যাঃ! কী যে কিম্ভুত একটা খেয়াল আছে আপনার মাথায়!
দীপনাথ তা জানে। কিন্তু কথাটা তো মিথ্যেও নয়। সারাদিন সানফ্লাওয়ার যতক্ষণ পারে মেদ মজ্জা মাংস মস্তিষ্ক চিবিয়ে ছিবড়ে করে দেয়। কিন্তু তারপর যখন ক্লান্ত দীপনাথ তার হোটলে ফিরে আসে তখনই আসে প্রীতমের শূন্যতা। বড় ভারহীন, বন্ধনহীন লাগে নিজেকে।
সব ক’টা বড় খবরের কাগজে দিনের পর দিন নিজের পয়সায় প্রীতমের ছবি সহ নিরুদ্দেশের খবর বের করেছে সে। শিলিগুড়িতে শতমও দাদাকে খুঁজতে তোলপাড় করছে আজও। কোথাও কোনও হদিশ মেলেনি।
হয়তো প্রীতম আছে। হয়তো নেই।
বিলুর হাবভাব একদম ভাল লাগে না দীপনাথের। বিলু চাকরিতে একটা লিফট পেয়েছে। বাসাটা সাজিয়েছে অনেক টাকা খরচ করে। প্রতি রবিবার অরুণ ওর বাসায় খায়। মাঝে মাঝে বেড়াতে যায় অরুণের সঙ্গে।
এ সব এক রকম চলছিল। খুব সম্প্রতি সে খবর পেয়েছে, বিলু একজন উকিলের পরামর্শ নিচ্ছে। খবরটা দিয়ে গিয়েছিল শতম। মাসখানেক আগে সে একটা টেন্ডার ধরতে কলকাতায় এসে দু’দিন বিলুর কাছে থেকে গিয়েছিল।
স্বামী নিরুদ্দেশ বলে একসপার্টি ডিভোর্স পেতে অসুবিধে হবে না বিলুর। কিন্তু ডিভোর্সই বা চাইবে কেন? প্রীতম মরে গেলেই কি সব শেষ হয়ে গেল?
কথাটা সরাসরি বিলুকে জিজ্ঞেস করতে তার লজ্জা করে। কিন্তু ভাবলেই লজ্জায় ক্ষোয় ভিতরটা অস্থির হয়ে ওঠে তার। আর তখনই মনে হয়, এই জীবনটা নেহাতই একটা অর্থহীন প্রলাপ মাত্র। এর চেয়ে সব ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়া ভাল।
পাহাড় তো ডাকছেই। অবিরল ডাকে। এসো, চলে এসো দীপনাথ। এখানে নীরব মহান এক প্রস্থানপথ খোলা আছে। এখানে দীনতা নেই, নিম্নগতি নেই। স্বর্গের এই সিঁড়ির কাছে এসো। আমি কোলে তুলে নেব।
দীপনাথ বোস সাহেবের কাছে খবর পেল, ডাক্তারের পরামর্শে মণিদীপা আর বোস সাহেব নৈনিতাল বেড়াতে যাচ্ছে। যাক। ওরা এত সহজে মিশ খাবে না, তা জানে দীপনাথ। দুজনের মধ্যে এখনও কাঁটাতারের বেড়া। তবু এভাবেই হয়তো একদিন একটু বেশি বয়সে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরবে অসহায়ের মতো। শেষ পর্যন্ত তো মানুষ অসহায়ই। সে বোসই হোক, মণিদীপাই হোক।
নৈনিতাল গেলেও হত। পাহাড়ের মতো আর-একটা দুর্নিবার ডাকও আছে দীপনাথের জীবনে। এখনও তার মূলসুদ্ধ কেঁপে ওঠে যদি মণিদীপা ডাকে।
দিনের মোটা একটা সময় কাজ কাজ খেলা দিয়ে তাকে ভুলিয়ে রেখেছে বলে সানফ্লাওয়ারের প্রতি বড় কৃতজ্ঞতা বোধ করে দীপনাথ। আরও ভাল হত যদি সে সারা রাত ধরে আর-একটা চাকরি করত। একমাত্র কাজই তাকে ভুলিয়ে রাখতে পারে। টাকা নয়, প্রতিষ্ঠা নয়, পোমোশন নয়, কেবল ভুলিয়ে রাখে বলে যত দিন যায় তত আরও বেশি কাজ-পাগল হয়ে ওঠে দীপনাথ।
অফিসের পর এই শূন্যতা এত অসহ্য লাগত যে, বেশ কিছুদিন তাকে বীথির কাছে যেতে হয়েছে। একটা কুৎসিত বদ অভ্যাস তৈরি হয়ে যাচ্ছিল তার। হঠাৎ একদিন সুখেন মেসে ফিরল হাতে আর মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে। মুখে করুণ হাসি। চমকে উঠে দীপনাথ জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
ঘরে আর কেউ ছিল না। সুখেন কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে থেকে বলল, বীথির ছেলেকে দেখেছেন তো?
