সজল কিছুক্ষণ জবাবের জন্য অপেক্ষা করে বলল, বৃষ্টি কমে এসেছে। কেন খামোখা জিনিসগুলো ওপরে তুলছ?
বাস্তবিকই বাইরে বৃষ্টির ঝমাঝম শব্দ স্তিমিত রিমঝিম হয়ে বাজছে। কিন্তু তৃষা আপন মনে তার কাজ করে যেতেই লাগল।
মঞ্জু বাবাকে চা দিয়ে মায়ের কাপটা পাশে মেঝেয় রেখে বলল, মা, তোমার চা।
ভারী অস্বস্তি বোধ করছিল তৃষা। চায়ের কাপ তার অবলম্বন হল একটা। মেঝেয় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে ছেলের দিকে চেয়ে বলল, বড়দের সব কথার মধ্যে থাকো কেন?
বড়দের কথা আবার কী? এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলছিলে, কানে এল, তাই বললাম।
তৃষা ভারী হতাশ ও বিষণ্ণ মুখে বসে থাকে। এই সংসার ছেড়ে তার কি সত্যিই যাওয়ার সময় হল?
৭৬. অন্ধকারে জল ভেঙে
অন্ধকারে জল ভেঙে পোঁটলা-পুঁটলি মাথায় কিছু লোক এসে জড়ো হয়েছে এ বাড়ির উঠোনে। মংলু তাদের পুবের ঘরের দাওয়ায় উঠিয়ে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন বলল, এ বৃষ্টির জল নয় গো। বেনোজল। স্রোতটা দেখ।
মৃতপ্রায় নদীটার বুকে পলিমাটি জমে এত উঁচু হয়েছে যে, ফি বর্ষাতেই জল উপচে আসে। এবারেও বৃষ্টিতে পুরনো মাটির বাঁধটা যে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। উঠোনের জল দাওয়া প্রায় গিলে ফেলেছে। কয়েক ইঞ্চি বাকি।
ঘরের মধ্যে উদ্বিগ্ন শ্রীনাথ বলে, অবস্থা তো ভাল দেখছি না। জিনিসপত্র এইবেলা পাটাতনে তোলো।
এতক্ষণ তাই করছিল তৃষা। কিন্তু এখন হঠাৎ তার মুখ পার্থিব বিষয় সম্পর্কে খুব নিরাসক্ত হয়ে গেছে। জানালার পাটায় বসে বাইরের দিকে চেয়ে আছে চুপচাপ।
শ্রীনাথ জানে, সজলের সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক ভাল নয়। তাতে এক সময়ে সে বেশ খুশিই বোধ করত। কিন্তু আজ অস্বস্তি হয় তার। চারদিকে এই জলের বিপদ, আর ঘরের মধ্যে মা-ছেলের মধ্যে থমথমে ভাব।
শ্রীনাথ একবার রাগের চোখে দরজায় দাঁড়ানো ছেলের দিকে চেয়ে বলে, তোর পায়জামাটা বদলাতে কী হয়? বড় ব্যাপড়া বাদর তৈরি হচ্ছিস তো! যা ছেড়ে ফেল গিয়ে।
শাড়ি পরব?
বিপদের দিনে অত বাছাবাছি কী? এটা কি বাবুয়ানির সময়? যা শিগগির।
সজল মা’র কথা শোনেনি, কিন্তু বাবার কথা শুনল। হয়তো ইচ্ছে করেই। পাটাতনের সিঁড়ির নীচে আলো গিয়ে পৌঁছোয়নি ভাল করে। সেইখানে দাঁড়িয়ে সে একটা সাদা খোলের শাড়ি জড়াল কোমরে।
শ্রীনাথ বলল, জামাটাও ভিজেছে, ছেড়ে ফেল। মাথা মোছ। সজল সবই ধীরেসুস্থে করে এবং তার মধ্যেই মায়ের দিকে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখো মুখ টিপে মাঝে মাঝে একটু হাসেও বোধ হয়।
তারপর লক্ষ্মীছেলের মতো সে শ্রীনাথের পাশটিতে এসে বসে।
এ সব মুখ না ঘুরিয়েও টেব পায় তৃষা। তার সমস্ত অনুভূতি সজাগ। সে লক্ষ রাখছে। স্বপ্ন আর মঞ্জুও বাপের পিছন দিকে বিছানায় শুয়ে মৃদু স্বরে কথা বলছে। বৃন্দা কেরোসিন ভরছে স্টোভে। বাড়ির কাজের লোকেরা ভিজে সঁাতা, তাদের জন্য চা হবে।
সরিৎ ঘরে ছিল না। বারান্দা থেকে এইমাত্র ঘরে এসে বলল, মেজদি, দোকানে নিশ্চয়ই জল ঢুকেছে।
তৃষা তার কঠিন মুখখানা এবার ফেরায়, কে বলল?
