মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই চোখ খুলল শমিতা। তবে চোখের দৃষ্টি বোবা, শূন্য। প্রকৃত চেতনা ফিরতে আরও অনেকটা সময় নিল সে।
সোমনাথ যত আস্তেই বলুক তার কথাগুলো কানে গেছে তৃষার। তার মুখ থমথমে। শমিতাকে প্রথম প্রশ্ন করল সে-ই, কাকে দেখেছিলি বল তো ছুটকি ঠিক করে? কী হয়েছিল?
শমিতা একটু শিউরে উঠে চোখ বুজল। তারপর চোখ খুলে বলল, নতুন বাড়ির আলসেয় বড়দা দাঁড়িয়েছিলেন।
বড়দা?
পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। খুব লম্বা-চওড়া। বাবরি চুল।
স্পষ্ট দেখলি?
একদম স্পষ্ট।
তৃষা কাউকে কিছু বলল না। নিঃশব্দে গিয়ে নিজের বড় টর্চটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
নতুন বাড়ির ভিতরে পাতলা অন্ধকার। তৃষা টর্চটা জ্বালল না। নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। এ বাড়িতে এতকাল থেকেও সে কোনওদিন মল্লিনাথের ভূতকে দেখেনি। শমিতা ভাগ্যবতী, তাই দেখেছে, তবে ভূত নয়।
ছাদ পর্যন্ত উঠতে দমে টান পড়ল তৃষার, সিঁড়ির চাতালে দাঁড়িয়ে একটু দম নিল সে। ছাদের একধারে জলের ট্যাংক সদ্য বসানো হয়েছে। বেশ বড় ট্যাংক।
তৃষা নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। তবে বুকটা সামান্য দুরদুর করে। সে তো জানে কে আছে আড়ালে। এই পৃথিবীতে একমাত্র একজনেরই মুখোমুখি হতে সে অস্বস্তি বোধ করে।
ডাকতে হল না। তৃষার নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পেয়েই জ্যোৎস্নায় অকপটে বেরিয়ে এসে ভূতটা দাঁড়ায়। জ্যোৎস্নাতে তাকে আজ মল্লিনাথ বলে ভুল করতে ইচ্ছে হল তুষারও।
তৃষা কিছু বলার আগেই সজল বলল, আমি কী করে জানব যে কাকিমা ওরকম ভয় পাবে?
তুই এখানে কী করছিলি?
হাওয়া খাচ্ছিলাম।
তৃষা জ্যোৎস্নায় তার সামনের বিভ্রমের দিকে চেয়েছিল। মল্লিনাথ যেন রূপ ধরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে মা, তবু তার চোখেও ধাঁধা লেগে যায়।
তৃষা একটু তেতো গলায় বলে, তোর হঠাৎ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরার শখ হল কেন?
বাঃ, এখন লম্বা হয়েছি না! হাফপ্যান্ট পরলে সবাই খ্যাপায়।
কথাটা ঠিক।
তৃষা মৃদু স্বরে বলল, আস্তে করে নেমে যা। সকলের চোখের সামনে যাওয়ার দরকার নেই। বিন্দুদের বাসায় গিয়ে পোশাক পালটে শুয়ে থাক।
সজল একটু মাথা উঁচু করে তেজি গলায় বলল, লুকোচুরির কী আছে? আমি তো কোনও খারাপ কাজ করিনি।
তৃষা তেতো গলায় বলে, খারাপ কাজ করিসনি তো কাকিমা যখন চেঁচিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল তখন নেমে গিয়ে ধরিসনি কেন?
আমি বুঝতে পারিনি যে, কাকিমা আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে। আমি বরং চেঁচামেচি শুনে চারদিকে ভূতটাকে খুঁজলাম!
কথাটা পুরো সত্যি নয়, তৃষা জানে। তবে সে তর্ক না করে শুধু বলল, তবু এখন লোকের সামনে যাওয়াই ভাল। সোমনাথের সন্দেহ, ছুটকিকে ইচ্ছে করে ভয় দেখানো হয়েছে।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছিল। কথার আওয়াজ। একাধিক লোক ছাদে তদন্ত করতে আসছে।
তৃষা ছেলের দিকে চেয়ে বলল, কী করবি?
