ছোট ভাই বুলু অনেক সুযোগ খোঁজার পর এই প্রায় রাত বারোটার কাছাকাছি সময়ে সুযোগ পেয়ে বলছিল, দাদার সম্পত্তি দাবি করে আমি হয়তো ঠিক কাজ করিনি। বউদির কাছে মাপ চাইতেও রাজি আছি। কিন্তু আমার অবস্থার কথা বিবেচনা করে যদি তোমরা সবাই মিলে একটা অংশ আমাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করে তা হলে আমার খুব উপকার হবে।
দীপনাথ এই ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। সে মাথা নেড়ে বলে, তোর যখন যা দরকার আমাদের কাছে বলিস। সাধ্য মতো মেটানোর চেষ্টা করব। কিন্তু দাদার সম্পত্তির অংশ চাস কেন? দাদা যাকে ভাল বুঝেছে তাকে দিয়ে গেছে। এর ওপর আমাদের কোনও দাবি খাটে না।
দাবি করছি না তো। আর সব সময়ে তোমাদের গিয়ে ডিস্টার্ব করাও কি ভাল? মানুষ বিরক্ত হয়, খুশিমনে দেয় না। সে মায়ের পেটের ভাই হলেই কী!
এসব কথায় শ্রীনাথ বা বিলু যোগ দিচ্ছে না। চুপ করে বসে আছে।
দীপনাথ জিজ্ঞেস করে, তুই কী চাস? তোরা তো অল্প বয়সের দুটি স্বামী-স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চাও নেই, এখনই তোর এত অভাব কেন?
অভাব হলে কী করব বলো? বড়দা বেঁচে থাকতে আমাকে একবার বলেছিল, তুই রতনপুরে এসে থাক। তখন বিয়ে করিনি! ভাবলাম, গায়ে এসে থাকার মানেই হয় না। কিন্তু যদি থাকতাম তা হলে এই গোটা বিষয়সম্পত্তি আমারই হত।
দীপনাথ জানে, মল্লিনাথ বোকা ছিল না। সে আর যাকেই হোক কিছুতেই বুলুকে এই সম্পত্তি লিখে দিয়ে যেত না। তবে কথাটা বলল না দীপনাথ। ঘুরিয়েই বলল, তা যখন দিয়ে যায়নি তখন নিজের ভাগ্যকে মেনে নেওয়াই তো পুরুষের কাজ।
বুলু তবু ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকে, আমি বেশি কিছু চাই না। বিঘে দশেক ধানি জমি, একটু বাজমি আর কয়েক হাজার টাকা। তা হলেই আমার হয়ে যাবে।
দীপনাথ একটু হেসে বলে, সেটাই কি এই বাজারে কিছু কম?
দাদার সম্পত্তির তুলনায় কিছুই নয়। এটুকু বউদি অনায়াসে ছাড়তে পারে।
দীপনাথ ধীরে ধীরে রেগে উঠছিল। সে হয়তো এ কথার একটা কড়া জবাব দিত। কিন্তু ঠিক এই সময়ে বাইরে একটা চেঁচামেচি শোনা গেল। সেই সঙ্গে খুব দৌড়োদৗড়ি।
পুরনো স্কুলবাড়ির দিকে তৃষা যে তিনতলা বাড়িটা তুলছে সেই দিকেই টর্চ আর লক্ষের আলো দেখা যাচ্ছে অনেক। খুব ভিড়ও।
পুরনো স্কুলবাড়ির কাছেই মল্লিনাথ একটা তিনতলা বাড়ির ভিত গেঁথে রেখেছিল। বাড়িটা করে যেতে পারেনি। প্ল্যান স্যাংশন করাই ছিল। ক্রমে সেটা আগাছায় ঢেকে যায় আর লোকে ভুলেও যায় সে কথা। ভোলেনি তৃষা। আচমকা সেই বন্যার পরই সে জঙ্গল সাফ করিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির কাজ শুরু করে দেয়। তিনতলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই হয়ে গেছে। এখন পলেস্তারা পড়বে, দরজা জানালা বসবে, মেঝেয় টালি পাতা হবে। অনেক কাজ বাকি। জ্যোৎস্নারাতে সেই অতিকায় অন্ধকার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে থাকে পোডড়া বাড়ির মতো।
পরশু এখানে আসার পর থেকেই এই অসমাপ্ত বাড়িটা সম্পর্কে অসীম কৌতূহল শমিতার। বহুবার সে এসে ঘুরঘুর করে বাড়িটা দেখে। প্রতি তলায় তিনখানা করে শোওয়ার ঘর, ডাইনিং, ড্রয়িং, দুটো করে বাথরুম। একদম কলকাতার বড়লোকদের ফ্ল্যাটবাড়ির মতো ব্যবস্থা। কত টাকা যে খরচ হচ্ছে!
