বুলু আর শমিতা কাল চলে যাবে। তার আগে যেন এ বাড়িতে না আসে, খবর পাঠিয়ে দিয়ে।
দেব।
সিগারেট খায় নাকি?
তাই তো দেখছি।
একটা টুকরো কুড়িয়ে পেলাম কার্নিশের ধারে।
আমিও পেয়েছি।
এ কথার পর দুজনেই পরস্পরের দিকে চেয়ে হেসে ফেলে।
দীপনাথ হাসতে হাসতেই ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়ে বলে, আজকালকার ছেলে। যা-ই হোক, ওকে বোলো এই বয়সে সিগারেট ধরলে আর বক্সার বা কুংফু মাস্টার হওয়ার আশা নেই। এ কথাটা বললে কাজ হবে।
তৃষা বলল, তার চেয়ে বেশি কাজ হবে বড়কাকা বারণ করে গেছে বললে।
তবে তা-ই বোলো।
তৃষা আচমকাই বলে, আমেরিকা কবে যাচ্ছ?
খুব শিগগির। হয়তো সামনের মাসে।
ছ’ মাস থাকবে?
তাই কথা আছে। তবে বেশি দিনও থাকতে হতে পারে।
চিরদিনের জন্য থেকে যাবে না তো?
থাকলে দোষ কী? আমার তো পিছুটান নেই।
তোমার নেই জানি। তোমার মায়া-মমতাও বড় কম। কিন্তু আমাদের তো তা নয়। তুমি গেলে আমার মনটা ভারী খারাপ হবে।
জানি বউদি।–বলে দীপনাথ হঠাৎ একদম চুপ হয়ে গেল।
মাঝরাতে সোমনাথের ঘরে আবার হানা দিল ভূত।
মাথা গরম ছিল বলে সোমনাথের ঘুম গাঢ় হচ্ছিল না। মাঝে মাঝে জেগে উঠে জল আর সিগারেট ধরায়। আবার খানিকক্ষণ ঝিমুনির মতো আসে। তৃষার অন্যান্য বিষয়সম্পত্তি, শমিতার ভূত দেখা থেকে শুরু করে অতীতের সব স্মৃতি তাকে বড় জ্বালাচ্ছিল।
মাঝরাতে যখন বেশ লম্বা একটা ঝিমুনি এসেছে তখনই সে মৃদু ডাক শুনল, বুলু! এই বুলু!
চটকা ভেঙে চাইল সে। অবিকল বড়দার গলার স্বর। অবিকল। শিয়রের জানালায় শেষ রাতের একটু অবশিষ্ট জ্যোৎস্না ছিল। চোখ গেল সেদিকেই।
পাঞ্জাবি পরা বড়দা দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা ছাইয়ের মতো সাদা।
সোমনাথ কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেল ভয়ে। এমনকী চোখের পাতাটা পর্যন্ত ফেলতে পারল না। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
বড়দা বলল, দাবি ছাড়িস না। এই সম্পত্তিতে তোরও অধিকার।
ব্যস, তারপরই বড়দা মিলিয়ে গেল জ্যোৎস্নায়।
যখন মিনিট দশেক পর সে শমিতাকে ডেকে তুলল তখন তার কথাবার্তা অসংলগ্ন। চোখ অস্বাভাবিক।
স্বামী-স্ত্রী বাকি রাতটা আর ঘুমোল না। বাতি জ্বেলে পরস্পর গা ঘেঁষে বসে রইল।
সোমনাথ বলল, বড়দা আজ আমাদের দু’জনকেই দেখা দিয়েছে!
