অ। তা হলে আপনি বর্ধমান নেমে হাওড়ার লোকাল ধরবেন তো? আমিও তাই। আমি যাব দাশপুরে। জামাইবাবু কী করে?
চাকরি।
সংক্ষেপে জবাব দেয় সরিৎ। খামোখা ভ্যাজর ভ্যাজর করতে ভাল লাগে না। বয়স্ক লোকরা বড় বেশি হাঁড়ির খবর নেয়। তবু এ লোকটা মলিনার বাবা বলেই জবাব দিয়ে যাচ্ছে সরিৎ।
দীনেন সাহা বলে, আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো হয়েছে তঁাদড়। কথাবার্তা শুনতে চায় না। দাশপুরে গিয়ে মালটা নিয়ে আসতে বাবুর কোনও অসুবিধেই ছিল না। তা বলে কী জানেন? ফাস্ট ক্লাসের ভাড়া চাই, আর কলকাতায় সাতদিন থাকার জন্য পাঁচশো টাকা হাতখরচা। শুনেছেন কখনও এমন তাজ্জব কথা! এই তো আমি ছ’ টাকায় ম্যানেজ করছি। শীল লেনে বোনের বাড়িতে থাকব। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ-ষাট টাকার বেশি খরচ নয়। মলিনের সঙ্গে দেখা হলে ওকে একটু বুঝিয়ে বলবেন তো, এভাবে চললে দুর্দিনের বাজারে পথে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
সরিৎ ঢুলছিল। তবু মনে মনে বলল, তোমার টাকায় মলিন একদিন পেচ্ছাপ করবে, শ্বশুরমশাই। তার চেয়ে আমাকে জামাই করো, সব দেখেশুনে রাখব। আজ মেলা বোকো না আর। গুড নাইট ফাদার-ইন-ল।
স্টেশন থেকে রতনপুর আধ মাইলের ওপর রাস্তা! রিকশা যায়। কিন্তু সরিৎ রিকশার কথা ভাবতেও পারে না।
স্টেশনের কাছে চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করে রাস্তাটা বুঝে নিয়ে হাঁটা দিল। মনের মধ্যে নানারকম হচ্ছে। সেজদি কেন ডেকে পাঠিয়েছে, কেমন ব্যবহার পাবে, আশেপাশে ফুটফুটে মেয়েরা আছে কি না, চাকরির সুবিধে হবে কি না, দিদিরা কতটা বড়লোক এইসব ভাবছিল।
রাস্তা ফুরিয়ে গেল কয়েক মুহূর্তে। বিশাল বাগান আর গাছে ঘেরা বাড়ির ফটকে ঢুকতেই খাউ খাউ করে তেড়ে এল একটা কুকুর। কুকুরের পিছনেই এক কাপালিক।
ভয় পেয়ে সরিৎ ফটকের বাইরে ফিরে এল আবার। গেটটা চেপে ধরল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে।
কাপালিকটা বলল, কাকে চাই?
শ্রীনাথ ব্যানার্জি।
এই বাড়ি। সোজা ভিতরে ঢুকে যান। কুকুর কিছু বলবে না।
খুব ভয়ে ভয়ে, দুশ্চিন্তায়, অনিশ্চয় এক মন নিয়ে সেজদির বাড়ির সীমানায় ঢুকল সরিৎ।
মুড়ি চিবোতে একদম উদাস লাগছে নিতাইয়ের। রোজ মুড়ি কি ভাল লাগে?
যতদিন জ্ঞান হয়েছে ততদিন থেকে এই এক মুড়িই দেখে আসছে সে। শুকনো খাও, ভিজিয়ে খাও। তরকারি বা তেল মেখে খাও। তাও যে বরাবর জুটেছে ঠিকঠাক তাও নয়। প্রায়ই তার মুড়িটায় ভাতটায় টান পড়েছে। টান পড়লেই আদর বাড়ে। দু’দিন ফাঁক গেল তো তিনদিনের দিন এক কেঁচড় মুড়ি পেলে মনে হয়, এর কাছে অমৃত কোথায় লাগে!
