বুলুর বয়স বেশি নয়। ত্রিশের মধ্যেই। কিন্তু এর মধ্যেই জুলপি পেকেছে। চেহারায় সুস্পষ্ট মধ্যবয়সের ছাপ। দীপনাথের চেয়ে বয়সে চার-পাচ বছরের বড় বলে মনে হয়। কম বয়সে বিয়ে করলে কি মানুষ তাড়াতাড়ি বুড়োটে মেরে যায়?
বম্বে থেকে একটা শট কোর্সের ট্রেনিং সেরে ফিরে এসে প্রথম দিন অফিসে পা দিয়েই রিসেপশনে বুলুকে দেখতে পায় দীপনাথ। বিরক্ত হতে গিয়েও হল না। থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল। বুলুর পোশাক আজ অন্যরকম। পরনে ধড়া, চুল এলোমেলো, গালে অল্প একটু দাড়ি। দীপনাথকে দেখে উঠে কাছে এল।
আবেগহীন গলায় দীপনাথ বলে, বাবা?
বুল মাথা নাড়ে, আজ সাত দিন।
দীপনাথ কোনও শোক বোধ করে না, বুকে কোনও কান্নার ঢেউ ভাঙল না, হাহাকারে ভরে গেল ভিতরটা। তবু একটা কিছু হল। হঠাৎ বড় খাঁ খাঁ লাগল চারদিক। শিলিগুড়ির কলেজপাড়ায় মস্ত একটা গাছের তলায় তারা আড্ডা মারত। সেই গাছটা কেটে ফেলার পর জায়গাটা অদ্ভুত ন্যাড়া আর করুণ দেখাত। চারদিকটা এখন অনেকটা ওইরকম। কী যেন ছিল, এখন নেই। তবে দীননাথ কোনওদিনই বটবৃক্ষের মতো তাঁর তার সন্তান-সন্ততিকে আড়াল করে ছিলেন না। গাছের কথাটা দীপনাথের মনে এল শুধু ওই থাকা না-থাকার তফাতটুকুর জন্য।
বুলু কাপড়ের খুট তুলে চোখে চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। সানফ্লাওয়ারের দু’জন যুবতী রিসেপশনিস্ট দৃশ্যটা দেখছিল। বুলুর কান্না দেখে দীপনাথেরও ঠোঁট একটু কেঁপে উঠেছিল অজান্তে। সেটা প্রিটেনশনও হতে পারে। মা বাপ মরলে কাদা উচিত এই সংস্কার থেকে। কিন্তু রিসেপশনিস্ট দু’জনের দিকে চেয়ে সামলে গেল দীপনাথ। গলার স্বর নামিয়ে প্রশ্ন করল, সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে?
বুলু পাজি হতে পারে, কিন্তু বাবার শোকে তার কান্নায় কোনও প্রিটেনশন নেই। ক’দিনে সে যে অনেক কেঁদেছে তার সুস্পষ্ট ছাপ তার ফোলা মুখে। এখনও চোখ দুটি জলে ভরা, লাল। কথা না বলে মাথা নাড়ল সে, খবর দিয়েছে।
বিলুকে?
হ্যাঁ।
তুই একটু বোস। আসছি।
সানফ্লাওয়ারে দীপনাথের কোনও চেম্বার নেই। বড় হলঘরের মধ্যে একটু উঁচু কাঠের পাটাতনের মতো আয়ল্যান্ড অফিসারদের জন্য। এ রকম আয়ল্যান্ডের একটা দীপনাথের। সে তার দ্বীপটিতে উঠে চারদিকে একবার তাকাল। ভারী নিস্তব্ধ পরিচ্ছন্ন আধুনিক অফিস। রোজই সে এই অফিসটার আভিজাত্য লক্ষ করে এবং খুশি হয়। আজ এই শশাকের দিনেও হল। নিজের চেয়ারে মিনিট দুয়েক নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল সে। তারপর ব্রিফকেস খুলে কিছু জরুরি কাগজপত্র ফাইলে রেখে ডসন নামে তার ওপরওয়ালা সাহেবকে একটা ফোন করল। না, লম্বা ছুটি চাইল না সে। শুধু আজকের দিনটা। শ্রাদ্ধ আর ঘাট কাজের জন্য আরও দুদিন নেবে সেটাও জানিয়ে। রাখল।
ডসন তার অদ্ভুত গভীর কণ্ঠস্বরে মার্কিন উচ্চারণে বলল, ইটস ওকে। আই সিমপ্যাথাইজ।
ফোন করার পরও কিছুক্ষণ বসে থাকে দীপনাথ। সে এত স্বাভাবিক কেন তা বুঝতে পারছিল। সে তো আলবেয়ার কামুর নিস্পৃহ নায়ক নয়। ভেতো ভাবপ্রবণ বাঙালি। সত্য বটে, সে মানুষ হয়েছে পিসির কাছে, বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না, তবু বাবা তো! বুলুর মতো সে কেন কেঁদে উঠছে না?
