কয়েক দিনের মধ্যেই সোমনাথ একটা বেনামা চিঠি পেল: মহাশয়, আমি গোপনসূত্রে জানি মল্লিনাথ চট্টোপাধ্যায় তাহার সমুদয় সম্পত্তি তিন ভাইয়ের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করিয়া একটি উইল রাখিয়া গিয়াছেন। শ্রীনাথবাবুর স্ত্রী-র সিন্দুকে সেই উইল লুকানো আছে। তিনি একটি জাল উইল দ্বারা সম্পত্তি দখল করিয়াছেন। মল্লিনাথবাবুর প্রেতাত্মা আপনাকে যে দেখা দিয়াছিলেন তাহা আমরা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি…ইত্যাদি।
সেই চিঠি নিয়ে সেদিনই সোমনাথ হাজির হল দীপনাথের অফিসে।
দেখো সেজদা, কী বলেছিলাম!
দীপনাথ ভ্রু কুঁচকে চিঠিটা পড়ল। বুঝল, ঘটনা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আদালতে এই চিঠি বা ভূতের গল্প টিকবে না বটে, কিন্তু লোভী সোমনাথ বিস্তর ঝামেলা পাকাবে। তার ফলে সোমনাথই নিঃস্ব হয়ে যাবে, হেরে যাবে। তৃষারও শান্তি থাকবে না। সজল এ কেমন প্রতিশোধ নিচ্ছে?
দীপনাথের গলা ধরে গেল দুঃখে, হতাশায়। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তার। তবু খুব দীন আন্তরিকতায় সে বলল, বুলু, ওসব ভুলে যা…। সম্পত্তির লোভে হুট করে কিছু করে বসিস না। তোর ক্ষতি হবে।
সোমনাথ গম্ভীর মুখে খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, মামলায় অনেক টাকা চলে গেছে। আবার মামলা জিইয়ে তোলার মতো টাকাও আমার নেই।
মামলা করিস না বুলু। শেষ হয়ে যাবি।
এত বড় অন্যায় মেনে নেব?
মেনেই নে৷ ওই সম্পত্তি তুই রোজগার করিসনি। দুঃখের কী?
সোমনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বলল, সেজদা, কেন যে বরাবর তুমি বউদির পক্ষ নাও তা কিছুতেই আমার মাথায় ঢোকে না। লোকে বলে বউদি মারণ উচাটন বশীকরণ জানে। তোমাকে কি বউদি বশীকরণই করেছে?
দীপনাথ করুণ চোখে এই স্বার্থে অন্ধ ভাইটির দিকে চেয়ে রইল। তাদের জন্মসূত্র এক, তবু তারা কত আলাদা রকমের! সোমনাথের মতো সেও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সোমনাথ চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কাজে মন দিতে পারল না সে। অনেকক্ষণ বসে বসে সে শ্রীনাথ, সোমনাথ আর বিলুর কথা ভাবল। একজন পাগল, একজন স্বার্থপর আর একজন দ্বিচারিণী। এদের পাশে নিজেকেও দাঁড় করাল সে। নিজেও কি সে ভাল? বীথির কথা মনে নেই? সুতরাং তার তিন ভাই-বোনের পাশে নিজেকেও দিব্যি মানিয়ে যেতে দেখল সে।
বহুদিন এত ভার হয়নি মন। আজ বিষণ্ণতার বাতাসে ভরে গেল তার পৃথিবী। এই কুৎসিত পৃথিবী থেকে যদি প্রীতম বিদায় নিয়ে থাকে তবে ভালই করেছে। এখানে তোকে মানাত না প্রীতম। একদম মানাত না।
পাশপোের্ট ভিসা প্লেনের টিকিট সবই তার হাতে এসে গেছে। ভেবেছিল রওনা দেওয়ার তারিখটা দিন সাতেক পিছিয়ে দেবে। একবার শিলিগুড়ি ঘুরে আসবে। কিন্তু আজ সে মত পরিবর্তন করল। তারিখ পিছানোর কোনও মানেই হয় না। বরং যত তাড়াতাড়ি পালানো যায় ততই ভাল। আর কখনও এ দেশে ফিরে আসতে না হলে আরও ভাল।
লাঞ্চের পর বোস সাহেবের ফোন এল।
চ্যাটার্জি, কবে ফ্লাইট?
