কাঁদতে কাঁদতে হিক্কার মতো অদ্ভুত শব্দ করছিল শ্রীনাথ। মাঝে মাঝে বাবা, বাবা গো’ বলে আর্তনাদ। একবার মনে হল শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে বুঝি!
শমিতাকে খুব ভাল করে কখনও লক্ষ করেনি দীপনাথ। দেখাও হয়েছে কম। বেশ টান টান শ্যামলা।
এইরকম একটা সংকট সময়ে শমিতা একটা ছবি আঁকা টিনের ট্রে-তে চা নিয়ে এল। কিশোরী চেহারা। মুখটার মধ্যে শ্ৰী আছে বটে, তবে বড় রোখা-চোখা মনে হয়। বুদ্ধি রাখে কিন্তু হয়তো সবটাই সদ্ধি নয়। দীপনাথ শুনেছে এই মেয়েটাই নেপথ্যে থেকে সোমনাথকে পরিচালনা করে। মেয়েটির মুখচোখ দেখে কথাটা আবশ্বাস্য মনে হয় না। মেজোবউদির সঙ্গে এদের তুমুল আড়াআড়ি! কিন্তু দীপনাথ বুঝল, শমিতা যতই চালাক চতুর হোক, মেজোবউদির সঙ্গে পাল্লায় কিছুই নয়। বুদ্ধি ছাড়াও মেজোবউদিব আর যে জিনিসটা আছে তা হল প্রবল ব্যক্তিত্ব। তা শমিতা কোথায় পাবে?
শমিতা ভারী যত্নে চা হাতে তুলে দিল। মাথায় ঘোমটাটি ঠিক মতোই টানা। ট্রে-টা একটা টেবিলে রেখে আচলে মুখ ঢেকে একটু কাঁদল। এই কান্নাটাকে খুব ফাকি বলে মনে হল না দীপ্যাথের। বাবা তো এরই হেফাজতে ছিল বহু দিন! বেড়াল পুষলেও মায়া হয়, দীননাথের মতো ঝামেলাহীন সাদামাটা মানুষের ওপর মায়া পড়তেই পারে।
কিন্তু এই সব কান্নাকাটি আর সহ্য হচ্ছিল না দীপনাথের। সংসার থেকে দূরে সরে থাকায় এইসব শোকদুঃখের সঙ্গে তার বেশি পরিচয় নেই। ভারী অস্বস্তিকর! গরম চায়ে তাড়াতাড়ি চুমুক দিতে দিতে সে বলল, শমিতা, আমি স্নান করব। তোমাদের বাথরুমে জল আছে?
আছে। সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
আর কোরা কাপড় চাই। কাছাকাছি দোকান-টোকান থাকলে বুলু বরং গিয়ে কিনে আনুক। টাকা দিচ্ছি।
বুলু বলল, ঘরের কাছেই দোকান।
দীপনাথ একশো টাকার নোট বের করে দিয়ে বলল, কী কী লাগে জানি না! সব আনিস। আর বিলুকে খবর দেওয়া হয়েছে তো?
হয়েছে। বিলু আসে প্রায় রোজই।
শ্রাদ্ধ কোথায় হবে?
বুলু কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, আমার অবস্থা তো জানো। আমি কালীঘাটেই করব ভাবছিলাম।
আলাদা করবি?
বুলু একটু হতচকিত হয়ে অসহায় গলায় বলে, একসঙ্গে করার কথা কেউ তো বলেনি।
দীপনাথ একটু বিরক্ত হয়ে বলে, এই তো আমিই বলছি।
তুমি বলছ!–বলে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে বুলু।
শ্রীনাথ কান্না সামলে ধরা ভাঙা গলায় বলে, রতনপুবে যদি সবাই মিলে করি? বুলুর কি আপত্তি হবে?
বুলু ক্ষীণ একটু হাসির চেষ্টা করে বলে, তুমি বরং বউদির মতটা নাও। আমি গরিব মানুষ, তার ওপর তোমাদের ছোট, যা বলবে তাই করব।
অত লক্ষ্মী ছেলে অবশ্য বুলু নয়। তবু সে মত দেওয়ায় খুশি হল দীপনাথ। কিন্তু বুলু একটু চুপ করে থেকে আর-একটি যে কথা বলল তাতে খুশিটা কেটে গেল।
শমিতার দিকে একবার চেয়ে নরম গলাতেই বুলু বলল, রতনপুর তো আমাদের সকলেরই জায়গা। বাবারও খুব ইচ্ছে ছিল, সবাই মিলে সেখানে গিয়ে থাকি।
দীপনাথ গম্ভীর মুখে স্নান করতে গেল। ফিরে এসে ধড়া পড়ল। আসন পেতে বিছানায় বসল শ্রীনাথের পাশে। কিছুই আর করার নেই।
শমিতা এসে জিজ্ঞেস করে, সেজদা কি ভাত খেয়ে বেরিয়েছেন?
