এত বড় কোম্পানিগুলি ভাত ছড়িয়ে ধসে তু বলে ডাকলেই দীপনাথের মতো ঝাকে ঝাকে কেজো লোক এসে জড়ো হয়ে লেজ নাড়ে; সুতরাং দীপনাথকে ডেকে চাকরি দেওয়ার দরকার। ছিল না এদের। তর দিয়েছে কেন সেটা দীনাথ ভাল বুঝল না। প্রথম কয়েকটা দিন নতুন ধাঁচের কাজকর্ম বুঝতে সে হিমশিম খেল। অটোমেশন জিনিসটারও মুখোমুখি সে কখনও হয়নি। এখানে হল।
গুজরাটি কোম্পানি বোস সাহেবের যোগ্যতা অনুযায়ী তাকে কাজে লাগাতে পারেনি। কিন্তু বোস সাহেব কাজের লোক। সানফ্লাওয়ারে কার আগে মাসখানেক বোস সাহেব দীপনাথকে অটোমেশন বুঝিয়েছে। চেনা বিভিন্ন কোম্পানিতে ইনট্রোডাকশন দিয়ে পাঠিয়েছে আই বি এম এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির কাজ দেখতে। সেই ঘরোয়া ট্রেনিংটা খুব কাজে লাগাল দীপনাথের। হিমশিম খেলেও নতুন কাজে সে হাস্যকর কিছু করল না।
সাতদিন পর এক ছোকরা সাহেব তার টেবিলের সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, লাইক দি জব?
ইয়াঃ।–অনায়াসে বলতে পারল দীপনাথ।
আট্টা বয়।— বলে সাহেব হেসে চলে গেল।
বোস সাহেব মাঝে মাঝে ফোন করে খবর নেয়, কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো, চ্যাটার্জি?
না। চালিয়ে নিচ্ছি।
আপনার হিসেবটা হয়ে গেছে। একদিন এসে টাকাটা নিয়ে যাবেন।
গুজরাটি কোম্পানিতে দীপনাথের কিছু পাওনা টাকা পড়ে আছে। খুব বেশি হবে না। বলল, যাব।
দেরি করবেন না। টাকাটা ব্যাংকে রাখলে সুদ পাবেন, এখানে খামোখা ফেলে রেখে লাভ কী?
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, সময় পাচ্ছি না যে। এই অফিস থেকে সহজে বেরোনো যায় না।
জানি। সানফ্লাওয়ার ইজ বিগ। ভেরি বিগ। আপনিও এখন বিগ। তবে আপনি যদি একটা ডেট বলেন তবে অফিস-আওয়ার্সের পর আমি টাকাটা রেডি রেখে দেব। ইউ জাস্ট ড্রপ ইন অ্যান্ড কালেক্ট।
আচ্ছা। মিসেস বোসের খবর কী?
নাথিং নিউ। নাইদার হ্যাপি নর আনহ্যাপি।
আপনি?
আমি? আমি জাস্ট ওকে।
কোম্পানি?
বুঝতে পারছি না। রিয়েলি বুঝতে পারছি না। ড়ুয়িং বিজনেস নো ডাউট। কিন্তু একসপানশান নেই।
আচমকাই দীপনাথ বলে, আপনি সানফ্লাওয়ারে আসবেন?
বোস বোধ হয় অবাক হয়। তারপর হেসে বলে, ও! নো।
কেন বোস সাহেব?
বোস সাহেব একটা ছোট খাসের শব্দ করে বলে, সানফ্লাওয়ার অনেক আগেই আমাকে পিক করেছিল। কিন্তু কোনও বড় কোম্পানিতে আমার যাওয়ার উপায় নেই চ্যাটার্জি।
কেন?