এক কি দুই দিন।
বীথি ভাল নয়, কিন্তু ছেলেটা মেরিটোরিয়াস। পলিটিকস করে, সোশ্যাল ওয়ার্ক করে।
জানি।
এতদিন কোনও ঝামেলা করেনি। বীথি ডিভোর্স পেয়ে গেছে, সুতরাং এখন যদি সে বিয়ে করে তা হলেও ছেলের আপত্তি নেই। কিন্তু আপত্তি আমাকে বিয়ে করায়। ছেলেটি মনে করে, আমি করাপটেড সরকারি কর্মচারী। আমাকে বিয়ে করা মানে সোশ্যাল ইনজাসটিসকে প্রশ্রয় দেওয়া।
তারপর? এই রক্তারক্তি কাণ্ডটা কখন হল?
আজ। উই হ্যাড অলটারকেশনস। আমার পেটে একটু মাল ছিল ঘড়াম করে মেরে দিয়েছিলাম এক ঘুসি। ছোকরাও পালটা ঘুসি ঝেড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়ে এই কাণ্ড।
তারপর?
তারপর আর কী? ক্ষমা চাওয়াচাওয়ি হল। কাল বীথির সঙ্গে আমার বিয়ে।
কালই?
কালই। শুভস্য শীঘ্রম।
রেজিস্ট্রি না সোশ্যাল?
সোশ্যাল হলে বিশ্রী দেখাবে। রেজিস্ট্রি আর তারপর কালীঘাট।
আপনি বীথির সঙ্গে ঘর করতে পারবেন?
পারব।
নোয়িং ফুললি যে, আমার সঙ্গেও বীথির…!
আমিই তো আপনাকে নিয়ে গেছি, সুতরাং জানব না কেন? শরীরের কোনও দোষ নেই। মনটা ঠিক থাকলেই হল।
এসব মেয়েদের মনও কি ঠিক থাকে?
সেসব পরে ভাবব। আমিও কিছু ভাল লোক নই। বীথিও নয়। সুতরাং ভেবে লাভ কী?
তা বটে।
তা হলে কাল। আপনি তৈরি থাকবে। সাক্ষী দিতে হবে।
পরদিন রাতে বাস্তবিকই ঘটনাটা দীপনাথের চোখের সামনে বীথির ড্রয়িংরুমে ঘটে গেল। দীপনাথ সাক্ষী ছিল।
এই বিয়েতে এক রিকশায় বসে সুখেনের সঙ্গে গিয়েছিল দীপনাথ। ফিরল একা।
সুখেন রয়ে গেল। আর ফেরেনি। ফিরবেও না। হোটেলের ম্যানেজার নতুন বোর্ডার খুঁজছে। সুখেন চলে যাওয়ার পর এখন আরও বেশি একা লাগে দীপনাথের। নতুন বোর্ডার আসবে, সে কী রকম লোক হবে কে জানে! দীর্ঘদিন মেসে হোটেলে থেকে নতুন লোকের সঙ্গে সমঝোতা করার অভ্যাস হয়ে গেছে তার। তবু ইদানীং তার এ রকম হাটবাজারের মতো জায়গায় থাকতে ভাল লাগে না।
তার জিনিসপত্র খুব বেশি নেই। সামান্যই। ফ্ল্যাট ভাড়া করলে তা সাজানো গোছানোর ব্যাপার আছে। তার ওপর আর-কিছুদিন পরই তাকে আমেরিকা যেতে হচ্ছে। খামোখা ফ্ল্যাট ভাড়া করার মানে হয় না। ফাঁকা পড়ে থাকবে। অথচ এই ভারাক্রান্ত হৃদয়টিকে রাখার জন্য একটু সুন্দর নির্জনতা খুঁজছে সে মনে মনে।
