শ্রীনাথ ভরসা দিল তাকে, তুমি ভেবো না। আমি ওকে শাসন করে দেব। আর যে কখনও তোমার অবাধ্য না হয়।
তৃষার মুখের কঠিন আস্তরণটা যেমন ছিল রয়েই গেল। চারদিকের প্রাকৃতিক বিপদের কথা আর খেয়াল রইল না শ্রীনাথের। তৃষার মুখের দিকে চেয়ে বুকটা গুড়গুড করছিল তার।
বাইরে থেকে কে চেঁচিয়ে বলল, বড় ঘরে জল ঢুকছে গো!
ঝিরঝির করে আবার বৃষ্টি নেমেছে। বাইরে এসে শ্রীনাথ দেখে দাওয়ার কানায় কানায় জল। আর একচুল বাকি। কিন্তু দৃশ্যটা সে খুব নিস্পৃহভাবে দেখে। কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। মুখ ঘুরিয়ে সে ঘরের ভিতরে চেয়ে দেখে, হারিকেনের আলোয় তিন ভাই-বোন লুডো খেলছে। সজলের মুখ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে পিছন ফেরানো। তার চওড়া কাঁধ, চুলে ভর্তি মাথার একটা ছায়া শরীরের দিকে চিন্তিত ভাবে চেয়ে থাকে শ্রীনাথ। চারদিকের অনেক বিপদের মধ্যে এ ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখাই এক সমস্যা। ওকে কি বেঁচে থাকতে দেবে?
এক ঝলক জল এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে গেল শ্রীনাথের।
বড় ঘরও ড়ুবছে তা হলে! ড়ুবুক, ড়ুবে যাক, ভেসে যাক। শ্রীনাথ তার কোমর থেকে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাই বের করে বিড়ি ধরিয়ে নেয়। বারান্দায়, ঘরে মেলা পোকামাকড় ঘুরঘুব করছে। টর্চের আলোয় সে চারদিকটা দেখার চেষ্টা করে। বেনো ঘোলা জল তোড়ে ঢুকছে বিশাল উঠোনে। ঝোপঝাড় সব জলের তলায়। পুবের ঘরে বারান্দায় যারা এসে উঠেছে তারাও এখন গোড়ালি-ড়ুব জলে দাঁড়িয়ে বেকুবের মতো চুপ করে আছে।
বৃষ্টি এখন তেড়ে পড়ছে। টিনের চালে জোর শব্দ। গুপুস করে একটা নারকোল জলে পড়ে ভেসে গেল। চৌকাঠ ডিঙিয়ে কয়েক কোষ জল ঢুকল ঘরে।
লুডো থেকে মুখ তুলে স্বপ্ন ভয়ের গলায় ডাকল, মা!
তৃষা তেমনি জানালায় বসে। জবাব দিল না, তবে মুখ ঘুরিয়ে কঠিন চোখে তাকাল।
স্বপ্না দরজার দিকটা দেখিয়ে বলে, জল ঢুকছে।
তৃষা মৃদু স্বরে বলল, দেখেছি।
সজল লুডোর খুঁটি চুরি করল এই ফাঁকে। একটা কাঁচা খুঁটি আঙুল দিয়ে পাকা ঘরে চালিয়ে দিয়ে সে নিশ্চিন্তের গলায় বলে, ঢুকছে তো ঢুকছে। সাঁতার জানিস না?
বেশি পাকামি করিস না তো ভাই। শুধু সাঁতার জানলেই বুঝি হবে? ঘরদোর ড়ুবে গেলে কোথায় থাকব আমরা?