নিতাই খ্যাপা আবার তার মধ্যেই ইন্ধন জুগিয়ে এক ফাঁকে চুপি চুপি বলে গেল, ওই বাড়ির ভিতের নীচেই যে মল্লিবাবুর মেলা টাকা পোঁতা ছিল। বউদিমণি মাটি খুঁড়ে টাকা বের করেছে।
খুব বিশ্বাস না হলেও শমিতা জিজ্ঞেস করল, কত টাকা?
পাঁচ লাখ শুনেছি। মস্ত কাঠের বাক্স ভরা।
হতেও পারে। জমির দাম না ধরলেও এত বড় একটা বাড়ি করতে যে অনেক টাকার দরকার তা শমিতা জানে। এত সুন্দর ডিজাইন, এত ভাল প্ল্যানিং-এর বাড়িও বড় একটা দেখা যায় না। কাজ শেষ হলে বাড়িটা দেখতে হবে স্বপ্নের মতো।
এ বাড়ির তারা দু’টি মাত্র বউ। এই সম্পত্তি তাদের কারও স্বামীই অর্জন করেনি। মুফতে সম্পত্তিটা হাতিয়ে নিয়েছে মেজো জন। শমিতার সারা গা জ্বলে যায়। মাটির নীচে থেকে যদি সত্যিই এত টাকা পেয়ে থাকে তবে সেটা আরও একটা জ্বলুনির কারণ।
কাজের বাড়ির ভিড় পাতলা হওয়ার পর আবার কৌতূহলবশে হাঁটতে হাঁটতে জ্যোৎস্নায় এই স্বপ্নের বাড়িটার কাছে চলে এসেছিল শমিতা। এই রকম একটা বাড়ি যদি তার হত।
জ্যোৎস্নায় ধোয়া বাড়িটার চারদিকে বালি, পাথরের স্তৃপ, ইটের পাঁজা, বাঁশ, কাঠ। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল সে।
এই সময় হঠাৎ সে দেখতে পেল, তিনতলার আলসের ওপর কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কে? খুবই স্পষ্ট জ্যোৎস্না পড়েছে তার মুখে। তার চেয়েও বড় কথা, লোকটা মস্ত লম্বা, বিশাল চওড়া। পরনে সাদা পাজামা, বড় ঝুলের পাঞ্জাবি, বাবরি চুল।
প্রথমে বোবা হয়ে গিয়েছিল শমিতা। তারপর এক বিকট বিকারের গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ভূত! ভূত! ভূত!
৭৯. শমিতা চিৎকার করেই অজ্ঞান
শমিতা চিৎকার করেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তোকজন যখন এসে তাকে তুলল, তখন দাঁতে দাঁত লেগে গেছে, দু’ হাতে শক্ত মুঠো, গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে গলা থেকে।
ভূত! ভূত! চিৎকারটা শুনেছিল অনেকেই। কিন্তু কী দেখে ভয় পেয়েছে তা কেউ বুঝতে পারছিল না।
চামচের উলটো দিক ঢুকিয়ে শমিতার দাঁত আলগা করে দিল বৃন্দা। গরম লোহার হ্যাঁকা দেওয়া নুন খাওয়ানো হল। জলের ঝাপটা চলছিলই।
সকলেই উদ্বিগ্ন। কিন্তু সোমনাথ ক্রুদ্ধ। সে বার বার সেজদার কাছে মৃদু স্বরে নালিশ করছে, কনসপিরেসি! ওকে কেউ ভয় দেখিয়েছে। আমি এর শোধ নেব সেজদা।