বিরক্ত গলায় সজল বলে, যাচ্ছি।
তারপরই অত্যন্ত লঘু অভ্যস্ত হাতে-পায়ে সে ছাদের পিছন দিকের বাঁশের ভারা বেয়ে চোখের পলকে নেমে হাওয়া হয়ে গেল। তৃষা ন্যাড়া ছাদটার পাশে গিয়ে উঁকি মেরে নিশ্চিন্ত হয়। তারপর টর্চ জ্বেলে চারদিকে দু-তিনটে সিগারেটের অবশিষ্ট টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে ফেলে দেয়।
দীননাথ আর সোমনাথ ছাদে এসে দাঁড়ায়।
দীপনাথ বলে, সাহস বটে তোমার। এইমাত্র একজন ভূতের ভয় পেল যেখানে, সেখানে তুমি একা এলে কোন সাহসে?
তৃষা গম্ভীর মুখ করে বলে, আমরা তো গাঁয়ের লোক, অত ভয় থাকলে আমাদের চলে না।
সোমনাথ জিজ্ঞেস করে, কাউকে দেখলে?
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ছুটকিটা ভুল দেখেছে।
সোমনাথ একটু রাগের গলায় বলে, ভুল তো বটেই। তবে দেখেছে না দেখানো হয়েছে সেইটাই প্রশ্ন।
গত দুদিন ধরে সোমনাথ আর শমিতা এ বাড়িতে আছে বটে, কিন্তু তারা এখনও সজলকে দেখেনি, তৃষা জানে। পরীক্ষার পড়ার ক্ষতি হবে বলে শ্রাদ্ধের তিন-চারদিন আগেই সজল গিয়ে তার বন্ধু বিন্দুদের বাড়ি উঠেছে। সজল বেশি লোকজন সহ্য করতে পারে না। তাই ক’দিন বাড়িমুখো হয়নি। কী খেয়ালে আজ হঠাৎ যে চুপি চুপি এসে ছাদে উঠেছিল! সিগারেট খেতেই কি? ছোট্ট সজল যে খোলস ছেড়ে কতটা অন্য রকম হয়েছে তা দেখে তৃষাই চমকে যায়, শমিতা বা সোমনাথ তো যাবেই। কিন্তু সজলের কথাটা এখন ভাঙারও মানে হয় না।
তৃষা মৃদু স্বরে বলল, ছুটকিকে কে ভয় দেখাতে যাবে বলো তো? তুমি সব সময়ে অন্য রকম ভাবো কেন? স্বাভাবিক কিছু ভাবতে পারো না?
সোমনাথ তৃষার গলার স্বরে মৃদু ইস্পাতের স্পর্শ টের পেল ঠিকই। সেই মায়ের স্মৃতি সে ভুলে যায়নি। এখানে বউদির লোক তাকে মেরে পুঁতে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না। সোমনাথ সামলে গেল।
দীপনাথ চারদিকটা ঘুরে ঘুবে দেখছিল। হঠাৎ বলল, যেই হোক, এই সরু কার্নিশের ধারে তার দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই দুঃসাহসের কাজ।
কথাটার মানে সোমনাথ বুঝল না। তৃষা বুঝল।
দীপনাথ কী যেন একটা কুড়িয়ে নীচে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর বলল, না, কেউ ছিল বলে মনে হয় না। শমিতা উপপিস-টুপোস করে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভুলই দেখেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় নানা রকম দেখা যায়।
তিনজন নেমে এল আস্তে আস্তে।
সোমনাথ তার ঘরে চলে গেল। দীপনাথ একটু পিছিয়ে তৃষার দিকে চেয়ে একটু রাগের গলায় বলল, ওকে ওরকম কার্নিশের ধারে দাঁড়াতে বারণ কোরো। পড়ে গেলে কী হত?
তৃষা বলে, বারণ শোনে নাকি?
কোন বাড়িতে গিয়ে পালিয়ে আছে যেন?
বিন্দুদের বাড়ি। কাছেই।
