শতমের হাত থেকে টেলিফোন নিয়ে বিলু বলে, সেজদা, তুমি কবে যাবে?
আর তো মোটে ছ’দিন সময়।
আমি তা হলে তোমার সঙ্গে যাব।
যাবি?
যাব না?
প্রীতমের কোনও খবর?
না, নেই।
ও। আচ্ছা তা হলে আমার সঙ্গে যাস।
রিজার্ভেশন কি তুমিই করবে?
হ্যাঁ। প্লেনে। তোর টিকিট আমি করে রাখব।
বাঁচলাম। ট্রেনে বাচ্চা নিয়ে একা যাওয়া যে কী ঝকমারি!
তা তোর বাচ্চাটা কেমন আছে?
ভাল। খুব পড়াশুনোয় মন হয়েছে।
গান শেখা, নাচ শেখা?
শিখছে।
শতমকে আবার টেলিফোনটা দে।
দিচ্ছি।
শতম ফোন ধরলে দীপনাথ চাপা গলায় বলে, হ্যাঁরে, কিছু টাকা দিতে পারি। নিবি?
না, তার দরকার নেই।
অনেক খরচ তো বিয়ের।
সে তো বটেই, কিন্তু হয়ে যাবে। আমি গোটা দুয়েক বড় পেমেন্ট পেয়েছি।
অসুবিধে হলে কিন্তু বলিস।
বলব।
আমার কাছে হার্ড ক্যাশ আছে। পাত্র কীরকম?
আপনি বোধহয় চেনেন।
কে বল তো?
আপনাদেরই বন্ধু। শিবেন চৌধুরি।
শিবেন! শিলিগুড়ির শিবেন নাকি?
হ্যাঁ। আগে ওঁরা শিলিগুড়িতেই থাকতেন।
খুব লম্বা? কালো?
হ্যাঁ, সেই।
দীপনাথ একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, প্রীতমের সঙ্গে গলাগলি ভাব ছিল। খুব ভাল ছেলে।
আপনি যাচ্ছেন তো?
যাচ্ছি।
৮১. পৃথিবীর রং অনেকটাই পালটে গেছে
পৃথিবীর রং অনেকটাই পালটে গেছে। এখনও বিবর্ণ নয়, তবে বহু গাঢ় রং এখন ফিকে হয়ে আসছে দীপনাথের চোখে। এ কি বয়সের দোষ?
বয়সও কম হল না। বোধহয় পঁয়ত্রিশের এপারে বা ওপারে। সঠিক হিসেব জানত মা বা পিসিমা। তারা কেউ নেই। তবু বয়সেরই সব দোষ হয়তো নয়। দোষ আছে জীবনযাপনেরও। এ কেমন এক নির্ভেজাল ঘটনাহীন জীবন বয়ে যাচ্ছে তার? কলকাতায় আজও তার সত্যিকারের বন্ধু হয়নি কেউ। তার কোনও আচ্ছা নেই, অবসর বিনোদন নেই। সে শুধু এক কোম্পানি থেকে আর এক কোম্পানিতে ব্যক্তিগত গুডউইল নিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে কাজ জানে, আর কিছু জানে না। বৈধভাবে কোনও মেয়ের প্রেমেও সে পড়েনি বহুকাল।
একমাত্র মণিদীপা, যাকে পাওয়ার নয় বা পেয়েও লাভ নেই। মণিদীপার দোরগোড়ায় অফিসের গাড়িটা থেকে নেমে সে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে নিজের দামি জুতোজোড়ার চাকচিক্যের দিকে চেয়ে নিজের অনুজ্জ্বলতার কথা ভাবল।
সে জানে, আজ তাকে অনুজ্জ্বল, ক্লান্ত এবং খানিকটা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। কিছু করার নেই।
ব্যালকনিতে কেউ ছিল না। কিন্তু ওপরে উঠে সে দেখে, বোস সাহেবের ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভিতরে বেশ গমগমে আড্ডা হচ্ছে।
দোরগোড়ায় একটু দ্বিধাভরে দাঁড়ায় দীপনাথ। কথা ছিল, আজ তার একার নিমন্ত্রণ। কিন্তু তাই কি? বোধহয় কথাটা রাখেনি বোস সাহেব। পার্টিতে গিয়ে গিয়ে দীপনাথের অভ্যেস হয়ে গেছে। ভালও লাগে না, মন্দও লাগে না। ওই একরকম। কিন্তু বোসের বাসায় আজকের নিমন্ত্রণটা একটু অন্যরকম হতে পারত।