আজ তবু মুড়ি বড় উদাস লাগে।
নিতাইয়ের মন ভাল নেই। অমল নন্দী গুসকরায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে এসে কালই খবর দিয়েছে পুতুলরাণী ইয়া মোটাসোটা হয়েছে। দুটো ছেলেপুলের মা। অমল নন্দী নিতাইয়ের কথা তুলেছিল। তাতে নাকি পুতুলরাণী বলেছে, ওটা তো বদ্ধ উন্মাদ।
সে কারণে নয়। আসলে মন খারাপ তার বাণ বশীকরণে, মারণ উচাটনে কাজ হচ্ছে না বলে। প্রতিদিন যাকে মোক্ষম মোক্ষম বাণ মারা হচ্ছে সে মোটা হয় কী করে?
যে তান্ত্রিকটা শিখিয়েছিল সেটা আসলে চারশো বিশ। সব কিছুতেই যখন ভেজাল তখন তান্ত্রিকই বা ভেজাল হবে না কেন?
আজ সকাল থেকে নিতাই ভাবছে, হিমালয়ে চলে যাবে। সেখানে পাহাড়ে করে খুঁজে আসল সিদ্ধাই কাউকে খুঁজে বের করবে। যদি আসল লোককে পেয়ে যায় তবে আর ফিরবে না নিতাই। যেমন তেমন করে হোক পুতুলরাণীর গলা দিয়ে রক্ত তুলতেই হবে।
পালপাড়ার সদর রাস্তার ধারে বাড়ি হাঁকড়াচ্ছে রঘু কর্মকার। শালারা দুনিয়াটাই শান বাঁধিয়ে ফেলছে আস্তে আস্তে। একদিন কি লোকে ঘরের মধ্যেই হালচাষ করবে বাবা? না হলে জমিই বা পাবে কোথায়?
রঘু হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে রাজমিস্ত্রিদের কাজ দেখছে। নতুন বাড়ির লাগোয়া তার পুরনো টিনের ঘর। রঘুর মেয়ে এসে বাপকে এক কাপ চা দিয়ে গেল। রঘু রোদে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে।
নিতাইয়ের এখন একটু চা-তেষ্টা পেয়েছে ঠিকই। সে দাঁড়িয়ে গেল। ইস্পাত একটু এগিয়ে রঘুর দিকে মুখ তুলে ধমকমক করছে। কুকুরটা লোক চেনে। সোনা চুরি করে রঘুর পয়সা হয়েছে, এ কে না জানে!
নিতাই বলল, চা খাচ্ছ নাকি রঘুবাবু? বাড়িটা তো খুব সুন্দর হচ্ছে গো। তা তোমার বুদ্ধির বলিহারি যাই, পশ্চিমমুখো সদর করে কেউ? এ বাড়ি যে গরম হবে খুব।
রঘু ফিরে দেখে বলল, তাই নাকি? তবে তো বড় ভুল হয়েছে রে সম্বন্ধীর পুত!
তা একটু হয়েছে। অত গরম চা খেয়ো না। ফুয়ে ঠান্ডা করে খাও। বেশি গরম খেলে পেটে ক্যানসার হয়।
বলে নিতাই ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখে। বলে, তিনতলার ভিত গেঁথেছ মনে হয়।
তাতেও কোনও ভুল হল নাকি?
না, ভাবছি রঘু স্যাকরার কত পয়সা হয়েছে।
রঘু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমার আবার পয়সা! আর পয়সাটাই সব রে, নিতাই? তোর মতো মারণ উচাটন শিখতে পারলে কত কাজের কাজ হত! তা শুনলাম তোর বউটা এখনও নাকি মরেনি?
নিতাই মৃদু হেসে বলে, আস্তে আস্তে মরবে। ভুগে ভুগে। পট করে মরে গেলে কর্মফল ভোগ হবে কী করে বলো!
তা বটে। তবে আমি বলি কী, তুই একদিন গুসকরায় গিয়ে সামনাসামনি বাণ মেরে আয় না। তাতে অনেক কাজ হবে।
ও বাবা! পুলিশে ধরবে না? ফাঁসি হয়ে যাবে।
তখন পুলিশ বশীকরণ করবি।
ইয়ারকি হচ্ছে?
রঘুর বউ বেরিয়ে এসে উঁকি দিয়ে দেখে বলল, এই সাত-সকালে খ্যাপাকে রাগাচ্ছ কেন? কু বাক্যি বলবে যে নামতা পড়ার মতো!
