কেন? এ বাড়িতে তো কোনওদিন পাত পেড়ে খাইনি। আজ চেটেপুটে খেয়ে যাব।
এ কথায় লুকনো ছিল চোরা মার। এ কথা! ঠিক, দীপনাথ এ বাড়িতে অনেক ডিনার দেখেছে, কিছু কিছু জোগানদারের কাজও করেছে একসময়। কিন্তু গরিব ও স্ট্যাটাসহীন দীপনাথকে বোস সাহেব ডিনারে ডাকার সাহস পায়নি কখনও।
হাসিখুশি হতে গিয়েও কেমন একটু ফ্যাকাসে হয় গেল মণিদীপা। কত লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে দীপনাথের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সে। এই তো সেদিন তার সঙ্গে দীপনাথকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিল বুনু। কী লজ্জা! কিন্তু আজ তার চেয়েও বেশি লজ্জা পায় মণিদীপা। সে মানুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।
বোস সাহেব তার গ্লাসের তলানি একটু হুইস্কি গলায় ঢেলে বলল, এটাকে ঠিক ফুল ফ্লেজেড ডিনার বলা চলে না। ইটস এ পার্সোনাল অ্যাফেয়ার। ডিনার হল সোশ্যাল মিট। বলে একটু হাসল বোস। বলল, আপনি বহুদূর চলে যাচ্ছেন। আজ চোখের জলে কিছু খাদ্যের সামনে বসে থাকা।
বোস এভাবে কথা বলে না কখনও। এই কথাটুকুর মধ্যে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না। গভীর ভালবাসা ছিল। তাই অস্বস্তিটা কেটে গেল আবহাওয়া থেকে।
দীপনাথ সহজভাবে বসে বলল, মণিদীপা, আপনি কি এখনও একজিকিউটিভদের ঘেন্না করেন?
আমি বর্ন-হেটার অফ একজিকিউটিভস।
ভালবাসা বা ঘেন্না দুটোই দীর্ঘদিনের অভ্যাসে রপ্ত হয়। কেউ ঘেন্না নিয়ে জন্মায় না। আপনাকে কেউ না কেউ ঘেন্না করতে শিখিয়েছে।
হবে।—বলে মণিদীপা মুখোমুখি বসে। পরনে মোটা তাঁতের শাড়ি এবং সেটারও খুব চিক্কণতা নেই, ভজ নেই। চুল এলোমেলো। মুখে ঘাম। আঁচলে মুখ মুছে বলল, কেউ হয়তো শিখিয়েছে।
কিন্তু একজিকিউটিভদের ঘেন্না করার কিছু নেই। বরং তারাই সবচেয়ে করুণার পাত্র। মালিকরা তাদের বেশি মাইনের লোভানি দিয়ে লেলিয়ে দেয় নিজেদের ইচ্ছাপুরণে। দে বিকাম ডগস অফ দি ক্যাপিটালিস্টস। তারা যে চাকর সেটা ভুলে গিয়ে কিছুদিন ভুল অভিনয় করে যায় মাত্র। লম্বা বেতন পায় ঠিক, কিন্তু মদে পার্টিতে স্ট্যাটাসের পেছনে এত উড়িয়ে দেয় বা দিতে হয় যে, শেষ পর্যন্ত দে বিকাম হ্যাভনটস। প্রলেতারিয়েতস। বিশ্বাস করেন?