নিজের জন্য নিজের কাছেই লজ্জা করছিল তার। অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে কাজকর্মের কিছু পরামর্শও দিল সে। খুবই স্বাভাবিকভাবে। বাবার মৃত্যুসংবাদটা সে অবশ্য প্রচার করল না।
বাইরে এসে দেখে, বুলু বসে সিগারেট ফুঁকছে। তাকে দেখেই তটস্থ হয়ে পেতলের স্ট্যান্ডওয়ালা ডাবরের মতো মস্ত অ্যাশট্রেতে সেটা ফেলে উঠে দাঁড়াল।
দীপনাথ শোক টের পাচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু চারদিকে খাঁ খাঁ ভাবটা রয়েছে এখনও। ট্যাক্সিতে বসেও সেটা টের পাচ্ছিল। ভীষণ বৃষ্টি গেছে ক’দিন। উজ্জ্বল রোদ। ভ্যাপসা গরম। বুলুর গা থেকে কোরা কাপড়ের গা-গোলানো গন্ধ আসছে। বাবা নেই। প্রীতমও আর একভাবে নেই। মণিদীপাকে সে নিজেই দূরের মানুষ করে দিয়েছে। এই তত ভাল দীপনাথ! আস্তে আস্তে ঝরে যাচ্ছে পাতা। রিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এবার একদিন পাহাড়ের দিকে মুখ ঘোরাবে। তারপর চলতে থাকবে। পর্বতের তো মৃত্যু নেই। নিরুদ্দেশও হয় না।
বুলুর দু’শরের বাসাটা খুবই ছোট। ভারী ঘিঞ্জি। বাইরের ঘরে একটা চৌকির ওপর শ্রীনাথ বসে আছে। চেহারাটা ভেঙেচুরে বিচ্ছিরি হয়েছে। ফর্সা গালে কাঁচা পাকা দাড়ি। চোখের কোলে জল ছিলই, দীপনাথকে দেখে বাবা নেই রে’ বলে ড়ুকরে কেঁদে উঠল।
বুলু চাপা গলায় বলে, মেজদা খুব ভেঙে পড়েছে। গত তিনদিন ধরে এখানেই আছে। সমানে কঁদিছে।
বউদি আসেনি?
প্রথম দিন খবর পেয়ে এসেছিল।
দীপনাথ জুতো ছাড়ল, তারপর গিয়ে শ্রীনাথের পাশে বসে গায়ে হাত রেখে বলে, কেঁদো না! কান্নার কী আছে! বুড়ো বয়সে বেঁচে থাকাও তত কষ্টের।
এই বলতে বলতেই দীপনাথের চোখে জল এসে গেল। এইটুকুর ভারী দরকার ছিল, নইলে ‘ওরা ভাবত, দীপনাথ বাবার জন্য দুঃখ পায়নি। চোখের জলটা সে রুমালে মূছল না। সবাই দেখুক।
কিন্তু কাঁদতে কাঁদতেও দীপনাথের যুক্তিবাদী মনে প্রশ্ন আসে। মেজদা শ্রীনাথ কি বাবাকে এতই ভালবাসত! কই, কখনও তো মনে হয়নি। বরং নিজের বাবা সম্পর্কে শ্রীনাথের ছিল নিষ্ঠুর উদাসীনতা। তবে এই কান্না আসছে কোথা থেকে? কেন এত শোক?
আসলে দুর্বলচিত্তরা অন্যের দুর্দশা, ব্যথা বা মৃত্যু দেখে নিজের দুর্দশা, ব্যথা বা মৃত্যুর ভয়ে ভেঙে পড়ে, কেঁদে আকুল হয়। এর সঙ্গে শোক বা ভালবাসার সম্পর্কই নেই। সবটাই আত্মকেন্দ্রিক।
