সজল মুখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে চেয়ে হাসল, ছাড়ো বাবা, একটা সাপকে এত ভয় কী! দেখো না, মেরে ঠান্ডা করে দিচ্ছি।
এক পলকের এই সর্বনাশা অমনোযোগ, ওই সুযোগেই সাপটা হড়হড় করে নেমে এল মেঝেয়। তীব্র ফোসানির শব্দে সচকিত সজল চেয়ে দেখে, মাত্র তিন হাত দুরে সাপটার ফণা, আর তার পাল্লায় সে দাঁড়িয়ে। তাকে জাপটে আছে বাবা।
গোয়ালঘরে, বাগানে অনেক সাপ মেরেছে সজল। সাপে তার ভয় প্রায় নেই-ই। কিন্তু ঠিক এই অবস্থায় সাপের মুখোমুখি সে কখনও পড়েনি। তার ওপর বিপদ, বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে একটা অদ্ভুত গোঁ-গোঁ শব্দ করছে।
কিন্তু সজলের কাছে সাপের কোনও সম্মোহন নেই। তার মাথা পরিষ্কার। সহজেই সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। হাতের বিশাল ডান্ডাটা ফেলে গায়ের আসুরিক জোরে সে এক ঝটকায় বাবাকে ছিটকে ফেলে দিল।
সাপটা ছোবল দিতে একটু দেরি করেছিল। তারও তো অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করার আছে। বেনোজল থেকে মানুষের ঘরে উঠে এসে সেও একটু অপ্রতিভ।
সজল তাই এ যাত্রায় বেঁচে গেল। বাবাকে সরিয়ে প্রায় অন্ধের মতো একটা মাঝারি ট্রাংক দু’হাতে তুলে নিল চোখের পলকে। তুলেই সেটাকে মেঝেয় ফেলে লম্বালম্বি তড়িৎগতিতে ঠেলে নিয়ে গেল সাপটার দিকে। মেলট্রেনের মতো দ্রুতগামী সেই ট্রাংক সাপটাকে নড়ার সময় দিল না। সোজা দেয়ালের সঙ্গে চিড়ে-চ্যাপটা করে দেয়। দেয়ালে সাপটাকে ট্রাংক দিয়ে দুমদুম করে ঠুসতে থাকে সজল। প্রবল সেই প্রহারে সাপটার হাড়গোড় ভেঙে দ হয়ে যায়, চামড়া ছিড়ে যেতে থাকে। সজল সাপটাকে চুসতে চুসতে অস্ফুট স্বরে বলতে থাকে, মর! মর! মর!
কিছুক্ষণ আগেকার ভয়ংকর কেউটে যখন প্রায় ছিবড়ে হয়ে এসেছে তখন তাকে ছাড়ল সজল।
শ্রীনাথ উঠে বসেছে। হাঁ করে দেখছে দৃশ্যটা। সিঁড়ির মাঝখানে স্থির স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছে তুষা। নির্নিমেষ চোখ। এতক্ষণ সে একটাও শব্দ করেনি।
সজল ট্রাংকটা আবার খাটে তুলে রাখে, তারপর বাবার দিকে ফিরে একগাল বাহাদুর হাসি হেসে বলে, তুমি যা ভিতু না! তোমার জন্যই আর-একটু হলে সাপটার ছোবল খেতাম। বলে সে বাবাকে টেনে তোলে।
শ্রীনাথ কঁপছিল। হাতে-পায়ে বশ নেই। কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মতো সজলের মুখের দিকে চেয়ে থেকে হ্যাদানো গলায় বলল, তোর প্রাণের ভয় নেই হারামজাদা! ফের যদি কোনওদিন…
সজল একটু হেসে বলে, আমার চেয়ে মা’র বিপদ অনেক বেশি ছিল। ওই জানালায় মা বসে ছিল একটু আগে।
তা বটে। কিন্তু তৃষাকে সাপে কামড়াতে পারে এটা যেন বিশ্বাস হয় না শ্রীনাথের। এ বাড়ির সাপও হয়তো তৃষার অনুগত। এমনও হতে পারে যে, এই কেউটেটা তৃষার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতেই সজলকে ছোবল তুলেছিল।
পাটাতনের ওপর থেকে এ সময়ে মুখ বাড়িয়ে মরা সাপটা দেখে স্বপ্না চেঁচিয়ে উঠল, উঃ বাবাগো! ভাই, তুই মারলি?