কে বলবে? ভিতটা তো নিচু। গতকালই নতুন মাল এসেছে। সব পড়ে আছে মেঝেয়। তোলার সময় হয়নি।
তৃষা একটা খাস ফেলে মৃদু স্বরে বলল, থাকগে।
অবাক সরিৎ বলে, থাকবে মানে? অন্তত চার-পাঁচ হাজার টাকার জিনিস। জল ঢুকলে একদম বরবাদ। আমি বরং গিয়ে একটা ব্যবস্থা করে আসি। চাবিটা দাও।
তৃষা আঁচলের গেরো থেকে চাবির গোছাটা মেঝে ছুড়ে দিয়ে বলে, লোহার আলমারিতে আছে। নিয়ে যা।
মেজদির মেজাজ দেখে সরিৎ অবাক হলেও কিছু বলল না। আলমারি খুলে দোকানের চাবি নিয়ে তৃষার হাতে আবার চাবির গোছাটা ফেরত দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। বারান্দা থেকে বলল, মংলু আর নিতাইকে নিয়ে যাচ্ছি। অনেক মাল, তুলতে লোক লাগবে।
তৃষা এ কথারও জবাব দিল না!
ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ঘনিয়ে উঠছে। ছেলেমেয়েরা অবশ্য অতটা খেয়াল করল না। স্বপ্না, মঞ্জু আর সজল কোথা থেকে একটা লুডো বের করে হ্যারিকেনের আলোয় খেলতে বসে গেল। অস্বস্তিটা শুধু টের পাচ্ছিল শ্রীনাথ। তৃষার কোনও বিস্ফোরণ নেই, চেঁচামেচি নেই, কিন্তু তার ঠান্ডা রাগ নানা পন্থায় শোধ নেয়। শশাধ নিতে তৃষা কখনও ভুল করেনি।
খুব চিন্তিত উদ্বিগ্ন মুখে সে তাই সজলের দিকে একবার তাকায়। বড় অবাধ্য হয়েছে ছেলেটা। একদিন ওর খাদ্যে পানীয়েও না অজানা বিষ এনে মেশায়। এত সাহস কি ওর ভাল?
একটু ভাবল শ্রীনাথ। তারপর নিঃশব্দে উঠে তৃষার কাছে জানালায় এসে দাঁড়াল। তৃষা একবার দেখল তাকে, তারপর উঠবার চেষ্টা করতেই শ্রীনাথ বলে, বোসো, বোসো। বলছিলাম কী, সজল নিতান্ত ছেলেমানুষ।
আমি তো সেটা জানি। তৃষা অবাক হয়ে বলে।
শ্রীনাথ তৃষার মুখের কঠিন আস্তরণটা লক্ষ করে এই আবছা আলোতেও। মনে মনে প্রমাদ গুনে গলাটা পরিষ্কার করে নিতে বার দুই গলা খাঁকারি দেয়। তারপর বলে, ওর ওপর রাগ পুষে রেখো না। এই বয়সটা বাঁধ ভাঙারই বয়স আমি জানি, ও তোমাকে খুব ভালবাসে।
তৃষা জবাব দিল না। শ্রীনাথ জবাবের আশায় একটু সময় ফাঁক দিয়ে বলল, আর মায়ের শাসনকে একটা বয়সের পর ছেলেপুলেরা বড় একটা মানতে চায় না। আমরাই তো দেখো না, দশ-বারো বছর বয়স থেকে মাকে আর ভয়-টয় পেতাম না। মায়ের সঙ্গে ছেলেপুলেদেব সম্পর্কটাই ওরকম যে!
বলে শ্রীনাথ একটু মনভোলানো হাসি হাসল।
তৃষা চুপ করে যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইল।