শমিতা বড় অবাক এখনও। বলে, কেন বলো তো? আমার ভীষণ ভয় করছে।
বড়দা দাবি ছাড়তে বারণ করে গেল।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু এখন আমরা কী করব? দিদির হাতে যে অনেক গুন্ডা।
তা হোক। বড়দা যখন বলে গেছে তখন আমরা একনি না একদিন সম্পত্তি পাবই।
সকাল হতেই সোমনাথ সবিস্তারে রাতের ঘটনা জনে জনে রটিয়ে বেড়াতে থাকে। কিন্তু বলতে বলতেও সে বুঝতে পারে, কথাটা কেউ খুব একটা বিশ্বাস করছে না।
সকালের চায়ের আসরে ঘটনাটা শোনার পর দীপনাথ একটু হেসে বলল, বড়দা যে কেন তোদের দুজনকেই সম্পত্তির দাবি ছাড়তে বারণ করল সেটাই তো বুঝছি না। ভাইয়ের সম্পত্তিতে যদি ভাইয়ের দাবি থাকে তবে আমিও তো বাদ যাই না।
তোমার তো দরকার নেই সেজদা। তুমি চার হাজার টাকা মাইনে পাও।
মাইনের সঙ্গে দাবির কী সম্পর্ক তা বুঝল না দীপনাথ। তবে আড়ালে গিয়ে তৃষাকে বলল, সজলটা বড় বাড়াবাড়ি করছে। ওর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।
পরে বোলো। ওরা চলে যাক।
আমাকেও যে সকালের গাড়িতেই যেতে হবে। ছুটি নেই।
রবিবারেও কাজ?
আমাকে রবিবারেও যেতে হয়।
দেরি করে যেয়ো। আমি সকালে ওর কাছে গিয়েছিলাম। মুখে গুচ্ছের পাউডার মেখে সাদা করেছিল রাত্রে। সেই পাউডার তখনও লেগে আছে।
কী বলল?
কিছু না। কোনও জবাব দিল না।
ও কি সোমনাথকে তোমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিতে চায়?
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বোধ হয় তাই।
কেন বলো তো বউদি?
তৃষা এক অদ্ভুত ক্লান্ত চোখে দীপনাথের দিকে চেয়ে বলল, তোমাকে অনেকদিন আগেই তো বলেছি, আমার আপনজনেরা কেউই আমার বন্ধু নয়। তার মধ্যে ছেলেটা আরও বেশি শত্রু। আমি মরলে ও খুশি হয়।
দীপনাথ এ কথার জবাব দিল না। চেয়ে রইল।
আমেরিকা যাচ্ছ যাও। এসব নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমারই পাপের শাস্তি। একদিন হয়তো খবর পাবে, বউদি নেই।
সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছ বউদি।
না গো। আমি অত সহজে ভেসে যাই না। সহজে ভেসে যাবও না।
আমি সজলের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। বিন্দুদের বাড়ি কোন দিকে?
সঙ্গে তোক দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু গিয়ে লাভ হবে না। এতক্ষণে হয়তো বাসা থেকে বেরিয়েই গেছে।
সজলকে তুমি সামলাতে পারছ না, না বউদি?
না। এই একটি জায়গায় আমি হেরে যাচ্ছি।
ও একটু ওয়াইল্ড। কিন্তু ওর মধ্যে জিনিস আছে।
সে তোমরাই বুঝবে।
হি হ্যাজ পার্সোনালিটি।
হবে বোধহয়।
দীপনাথ একটু হাসল। আর কিছু বলল না। সাত-পাঁচ ভেবে সে বিন্দুদের বাড়িতেও হানা দিল। দুনিয়ার সব বিবাদই যে অশুভ এমন নয়। হঠাৎ তার মনে হল আজ, এই যে বউদির সঙ্গে সজলের অ-বনিবনা এর মধ্যেও একটা অস্তিবাচক কিছু আছে। একনায়কতন্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে যেমন শক্ত বিরোধীদের দরকার হয়, এও হয়তো তাই। তৃষার “পাপের শাস্তি” কথাটা সারাক্ষণ কানে লেগে আছে দীপনাথের। পাপ! কীরকম পাপ? পাপ বলতে কি মল্লিনাথের সঙ্গে সেই অবৈধ প্রণয়? সজল সেই প্রণয়ের মুর্তিমান জলজ্যান্ত প্রমাণ! আজ সজলের দিকে তাকালে, যারা মল্লিনাথকে চিনত তাদের আর কোনও সন্দেহ থাকবে না।
সেই পাপের একটু শাস্তি তো তৃষারও হওয়া দরকার। দীপনাথ তাই সজলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করল না। যা হচ্ছে হোক। হয়তো ভালই হবে তাতে।
