অনেক হিসেব করে সে দেখল, তার বয়স এখন তেত্রিশ বা চৌত্রিশ। জন্মের সঠিক তারিখ জানা
নেই। এই বয়সে প্রকৃতপক্ষে তার কোনও আপনজন নেই। ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। এখন তার এই তেত্রিশ বা চৌত্রিশ বছর বয়সে একাকিত্বের ভূত কাঁধে চেপে ঠ্যাং দোলাচ্ছে আর রগড় দেখছে।
মাঝরাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায় দীপনাথের। আর ঘুম আসতে চায় না। বরং আসে প্রীতম, মণিদীপা, শিলিগুড়ি, আসে সেই অচেনা মহান পর্বত। বিরহের এক শুষ্ক বাতাস বয়ে যায় বুকের পাজর ভেদ করে। তখন আলো জ্বেলে একটু বই টই কিছু পড়তে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু রুমমেটদের ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে পারে না। একটু পায়চারি করলেও হয়তো ভাল লাগে। কিন্তু সেই পরিসর নেই।
মেস বদলাবে, একটা সিংগল-সিটেড ঘর দেখে চলে গেলে কেমন হয়?
এ সব ভেঁড়া টুকরো সমস্যা যখন তাকে বিব্রত করছিল তখনই রতনপুর থেকে বউদির চিঠি এল, … আমি মরলে খাটে কাঁধ দেওয়ার জন্যও কি আসবে না?
সানফ্লাওয়ারে ফাইভ ডেজ উইক। শনি রবি ছুটি। কিন্তু প্রায়দিনই শনিবারে অফিস করতে হয় দীপনাথকে। তার জন্য মোটা ওভারটাইম আছে, কিন্তু সেজন্য নয়। দীপনাথ কাজ করার আগ্রহের বশে ফি শনিবার অফিসে চলে যায়। ইচ্ছে করলে এক শনি বা রবিবার সে চলে যেতে পারে রতনপুরে। কিন্তু তার ইচ্ছে হয় না। মেজদা ক্রমে এক জড়ভরত হয়ে যাচ্ছে। বউদি এতদিনে সংসারের পালটা মার খেতে শুরু করেছে। একমাত্র আকর্ষণ সজল। কিন্তু সজলকে তো নিজের মতো করে মানুষ করতে পারবে না দীপনাথ। অত সময় কোথায়? সজলও ক্রমে রতনপুরের প্রভাবে অন্য রকম হয়ে যাবে, যাকে ভালবাসা যাবে না। একমাত্র উপায় সজলকে বোর্ডিং-এ দেওয়া, মা-বাবার কু-প্রভাব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
এক শনিবার শ্রীনাথের প্রেসে হানা দেয় দীপনাথ।
মেজদা!
আরে, মেন আছিস?
তুমি কেমন?
ওই এক রকম।
দীপনাথ দেখে, গত এক বছরে শ্রীনাথের চেহারায় বুড়ো মানুষের ছাপ বড় বেশি পড়ে গেছে। সে বলে, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি।
বল না!
সজলের ব্যাপার কী ঠিক করলে?
সজলের কী হয়েছে? একটু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে শ্রীনাথ।
কিছু হয়নি। কিন্তু রতনপুরে থাকলে ছেলেটা মানুষ হবে না।
তা হলে কোথায় থাকবে?
যদি বলো তা হলে বাইরে কোনও ভাল হোস্টেলে দিয়ে দিই।
হোস্টেল!–বলে শ্রীনাথ একটু ভাবে। তারপর অসহায় একটা মুখের ভাব করে করুণ গলায় বলে, সজল চলে গেলে আমার কী হবে বল তো!
তোমার আবার কী হবে?
তুই তো ঠিক বুঝবি না। বলতে কী, সই আমার একমাত্র অন্ধের নড়ি। ও যদি চলে যায় তবে আমার আয়ু চট করে ফুরিয়ে যাবে।
ফত বাপ তাদের ছেলেকে হোস্টেলে দেয়, তারা থাকে কী করে?
