ইউ আর লাকি। সানফ্লাওয়ার যাকে নেয় তার জন্য বহুত করে। আমাদের কোম্পানির মতো হারামি নয়।
দীপনাথ একটু ক্ষীণ হেসে বলে, লাক ইজ এ রিলেটিভ টার্ম।
ওকথা কেন বলছেন? আর ইউ নট হ্যাপি দেয়ার?
দীপনাথ এবার আর-একটু বড় করে হাসে, হ্যাপিনেসও রিলেটিভ।
আপনাকে নিয়ে মশাই পারা যায় না, ক্রনিক পেসিমিস্ট। সেই আগেও দেখেছি শুকনো মুখ, এখন সানফ্লাওয়ারের একজিকিউটিভ বনে আমেরিকা পাড়ি দিচ্ছেন, তাও সেই শুকনো মুখ।
নিজের ভিতর হাসিখুশির অভাব দীপনাথও বড় বেশি টের পায়। সে হাসবার একটা চেষ্টা করে বলল, খুশি হওয়ার মতো কিছুই ঘটে না যে মিস্টার প্রসাদ।
কাট দ্যাট মিস্টার বিট। উই আর ফ্রেন্ডস তা খুশি হওয়ার মতো কিছু ঘটিয়েই ফেলুন।
কী ঘটাব? বিয়ে?
দূর, দূর, বিয়েটা কোনও ফেনোমেনন নয়। টেক এ গার্ল, টেক এ লং ড্রাইভ টু গোপালপুর অন সি অর ডালটনগঞ্জ, টেক টু স্কচ উইথ ইউ। দ্যাটস হ্যাপিনেস।
স্টিল রিলেটিভ।—দীপনাথ হাসিটা ধরে রাখল।
বোস একটু অস্বস্তি নিয়ে চেয়ে ছিল দীপনাথের দিকে। সম্ভবত, দীপনাথ কেন সুখী বা খুশি নয় তার রহস্যময় কার্যকারণটা ধরার চেষ্টা করছিল আজ। বলল, লিভ চ্যাটার্জি অ্যালোন। কিছু লোক আছে তারা কিছুতেই খুশি হয় না।
এই নিয়ে বোসের সঙ্গে প্রসাদের একটা ডিসকাশন শুরু হয়ে গেল। এখনকার মানুষের অসুখী হওয়ার কারণ নিয়ে।
দীপনাথ একটা হাই গোপন করল।
ককটেল শেষ হল আটটার মধ্যেই। সবাই বিদায় নেওয়ার পর বোস দরজা দিয়ে হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া ঘরটার টেবিলে আর মেঝেয় বোতল আর গ্লাস আর ভুক্তাবশিষ্টের পিরিচগুলোর দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল একটু। তারপর দীপনাথের দিকে চেয়ে একটু হেসে বলল, দি ককটেল ওয়াজ নট মাই আইডিয়া। আমি নিজে ড্রিংক খুব কমই করি আজকাল।
দীপনাথ একটু অবাক হয়ে বলে, তবে কার আইডিয়া?
ওদের। আপনার সঙ্গে ওরা নতুন করে ইনট্রোডিউসড হতে চেয়েছিল।
তার কারণ?
বিজনেস-ভালচারদের তো কারণ একটাই। দে ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট সানফ্লাওয়ার। সান-ফ্লাওয়ার মিনস বিগ বিজনেস, সানফ্লাওয়ার মিনস মাল্টিন্যাশনাল। ইউ হ্যাভ অলরেডি বিকাম অ্যান ইম্পর্ট্যান্ট ম্যান ইন সানফ্লাওয়ার। ওদের দুশ্চিন্তা, পাছে আপনি ওদের ভুলে যান। সো ইট ইজ নেসেসারি দ্যাট ইউ আর রিমাইন্ডেড অফ দেম অ্যাফ্রেশ। রিনিউয়াল অফ রিলেশনশিপ। যা খুশি ভেবে নিতে পারেন। তবে আজকের এইসব আয়োজনের টার্গেট ছিলেন আপনিই। বুঝতে পারেননি?