দরজার এপাশ থেকেই অ্যালকোহলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। কাচের সঙ্গে কাচের শব্দ।
বোস উচ্চৈঃস্বরে বলল, কাম ইন! কাম ইন! ইটস ইয়োর শো। আসুন দীপনাথবাবু। জয়েন দি ক্রাউড।
ভিতরে যারা বসে আছে তারা প্রায় সবাই দীপনাথের চেনা বা আধা-চেনা। একজন বোসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মুরলী। অনন্যরা অন্য সব মেজো সেজো কোম্পানির রাঘববোয়াল। মোট জনা দশেক। মৃদু স্বরে প্রায় সবাই দীপনাথকে স্বাগত জানায়।
বোসকে যতটা মাতাল ভেবেছিল, ততটা নয়। পাশে বসতেই বুঝল। বোস মৃদু স্বরে জানিয়ে দিল, এটা ককটেল মাত্র। ডিনারে কেউ থাকবে না।
দীপনাথের দিকে একটা গ্লাস এগিয়ে আসে। ইদানীং দীপনাথ মদ খায় কালেভদ্রে। খেতে খেতে অধিকাংশ লোকেরই স্পৃহা বাড়ে। দীপনাথের হয়েছে ঠিক উলটো। মদ খেলে তার ভারী মাথা ধরে। মন ভার হয়, সব দুঃখের স্মৃতি এসে ঘিরে ধরে তাকে, চারিদিকটা ভারী বিমর্ষ হয়ে যায়।
ভদ্রতাবশে দীপনাথ গ্লাসটা হাতে নেয় মাত্র। তারপর এক ফাঁকে রেখে দেয়। কেউ তেমন লক্ষ করে না অবশ্য। অফিস নিয়ে তুলকালাম কূটকচালি গল্প হচ্ছে, এসব ককটেল মিট-এ যা সাধারণত হয়ে থাকে।
কাশ্মীরা এক্সপোর্টের গোস্বামী জিজ্ঞেস করল, আপনার গাড্ডাটি তো বিগ বিজনেস। সোমানি আছে না অ্যাকাউন্টসে?
দীপনাথ মাথা নাড়ল শুধু।
গোস্বামী বলল,সোমানি কৃষ্ণমূর্তিকে লাথি মেরে উঠে গেল কী করে জানেন?
দীপনাথ মৃদু হাসল শুধু। তারপর শুনে যেতে লাগল। কোম্পানির ক্লেদ, কলঙ্ক, গুপ্ত সব পাপের কথা। অবশ্য কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। বাইরে ভাল ঢাকনা দেওয়া কোম্পানিগুলির ভিতরকার ঘা পাঁচড়া সে বহুকাল ধরে দেখে আসছে। তার অবাধ্য চোখ খুব সাবধানে, গোপনে মণিদীপাকে খুঁজছিল। কান সতর্ক। মনে হল, রান্নাঘর থেকে একবার মৃদু কণ্ঠস্বরটি শোনা গেল, দইটা ভাল করে ঘোঁটা হয়নি সতীশ, গ্রেভিতে দইয়ের টুকরো ভেসে থাকবে। এঁটে দাও।
একটু হাসল দীপনাথ। মণিদীপা রাঁধছে! সত্যিই রাঁধছে! সে এতটা আশা করেনি।
সাধারণত এসব ককটেল-মিলন ভারী একঘেয়ে আর বিরক্তিকর। বোস সাহেবের চামচা থাকাকালীন দীপনাথ বিস্তর ককটেল অ্যাটেন্ড করেছে। তখন সে এদের সমকক্ষ ছিল না, তাই তখন এদের সব কথা আর কূটকচালিকে ইম্পর্ট্যান্ট ভেবে হাঁ করে গিলত। আজ দীপনাথ এদের সমকক্ষ তো বটেই, বরং অনেকের চেয়ে তার পজিশন এবং বেতন ভাল।
লরেল-অশোক ভারী স্প্রিং তৈরিতে অগ্রণী কোম্পানি। তার টেকনিক্যাল ম্যানেজাব প্রসাদ জিজ্ঞেস করল, স্টেটসে আপনার ক’দিনের প্রোগ্রাম?
ছ’মাস আপাতত। তবে আরও বেশিদিন থাকতে হতে পারে।
