মা-বাবা আছে?
মা আছে।
ভাইবোন?
অনেকগুলি। চারজন বিয়ের যুগ্যি মেয়ে রেখে বাবা মারা যান। শিবেনদা চাকরি করে বোনেদের বিয়ে দিয়েছেন। তিনটি ভাইও ভাল চাকরি করছে এখন।
ঘরবাড়ি?
কোন্নগরে বাড়ি করেছে ইদানীং।
ছবিকে কোথায় রাখবে?
অতশত জানি না। জিজ্ঞেস করিনি।
নামটা কী বললে? শিবেন?
হ্যাঁ।
বড্ড পুরনো নাম। অবশ্য নামে কীই-বা এসে যায়! ছবি খুশি?
খুশি হওয়ার মতো মনের অবস্থা নয়। মা-বাবা এখন-তখন, দাদা নিরুদ্দেশ, এই অবস্থায় আর কতটা খুশি হওয়া যায় বলো? বিয়েই করতে রাজি হচ্ছিল না। ওকে রাজি করাতেই বিস্তর ধকল গেছে।
বিয়ে না হলেই বা কী করত?
ওর ধারণা বিয়ে হয়ে গেলে আমাদের আর দেখার কেউ থাকবে না।
বিলু মৃদু স্বরে বলল, কথাটা তো মিথ্যে নয়। বাড়িতে আর মেয়েমানুষ বলতে কে রইল বলো!
শতম মাথা নেড়ে বলে, ওসব ভাবলে চলবে কেন? ছবি না থাকলেও দেখো আমরা ঠিক চালিয়ে নেব।
কী ভাবে নেবে? দুই ভাই বাইরে, তুমিও মাঝে মাঝে বেরোও, মা বাবাকে দেখবে কে?
লোক রাখব।
লোক পাওয়াই কি সোজা! এখন ববং সংসারের দিকে তাকিয়ে ছবির পর তোমারও একটা বিয়ে করা উচিত।
আমার বিয়ে!—বলে খুব হোঃ হোঃ করে হাসে শতম।
সেই হাসি শুনে অচলার চা চলকে গেল। এক ফাঁকে সে শতমের জন্য এক কাপ চা করে নিয়ে আসছিল।
প্লেটের চা-টুকু বেসিনে ঢেলে অচলা কাপটা এনে শতমের হাতে দেয়। বলে, আপনি কড়া লিকার পছন্দ করেন। তাই দিয়েছি।
শতম চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলে, বাঃ।
অট্টহাসির রেশটা তখনও তার স্মিতমুখে লেগে আছে। সে নিজের কবজির ঘড়িটার দিকে চেয়ে বলল, তোমার তো আজ অফিসের দেরিই হয়ে যাবে দেখছি। তো এক কাজ করো না!
কী কাজ?
আজ কামাই দাও।
দিয়ে?
ছবির নেকলেস আর বেনারসিটা এখান থেকে কিনে নিয়ে যাব ভাবছিলাম। দু’জনে মিলে চলো জিনিস দুটো কিনে ফেলি।
এক কথায় উজ্জ্বল হল বিলু। শাড়ি বা গয়না কেনার ব্যাপারে কোন মেয়েই বা খুশি না হয়? সে উঠে বেসিনে মুখ ধুয়ে বলল, শিগগির স্নান করে দুটো খেয়ে নাও আগে।
তা হলে কামাই করছ?
করছি। কিন্তু বিয়ে কবে সেটা তো বললে না?
সেটা বলতেই আসা। চিঠি দিলে সময়মতো পেতে না হয়তো। বিয়ের আর ঠিক ছ’দিন বাকি।
এত তাড়া?
তাড়া পাত্রপক্ষেরই। শিবেনদার এক বোন আমেরিকায় থাকে। সে ছুটি কাটাতে এসেছে। যাওয়ার সময় হয়ে এল। সে দাদার বিয়ে দিয়েই রওনা হবে। শ্রাবণের পঁচিশ তারিখের পর আর দিনও নেই।
আমেরিকার কথায় বিলুর মুখটা ম্লান হল, সেজদা আমেরিকায় যাচ্ছে জানো?
দীপুদা?
হ্যাঁ। অফিসের কাজে। সেজদা না থাকলে কী যে একা লাগবে আমার। আর তো বাপের বাড়ির কেউ খোঁজ নেয় না সেজদা ছাড়া।
দীপুদা একটা দারুণ চাকরি পেয়েছে শুনলাম।
হ্যাঁ। চার হাজার টাকা মাইনে।
বলো কী! ভাল মানে এত ভাল তা তো জানতাম না!