ড়ুবতে দে না।
মঞ্জু চুরি ধরতে পেরে সজলের কান টেনে একটা থাপ্পড় মেরে বলল, খুব না! চোর কোথাকার! ডাকাত।
সজল হি হি করে হাসে।
তৃষা কূট চোখে দৃশ্যটা লক্ষ করে। ছেলেটা ভয় পায় না। ভয় কাকে বলে জানে না। কিন্তু তৃষা রাগ চেনে। সে জানে, সজলের এই সাহস কোনও ভাল কাজে লাগবে না।
ঘরে হিলহিল করে জল ঢুকে পড়ছে এবার। এ ঘরের ভিত অনেক উঁচু। তবু ঢুকছে। তার অর্থ, কোথাও বোধহয় আর ডাঙা জমি নেই।
পুবের ঘরের বারান্দায় দাঁড়ানো পুরুষ, মেয়ে, বউ বাচ্চারা ঘরের চালে উঠবার আয়োজন করছে। পাঁচ-সাতজন উঠেও গেছে, বাকিদের টেনে তুলছে ঢালু টিনের ওপর। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে ওই পিছল ঢালু টিনের ওপর কতক্ষণ কাটাতে হবে কে জানে। লক্ষণ ভাল নয়।
চারদিকে টর্চ মেরে দেখছিল শ্রীনাথ।
ঘরে এসে সে দেখে, খাটের বিছানা গুটিয়ে তার ওপর কিছু বাক্স-প্যাটরা তুলছে বৃন্দা। জলে ভিজে মালি আর দুটো কাজের লোক ঘরে এসে গেল।
তৃষা জানালা থেকে জলের মেঝেয় পা রেখে দাঁড়াল। বিশেষ কাউকে নয়, কিন্তু সকলকে উদ্দেশ করেই বলল, তোমরা আস্তে আস্তে পাটাতনে উঠে যাও।
সজল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, এখনই কী! আগে ঘরে গলা জল হোক, তারপর দেখা যাবে।
স্বপ্ন আর মঞ্জু সভয়ে কাঠের মই বেয়ে ওপরে ওঠে। তাদের আগে আগে বৃন্দা।
শ্রীনাথ ইতস্তত করে বলে, আর-একটু দেখি। তুমি বরং উঠে পড়ো।
তৃষা টেবিলল্যাম্প জ্বেলে শিষটা বাড়িয়ে চারদিক দেখল একটু। তারপর বল, পাটাতনে বিছানা পাতা আছে, খাওয়ার জল রাখা আছে। খাবার-দাবারও আছে। চিন্তা কোরো না। আমি যাচ্ছি। বলে তৃষা মইয়ে পা রাখে।
শ্রীনাথ জানে, তৃষা দুরদর্শী। অনেক আগে থেকেই সে সব কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকে। তুষার আধিপত্য মেনে নিলে কারও কোনও ভয় নেই, কষ্ট নেই। শ্রীনাথ ঊর্ধ্বমুখ হয়ে তৃষার মই বেয়ে উঠে যাওয়া দেখছিল।
পিছনে সজল হঠাৎ বলে ওঠে, আরে! ওটা কী?
মাঝ-সিঁড়িতে হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তৃষাও।
শ্রীনাথ ঘুরে তাকায়। আর তাকিয়েই দেখতে পায়। তৃষা যে জানালার পাটায় এতক্ষণ বসে ছিল ঠিক সেইখানে মস্ত এক চিত্রল কেউটে। চতুর, হিংস্র ফণাটা মাঝে মাঝে তুলে আবার মুখ নামিয়ে নিচ্ছে। লেজের খানিকটা এখনও বাইরে।
সম্মোহিতের মতো চেয়ে ছিল শ্রীনাথ। সাপের যে এক ধরনের সম্মোহন আছে তা সে ছেলেবেলায় শুনেছিল। আসলে আচমকা সাপ দেখা দিলে মানুষ বিমূঢ় হয়ে যায়। সেটাই কি সেই সম্মোহন? শ্রীনাথ হাঁ করে চেয়ে ছিল শুধু।
সবার আগে তৎপর হল সজল। হাত বাড়িয়ে সে খাটের ছতরি থেকে একটা আড়কাঠ তুলে নেয়।
আর তখনই সংবিৎ পেয়ে শ্রীনাথ বলে ওঠে, না! না! সজল, খবরদার!
বাপের এ কথাটা শুনল না সজল। ডান্ডাটা তৎপর হাতে তুলেই বিদ্যুৎবেগে বসিয়ে দিল। কিন্তু ছতরির অত লম্বা কাঠ দিয়ে এই ঘরের মতো অপরিসর জায়গায় লাঠির কাজটা হল না। ছাদের একটা কড়িকাঠে সেটা খটাং করে শব্দ করল, তারপর যদিও বা জানলার পাটা পর্যন্ত নামল তো সেটা সাপটার গায়ে লাগলই না। কিন্তু এই আক্রমণে ভয়ংকর সাপটা দুরন্ত ফণার ছোবল তুলল।
করছিস কি গাধা কোথাকার!— বলে হঠাৎ শ্রীনাথ জাপটে ধরে সজলকে, কামড়াবে তোকে। উঠে যা পাটাতনে। যা!