কারণ আমি যে কনসানে কাজ করব আই মাস্ট বি দেয়ার নাম্বার ওয়ান ম্যান। আমি নাম্বার ওয়ান হয়ে কোনও কোম্পানিতেই কাজ করিনি। বড় কোম্পানি আমাকে মস্ত পোস্ট দেবে, অনেক মাইনেও, কিন্তু প্রথমেই নাম্বার ওয়ান জায়গাটা ছাড়বে না। তাই আমার কপালে বড় কোম্পানি নেই।
এবার দীপনাথও একটু হাসে। বলে, আপনি যদি কখনও কোনও নিজস্ব কোম্পানি খোলেন তবে আমাকে ডাকবেন।
বোস আবার শ্বাস ছেড়ে বলে, সেসব আরও কম বয়সে শখ ছিল। এখন নেই। এখন আমি ফিজিক্যালি আনফিট। সাইকোলজিকালিও। কিন্তু আপনাকে একটা আডভাইস দিয়ে রাখি। চট করে কোনও লোভে পড়ে সানফ্লাওয়ার ছাড়বেন না। ইউ আর উইথ গুড পিপল। দে উইল ড়ু ইউ গুড। কমপিটিটর কোম্পানি অনেক সময় সাবোটাজ করার জন্য বড় কোম্পানি থেকে তোক ভাঙিয়ে নিয়ে আসে। যারা লোভে পা দেয় জেনারেলি এন্ড ইন দি গাটার। সানফ্লাওয়ারে থাকুন। দে উইল মেক ইউ ভেরি ভেরি এফিসিয়েন্ট।
ঠিক আছে। কথাটা মনে রাখব।
আই অলওয়েজ উইশ ইউ গুড।
সানফ্লাওয়ারে আসার মাস দুয়েক বাদে একদিন মণিদীপা ফোন করল।
গলাটা চেনা লাগছে, দীপনাথবাবু?
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, যে ভোলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে আমি ভুলিব না, আমি তারে ভুলিব না। কেমন আছেন?
চমৎকার। আপনি?
চমৎকার।
একটা চাকরি দেবেন আপনার কোম্পানিতে? আপনার পি-এ করে নিন না!
আমার পি-এ বলে কিছু নেই।
তা হলে আপনি কিসের বড় চাকরি করেন?
বড় চাকরি নয়। কিন্তু এই কোম্পানির বেয়ারাও এত বেশি মাইনে পায় যে অনেক সরকারি অফিসারও পাল্লা দিতে পারবে না।
তা হলে বেয়ারার চাকরিই দিন না।
কেন? ব্যাবসার কী হল?
কী আবার হবে? টাকা কই? ঢাকুরিয়ার এই দোকানটা এখন পঞ্চাশ হাজার সেলামিতেও রাজি। কিন্তু তাই বা আমাকে দেবে কে?
দু’লাখ থেকে পঞ্চাশ হাজারে নেমেছে? বলেন কী!
এমনিতে নামেনি মশাই, দোকানের মালিককে বেশ কয়েকটি কটাক্ষ উপহার দিতে হয়েছে।
তা হলে আরও গোটাকয় দিন। বিনি পয়সায় দিয়ে দেবে।
না। এখন দোকানের মালিক আর কটাক্ষে খুশি নয়। হি ওয়াস সামথিং টানজিবল। হয় টাকা, হয় কাইন্ডস।
কাইন্ডনেস নয় তো!
না। কাইন্ডস, একস্ট্রিমলি ফেমিনিন কাইন্ডস।
কুপ্রস্তাব করেছে বলছেন?
নট ইন সো মেনি ওয়ার্ডস। তবে আমরা মেয়েরা ঠিক বুঝতে পারি।
ওর কাছে আর যাবেন না।
গিয়ে লাভও নেই। লোকটা বুঝে গেছে, আমি ক্যাশ বা কাইন্ডস কোনওটাই দিতে পারছি না। শুনুন, আমরা একটু পাহাড়ে বেড়াতে যাচ্ছি। মে বি নৈনিতাল। না হয় সিমলা। আপনি কি ছুটি পাবেন?
পেলেও যাব না।
কেন? টু অ্যাভয়েড মি?
সেটাও হয়তো কারণ। তবে আমার ভয় এবার বড় পাহাড়ের কাছে গেলে আমি হয়তো ফিরতে পারব না।
ওমা! সে কী?
জানেন তো, প্রীতম আজও ফেরেনি?
জানি।
প্রীতম আমার কতটা ছিল তা তো আর জানেন না!
অনেকটা আন্দাজ করতে পারি।
অনেকটা, তবু সবটা নয়। প্রীতম ছিল এই পৃথিবীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কারণ, এখন তাই আমার কোনও পিছুটান নেই। বড় চাকরি, অনেক টাকা, এ সব কিছুই আমাকে টেনে রাখতে পারবে না। মাঝে মাঝে আজকাল নিশুত রাতে পাহাড় ডাকে।