দীপনাথ সততার সঙ্গেই ঘাড় নেড়ে বললে, না।
ইউ আর স্টিল অ্যান ইনোসেন্ট গায়। শুনলাম আপনি এখনও সেই পুরনো মেসবাড়িতে আছেন! মেস নয়, বোর্ডিং।
তা হবে। আপনাদের বিগ বসের স্টেনোে মিহির চৌধুরীকে চেনেন তো! একই বাসে বোধহয় আপনার সঙ্গে অফিসে যায়। সে বলছিল, মিস্টার চ্যাটার্জি খুব বিচ্ছিরি একটা জয়েন্টে থাকেন।
দীপনাথ বলল, আছি তো মোটে আর কয়েকটা দিন। এ কদিনের জন্য আর ফ্ল্যাট নিয়ে কী হবে? বরং ফিরে এসে দেখা যাবে।
ফিরে এসেই তো আর ফ্ল্যাট পাবেন না। যদি বলেন তবে আপনার জন্য একটা ওনারশিপ ফ্ল্যাট বুক করে রাখতে পারি। আমার এক বন্ধু শঙ্কর লেক গার্ডেন্স-এ অনেক ফ্ল্যাট তৈরি করছে। বলব তাকে?
দীপনাথ জাগতিক বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে ভাবতে ভালবাসে না। একা মানুষ কোথাও পড়ে থাকলেই হয়। জবাব দিচ্ছিল না তাই। বোস বলল, কলকাতার হাউসিং প্রবলেমটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তার খোঁজ বোধহয় রাখেন না।
আমি একটা পুরো অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে কীই-বা করব! একা থাকলে রান্নাবান্নার ঝামেলা আছে। ফ্ল্যাট হলে আবার তার মেনটেনেন্স নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। ঘরদোর সাজাতেও হবে একটু। আমার যা জিনিসপত্র আছে তা দিয়ে একটা ছোট ঘরও ভরে না।
চিরকাল কি সমান যাবে?
আমার বোধহয় এমনিই কেটে যাবে।
ইউ আর নট বিয়িং প্র্যাকটিক্যাল। কলকাতায় কয়েক বছর আগেও ওনারশিপ ফ্ল্যাটের নামে লোক নাক সিঁটকোত। আজকাল একটা ফ্ল্যাট বুক করাই টাফ জব। বুক করে রাখুন। ফিরে এসে সোজা নিরাপদ নিজস্ব ফ্ল্যাটে ঢুকে যাবেন। সানফ্লাওয়ারের একজিকিউটিভ কেন থার্ড গ্রেড বোর্ডিং-এ থাকবে!
দীপনাথ একটু ভেবে বলল, আমি ভেবেছিলাম ফিরে এসে একটু ভাল কোনও বোর্ডিং-এ উঠব। বোর্ডিং-এ আর যা-ই হোক, লোনলি লাগে না। ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, ফ্ল্যাটটা বুক করাই যাক।
বোস খুশি হয়। বলে, উইথ এ গ্যারেজ।
ওঃ বাবা!
ডোন্ট ন্যাগ। ইউ ক্যান অ্যাফোর্ড এ কার নাউ। অফিস তো কার-অ্যালাউন্স দেবেই, অ্যাডভান্সও দেবে।
দীপনাথ কিছু বলল না। বোস সাহেব তার ভালই চায় বোধহয়। এখনও চায়। মণিদীপার সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়ার সেই পাগলাটে চেষ্টার পরও।
এতক্ষণ একবারও মণিদীপা দেখা দেয়নি। বহুকাল মণিদীপাকে দেখেনি দীপনাথ। বলতে নেই ওই পরস্ত্রীর জন্য এখনও বুকের মধ্যে এক ছোট্ট শূন্যতা রয়ে গেছে। কোনওদিনই সেই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। মেয়েমানুষের মধ্যে শাশ্বত কিছুই পাওয়ার নেই, দীপনাথ জানে। রোমিও-জুলিয়েট, লায়লা-মজনু এসব হল ইমোশনাল একসেস। অতিশয় বাড়াবাড়ি। নারীপ্রেম জীবনের কতটুকু? ভাবপ্রবণ পুরুষেরা ব্যাপারটাকে যতদূর সম্ভব ফঁপিয়ে ফুলিয়ে তুলেছে। তবে এও ঠিক, যাকে পাওয়া গেল না, যাকে পাওয়ার নয়, সেই মেয়েটির জন্য দীর্ঘকাল স্মৃতিগন্ধময় বেদনার মতো কিছু থেকে যায়। সেটা হয়তো সঠিক প্রেম নয়, বকলমে নিজের আহত পৌরুষ। পুরুষ যেটাকে দখল করতে পারে না সেটাকেই মহিমান্বিত করে তোলার চেষ্টা করে।