তৃষা কোনও কথা না বলে এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার বলল, বৃন্দা, সাপটাকে বাইরে ফেলে দিয়ে আয়।
কোঁচকানো ভ্রু আর কঠিন মুখ নিয়ে তৃষা আস্তে আস্তে পাটাতনে উঠে গেল। সাপটা তাকে কামড়াতে পারত, আর একটুক্ষণ যদি সে বসে থাকত জানালার পাটায়। কিন্তু সেজন্য কোনও দুশ্চিন্তা হচ্ছিল না তৃষার। এ বাড়িতে আসার পর বিস্তর সাপ বিছে পাগলা শেয়ালের সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছে। কিন্তু এখন আরও বুদ্ধিমান, আরও হিংস্র, আরও তৎপর মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে হবে তাকে, যাদের ওপর কিছুতেই আধিপত্য বিস্তার করা যাবে না।
বড় ঘরটা বেঁচে গেল শেষ পর্যন্ত। জল ঢুকল বটে, কিন্তু এক-দেড় ইঞ্চির বেশি উঠল না। ভোর হতে না হতেই সেই জল নেমে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে।
সরিৎ সকালবেলা খবর আনল, নদীর ওপারের বাঁধ এপারের লোক গিয়ে কেটে দিয়ে এসেছে। ফলে জলটা আর বাড়তে পারেনি।
সকালে অগোছালো ঘরে সকলে জড়ো হয়ে বসে চা খাচ্ছিল।
পুবের ঘরের চাল থেকে তোক নেমে দাওয়ায় বসে আছে। বৃন্দা তাদের জন্য ধামাভর্তি চিড়ে বের করে দিচ্ছিল। বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। রোদ ফোটেনি।
তৃষা একদমই কথা বলছে না রাত থেকে। এটা লক্ষ করেছে শ্রীনাথ! কথা বলানোর জন্য সে বলল, কাল রাতে তোমারও খুব ফাড়া গেছে। উঃ, যা একখানা সাইজ সাপটার!
তৃষা চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে মৃদু স্বরে বলল, কাঁড়া এখনও যায়নি।
শ্রীনাথ চমকে উঠে বলে, তার মানে?
মানে কী তা তোমার বোঝা উচিত ছিল।-–বলে তৃষা উঠে পড়ে। অনেক কাজ।
৭৭. মালটিন্যাশনাল কোম্পানির যত দোষ
মালটিন্যাশনাল কোম্পানির যত দোষ আছে সান ফ্লাওয়ার তার কোনওটা থেকেই মুক্ত নয়। দীপনাথকে সানফ্লাওয়ারে ঢুকবার আগে একটা বন্ড সই করে দিতে হয়। সে যে শর্ত দিয়েছিল তার কোনওটাই কোম্পানি মানল না। তবে বেতনটা ঠিক রাখল। যাতায়াতের জন্য অফিসারদের নিজস্ব গাড়ি থাকলে ভাল কথা, নইলে চমৎকার একটা বাস সার্ভিস আছে। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অফিসারদের নিয়ে আসা বা পৌঁছে দেওয়া হয়। দীপনাথ সেই সুবিধাটুকু পেল। কোম্পানি কোনও বাড়ি দেবে না। তবে কালক্রমে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার টাকা ঋণ দেবে।
এর চেয়ে রজার্স ভাল ছিল হয়তো। কিন্তু রজার্স দেশি কোম্পানি। সে টোপ ফেলে দীপনাথকে গেঁথে নিয়ে তাকে দিয়ে দু’নম্বরি কাবাব করাত। তার চেয়ে সানফ্লাওয়ার ঢের ভাল। ছ’মাস বাদে আমেরিকায় ট্রেনিং-এ পাঠাবে। সেটাও দীপনাথের প্রতি বিশেষ দাক্ষিণ্যবশে নয়, বেশির ভাগ অফিসারকেই তারা আমেরিকায় নিয়ে একটু স্ট্রিমলাইনড় করিয়ে আনে।