না। শুধু ব্রেকফাস্ট। দুপুরে অফিসেই লাঞ্চ খাওয়ার কথা।
তা হলে সকলের জন্যই হবিষ্যি চাপিয়ে দিই?
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলল, না। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
তা হলে ফল কেটে দিই?
পরে দিয়ো।
স্নান করে এলেন, এখন তা হলে একটু কফি খান।
দীপনাথের এত আপ্যায়ন ভাল লাগছিল না। উদাস গলায় বলল, দাও।
কফি খাওয়ার সময় বুলু কথাটা তুলা, সেজদা, তুমি তো একসঙ্গে কাজ করার কথা বললে। কিন্তু কার কী রকম শেয়ার হবে, কাজই বা কেমন করা হবে সেসব তো জানা দরকার। আমার
অবস্থা তো জানোই।
দীপনাঙ্গ খুবই বিরক্ত বোধ করল। কিন্তু নিজের ওপর তার শক্ত নিয়ন্ত্রণ আছে বলেই রাগ দেখাল না। শান্ত স্বরে বলল, বাবার খবরটা এইমাত্র পেয়েছি, এখনই ওসব কথা ভাবতে ভাল। লাগছে না। পরে বলিস। খরচের জন্য ভাবনা নেই। বাবার জন্য তো আমি তেমন কিছু করিনি।
এ কথায় বুলুর শোকাতুর মুখেও কিছু উজ্জ্বলতা ফুটল!
শমিতা বলল, সেজদা তো মেসে থাকেন। সেখানে এসব নিয়ম পালনের অসুবিধা। আমি বলি, এই ক’টা দিন আপনি এখানেই থাকুন।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলল, না। রতনপুরেই যদি বাবার কাজ করতে হয় তবে আমাদের সকলেরই রতনপুরে চলে যাওয়া দরকার আজই।
বুলু বলে, কিন্তু বউদির মতামত?
বউদি অমত করবে না। বরং খুশি হবে।
এ কথায় শমিতা বা বুলু খুব সন্তুষ্ট হল না। নিজেদের মধ্যে একটা তাকাতাকি করে চুপ করে রইল।
সংসারের এই সব পরম্পর-বিমুখ চোরাস্রোত থেকে সরে থাকবার জন্যই দীপনাথ সারাটা দুপুর পড়ে ঘুমুল। ঘুমটার খুবই দরকার ছিল তার।…
তার শ্রাদ্ধ যে এত ঘটা করে হবে তা বোধ হয় দীননাথ স্বপ্নেও ভাবেনি। দীপনাথ আর তৃষা মিলে খুব কম করেও হাজার দশেক টাকা খরচ করেছে। বুলু শ’ দুই টাকা দিতে চেয়েছিল, নেয়নি। বাচ্চা যাড় থেকে শুরু করে খাট বিছানা ছাতা লাঠি কিছুই বাদ রইল না দানসামগ্রীতে। অন্তত সাতশোলোক নিমন্ত্রিত ছিল। দীননাথের ভাগ্য ভালই যে, আজ বৃষ্টিও হয়নি। সন্ধের কিছু পরে ফুটফুটে জ্যোৎস্নাও উঠেছে।
অনেক রাতে ক্লান্ত তিন ভাই আর বিলু ভাবন-ঘরে বসেছে। বহুকাল বাদে চার ভাই-বোন এই এক হওয়া। বিলু স্বভাবতই গম্ভীর, অথবা গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু দীপনাথের মনে হয়, প্রীতম নিরুদ্দেশ হওয়ায় যতটা দুর্ভাবনা বা উদ্বেগ থাকার কথা ছিল বিলুর ততটা নেই। অফিস করছে, অরুণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলছে। শুধু লোকের সামনে একটা গাম্ভীর্যের মুখোশ এঁটে নেয় মাত্র।