চাকরি তো ভাল কিন্তু কার জন্য? বিয়ের কথা বললেই রেগে যায়।
সেই যে কী একটা কেস হয়েছিল সেটা মিটে গেছে?
ও বাবা, কে জিজ্ঞেস করবে? যা সিরিয়াস মানুষ।
কেসটা কী?
আগের কোম্পানির বসের বউয়ের সঙ্গে জড়িয়ে একটা কথা রটেছিল। আমার মনে হয় সেটা তেমন বেশিদূর গড়ায়নি। সেজদা তো ভীশ মরালিস্ট।
দীপুদা ভীষণ মরালিস্ট আমি জানি। তাই ঘটনাটা শুনে বিশ্বাস হয়নি।
কিছু একটা হয়েছিল। তুমি স্নানে যাও তো!
জামা-কাপড় পালটাতে পালটাতে শতম জিজ্ঞেস করে, তুমি কবে রওনা হবে বলো তো?
দেখি। কালই ছুটির অ্যাপ্লিকেশন দেব।
কিন্তু ট্রেনের রিজার্ভেশন কি এত অল্প সময়ে পাবে?
পেয়ে যাব। নইলে প্লেন তো আছেই। ছবির বিয়েতে যেতে তো হবেই।
দীপুদাকেও নিয়ে যেতে হবে। আজই যাব একবার অফিসে। কোথায় বলো তো?
সানফ্লাওয়ার বোধহয় রাসেল স্ট্রিটে। ঠিক জানি না। খুব বড় কোম্পানি।
বিলু বউদিকে বহুকাল পর আবার খুব ভাল লাগল শতমের। কোনও মানুষই আগাপাশতলা নিষ্ঠুর বা খারাপ হতে পারে না। এই যে বউদি ছবির বিয়েতে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে এতেই ভারী খুশি শতম। শিলিগুড়ি থেকে আসার সময় বউদি খুব খারাপ ব্যবহার করে এসেছিল। সেই মনোভাবটা কেটে গেছে।
শতম স্নান করল, খেল। তারপর পোশাক পরে বউদির সঙ্গে যখন বেরোল তখন মেঘলা কেটে রোদ উঠেছে।
বিলু বলল, কাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। আজ তোমার ভাগ্যে রোদ উঠল।
শতম হাসল, হ্যাঁ, আমাদের ভাগ্য কত ভাল তা তোতা জানোই!
দুপুরবেলা কাজের খুব একটা চাপ ছিল না আজ। বস্তুতপক্ষে লাঞ্চের পর নিজের আরামদায়ক চেয়ারখানায় গা ছেড়ে কয়েক মিনিটের জন্য চোখ বুজেছিল দীপনাথ। এমন সময় শতমের টেলিফোন এল।
ছবির বিয়ে শুনে ভীষণ তটস্থ হয়ে ওঠে সে, ছবির বিয়ে! তাই তো! এ তো আমারও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
সে জিজ্ঞেস করল, তুই কোথা থেকে ফোন করছিস?
গড়িয়াহাটা থেকে। সঙ্গে বউদিও আছে।
বিলু!—বলে হাঁফ ছাড়ল দীপনাথ। যাক তা হলে বিলু শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক এখনও চুকিয়ে ফেলেনি। সে বলল, আমাকে কিছু করতে হবে? বল তো।
না, না। আপনাকে শুধু একবার যেতে হবে।
যাব! ছুটি যে এখনও পাওনা হয়নি।
ট্যুর নিয়ে নিন না!
দূর পাগলা। টুর নেওয়া যেত আগের কোম্পানিতে। এখানে ওরকম নিজের ইচ্ছেয় টুর নেওয়া যায় না।
তা হলে কী হবে? ছবির বিয়েতে আপনি যাবেন না? আমাদের দাদা নেই—
শেষ দিকটায় গলা কেঁপে বেঁধে গেল শতমের। কিন্তু দীপনাথকে পাগল করার পক্ষে ওইটুকুই যথেষ্ট। সে চাপা ক্রুদ্ধ গলায় ধমক দিল, দূর বোকা। যাব না কী রে? ছবির বিয়েতে যাবই। ভাবিস না।