আমাদের ব্যাপারটা তো অন্য সকলের মতো নয়। চারদিকে ষড়যন্ত্র, কূটকচালি। একমাত্র সজলই আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখে। যেই ও সরে যাবে অমনি আমাকে ছিড়ে খাবে সবাই।
কেন? তুমি কী করেছ যে ছিড়ে খাবে?
সে অনেক কথা। তোকে তো বহুবার বলেছি। তবে যদি সজলকে সরিয়ে দিতে চাস তা হলে আমাকেও সরিয়ে দে। ওখানে সজলও খুব নিরাপদ নয়।
কেন? কী হয়েছে?
তৃষার সঙ্গে ওর বনিবনা হয় না। তৃষা ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।
তোমার মাথাটা একদম গেছে। মা হয়ে কেউ ছেলেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে?
তৃষা তো আর-পাঁচজন মায়ের মতো নয়। তুই সব বুঝবি না।
বউদিকে আমিও কম চিনি না মেজদা। অনেক দোষ থাকলেও বউদি অমানুষ নয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপনাথ উঠে পড়ল। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ পরিবার লক্ষ লক্ষ রকমের নিজস্ব জীবনযাপন ও সম্পর্কের ছক তৈরি করে নিয়েছে। দীপনাথ আগন্তুকের মতো গিয়ে সেই সব ছক ভেঙে ফেলতে চাইলেই তো হবে না।
তৃষার চিঠিটার একটা এলেবেলে জবাব দিয়ে দিল সে। নিজে রতনপুরে গেল না। ইচ্ছে করল। তার নিজের নানা রকম নিজস্ব ব্যথা-বেদনা রয়েছে। এখন মনকে আরও ভারী করার মানে হয় না।
দীপনাথ তার নতুন চাকরির কথা আত্মীয়স্বজনকে জানায়নি ভাল করে। সে কত মাইনে পায় তাও কারও জানার কথা নয়।
তবু গন্ধে গন্ধে একদিন সোমনাথ এসে হাজির।
সেজদা, আরেব্বাস, তুমি তো একখানা পেল্লায় চাকরি বাগিয়েছ।
দীপনাথ এ ধরনের কথায় বিরক্ত হয়। গম্ভীর মুখে বলে, বাবা কেমন আছে?
সেই কথাই বলতে এলাম। বাবার চোখটা এবার না কাটালেই নয়।
চোখ কাটানোর কথা অনেক আগে হয়ে গেছে। তখন কাটাসনি কেন?
টাকা ছিল না।
বাজে কথা। আমরা টাকা দিয়েছিলেন।
সেজদা, তুমিও আজকাল অন্য রকম হয়ে গেছ। কেবল টাকার কথা তুলে আমাকে খোঁটা দাও। আমার অবস্থা কী জানো না?
অবস্থা যা-ই হোক, স্বভাবটা ভাল কর। বাবার চোখ কাটানোর ব্যবস্থা কর, খরচ সব আমি দেব। কিন্তু সেটা আগাম তোর হাতে দেব না।
সোমনাথ গম্ভীর হল। তারপর ক্ষুন্ন স্বরে বলল, তুমি চার হাজার টাকার ওপর বেতন পাও। অনেক ক্ষমতা। তোমার মুখে সবই মানায়। ঠিক আছে, তাই হবে।
সোমনাথ চলে যাওয়ার পর দীপনাথ ভাবল, আমি কি একটু নিষ্ঠুর হয়ে গেছি!
৭৮. সানফ্লাওয়ারের শীততাপনিয়ন্ত্রিত বিশাল রিসেপশন
আজকাল প্রায়ই সানফ্লাওয়ারের শীততাপনিয়ন্ত্রিত বিশাল রিসেপশন ঘরে বুলু অর্থাৎ সোমনাথ এসে বসে থাকে দীপনাথের জন্য। কেন আসে তা জানে বলেই দীপনাথ বিরক্ত হয়। বুলু টাকার গন্ধ পেয়েছে। প্রায়ই বাবার নাম করে টাকা চায়। বলে, বাবার পুরনো চশমাটায় চলছে না। আমার অবস্থা তো জানোই। বাবা তোমারও। নিত্যি নতুন অজুহাত।