তেরো।
আনলাকি ডেট। শুনুন, হাউ অ্যাবাউট এ ফেয়ারওয়েল ডিনার? সময় করতে পারবেন?
কবে?
আজ বললে আজই। আমার বাসায়।
বাসায়?
হ্যাঁ। দীপা নিজে রাঁধবে।
উনি রাঁধতে জানেন?
বোস খুব হাসল হোঃ হোঃ করে। বলল, জানে। তবে ভয় পাচ্ছে, আপনি বামুন হয়ে কায়েতের হাতে খাবেন কি না!
আগে খাইনি নাকি?
ওর রান্না তো খাননি!
আপনি খেয়েছেন?
আমি! ও আগে তো রাঁধত। খেয়েছি। কেন বলুন তো?
না, জিজ্ঞেস করছিলাম, ওর রান্না খাওয়া যায় তো?
দাঁড়ান ওকে গিয়ে বলব।
রক্ষে করুন।
তবে কি আজ আসবেন? আপনি গ্রিন সিগন্যাল দিলে আমি ওকে টেলিফোন করব। শি উইল অ্যারেঞ্জ।
আজ থাক। কাল হবে।
ওকে।
বোস সাহেব, আপনার গলা শুনে মনে হচ্ছে শরীর এখন বেশ ভাল আছে।
আছে। একজন যোগীর কাছে আসন করা শিখছি।
কাজকর্ম কেমন চলছে?
কম্প্যানি লিকুইডেশনে যায়নি এখনও। ভাল কথা, সানফ্লাওয়ারে আপনার কাজকর্মের খুব সুখ্যাতি হয়েছে শুনলাম।
কে বলল?
বাতাসে শোনা যায়। আই অ্যাম প্লিজড।
ধন্যবাদ।
সুখ্যাতি আপনার পাওনাই ছিল। দেন টিল টুমরো।
টিল টুমরো।
ফোন রেখে দেয় দীপনাথ। এবং হঠাৎ টের পায়, পৃথিবী থেকে বিষণ্ণতার বাতাস বিদায় নিয়েছে। চারদিকে যেন অজস্র আলো, প্রজাপতি, সুগন্ধ।
কাল মণিদীপার সঙ্গে দেখা হবে। কাল মণিদীপার সঙ্গে দেখা হবে। কাল মণিদীপার সঙ্গে…
৮০. ঘুম থেকে উঠে বিলুর হাতে
ঘুম থেকে উঠে বিলুর হাতে বড় একটা সময় থাকে না। লাবু সকালে স্কুলে চলে যায়। অখণ্ড অবসর পেয়ে বিলু দ্বিতীয় দফা ঘুমিয়ে পড়ে। যখন ওঠে তখন আটটা সাড়ে আটটা। তাই তখন খুব তাড়াহুড়ো করে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নেয় সে।
বলতে কী এই সকালের অতিরিক্ত ঘুম, মুক্ত বিহঙ্গের মতো অফিসে বেরিয়ে পড়া, চাকরি— এই সবটাই তার কাছে ভারী উপভোগ্য। ভারী স্বাধীন, একলাএকলি জীবন। দায়-দায়িত্ব উদ্বেগ দুশ্চিন্তা বা কারও ভার বওয়া নেই। ফুরফুরে হালকা দিন কাটানো। বলতে নেই, তার অঢেল যৌবন আছে এখনও। ইদানীং তার শরীর একটু ফিরেছেও। ঢলঢলে লাবণ্য এসেছে রুক্ষ মুখটায়।
আজ সকালে স্নান সেরে এসে চুল আঁচড়ানোর সময় সে আয়নায় নিজেকে দেখছিল। নিজেকে দেখে আজকাল সে নিজেই মুগ্ধ হয়। আজেবাজে সিঁদুর দেওয়ায় সিঁথিতে চুলকুনি থেকে ঘা হয়েছিল। সেই থেকে সিঁদুরের বদলে একটু কুমকুম দিত সে সিঁথিতে। আজকাল সামান্য লিপস্টিক ঘেঁয়ায় মাত্র। আসলে তো সবটাই কুসংস্কার এবং অন্ধ বিশ্বাস।
