ভিতরবাড়ির দিকে এতক্ষণে বাতি দেখা গেল। ইলেকট্রিক অনেকক্ষণ নেই। কযেকটা হ্যারিকেন আর টর্চ ঘোরাফেরা করছে। দুটো ছাতা হাতে নিয়ে দৃষ্টির মধ্যে একটা গামছা মাথায় মংলু খপাৎ খপাৎ করে জল ভেঙে এসে বলল, মা বলছেন আপনারা সব ভিতরবাড়ির বড় ঘরটায় চলে আসুন। ওটার ভিত উঁচু আছে।
শ্রীনাথ হতাশ গলায় বলে, কত আর উঁচু? এই জলে যে সৃষ্টি ভেসে যাবে। এই হারে বাড়লে সকাল নাগাদ ঘরের চালে উঠেও রক্ষা পাওয়া যাবে না।
তবু যতটা পারা যায়। আমি আপনার ঘরেব কিছু জিনিসপত্র পাটাতনে তুলে রাখি গে। আয় রে নিতাই, একটু হাত লাগাবি!–বলে নিতাইকে নিয়ে মংলু ঘরে গিয়ে ঢোকে।
সজল বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ঢলো বাবা।
সজলের হাতটা অবশ্য ধরল না শ্রীনাথ কিন্তু জলে নেমে পড়ল। বলল, চল। দোতলাটা তুলে রাখলে আজ এই বিপদে কিছু হত না।
তৃষা তার ঘরের দাওয়ায় মস্ত টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে। পাশেই সরিৎ। তৃষার শাড়ি সপসপে ভেজা, চুল থেকে জল পড়ছে।
সজল জিজ্ঞেস করে, তুমি ভিজলে কী করে?
দুটো হাঁস বেরিয়ে গিয়েছিল। ধরে আনলাম।
ধরার লোক ছিল না?
কাকে ডাকব, কে শুনবে এই বৃষ্টিতে?— বলে তৃষা শ্রীনাথের দিকে চেয়ে বলে, বারান্দার ওই কোণে বালতিতে ভাল জল ভোলা আছে। হাত-পা ধুয়ে ভাল করে জল মুছে বিছানায় গিয়ে বোসো। আমি চায়ের জল চড়িয়ে এসেছি। মঞ্জু চা করে দেবে। সজলও যা।
শ্রীনাথ লক্ষ্মীছেলের মতো তাই করল। সজল শুধু ঠোঁট উলটে বলে, ঘরে বসে থাকার মানেই হয় না। আমি বরং আশপাশটা দেখে আসি, কে কী করছে।
তৃষা চাপা গলায় বলল, না। এই বৃষ্টিতে যাবে না। কাল সকালে সব খবর নিয়ে।
সজল তর্ক করল না। কিন্তু কোমরে হাত রেখে বারান্দায় বেপরোয়া এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
ভিতরে কেরোসিনের স্টোভে মঞ্জু চা করছে। বিছানায় পা তুলে বসল শ্রীনাথ। অল্প আলোতেও ঘরে মেলা ঘুরঘুরে পোকাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। বাইরে জল জমলেই এরা ঘরে ঢুকে পড়ে। বৃষ্টিটা কিছুতেই ধরছে না।
বাইরে বৃন্দাই বোধ হয় চেঁচিয়ে জানান দিল, পশ্চিমের ঘরে জল ঢুকছে।
তৃষা ঘরে আসে। তার মুখে কোনও উদ্বেগ নেই, তবে একটা কাঠিন্য আছে। ঘরের পাটাতনের সঙ্গে একটা কাঠের মই লাগানো। একটা বাক্স হাতে তৃষা তরতর করে পাটাতনে উঠে বাক্সটা রেখে নেমে এল আবার।
শ্রীনাথ বিরক্ত হয়ে বলে, কবেই তো তোমাকে বলেছিলাম, এবার দোতলাটা করো। এসব জায়গায় জল হবেই। রাতে আমি জল নিয়ে একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখেছি।
তৃষা তার বড় বড় চোখে চেয়ে বলে, দোতলা? দোতলা দিয়ে কী হবে? আমরা তো এখানে চিরকাল থাকব না।
থাকব না! তা হলে কোথায় যাব?
তা জানি না। তবে এখানে নয়।
এখানে নয় কেন?
এ জায়গা আমার আর ভাল লাগছে না।
শ্রীনাথ খিচিয়ে ওঠে, তোমার ভাল না লাগলেই হবে! আমরা কি সব তোমার হাতের পুতুল! আমিও পুতুল। রাগ কোরো না। আমার মনে হয়, এখানে থাকলে আমাদের কারও ভাল হবে না।
সে তো এখন বলছ। কিন্তু এক সময়ে এখানে শেকড় গেড়ে বসার জন্য তুমিই জমিজমা কিনে গেছ অন্ধের মতো, দোকান দিয়েছ, ধানকল করেছ, সেগুলোর কী হবে?
শান্ত স্বরেই তৃষা বলে, আমিই যখন করেছি তখন সে দায়ভারও আমার। তুমি তো খবর রাখো, ধানকল বেচে দিচ্ছি শিগগিরই। দোকানটার ভাল দাম পেলেই ছেড়ে দেব। জমিজমাও কিছু কিছু করে বিলি বন্দোবস্ত হচ্ছে।
শ্রীনাথ বিরক্ত হয়ে বলে, যা খুশি করো। আমার কী? আমার সম্পত্তি তো নয়।
তৃষা একটু হেসে বলল, না হলে কী হয়, খুব চিন্তায় তো পড়েছ দেখছি। অত চিন্তা কোরো না। লোকে আমার যত বদনামই করুক, কেউ অন্তত আমাকে বোকা ভাবে না।
শ্রীনাথ হঠাৎ বলল, কিন্তু আসলে তো তুমি বোকাই।
তাই নাকি?
বোকা নও? বোকা না হলে আজ তোমার সংসার এত সৃষ্টিছাড়া কেন? মেয়েমানুষের একটা সীমা আছে, গণ্ডি আছে। সেটা যে ডিঙিয়ে যায় সে নিশ্চয়ই বোকা।
তুষার তর্ক আসে না। ঝগড়া করতে সে ভালবাসে না। উপরন্তু সে দেখতে পায়, সজল দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। চৌকাঠে ঠেসান, কোমরে হাত, চোখ দুখানায় ঝলমলে কৌতুক। ওর পায়জামাটা উরু পর্যন্ত ভেজা, মাথার ঘন চুলে অজস্র ফেঁটা লেগে আছে।
তৃষা সজলের দিকে এক পলক চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, পায়জামাটা পালটে নাও। ঠান্ডা লাগবে।
আমার পায়জামা-টায়জামা সব পশ্চিমের ঘরে।
আমার একটা শাড়ি প্যাঁচ দিয়ে পরে থাকো। ওই আলনায় আছে।
সজল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, আমরা এ জায়গা ছেড়ে কোথায় যাব মা?
কোথাও যাব।
এ জায়গা আমি ছাড়ব না।
তোমার ইচ্ছেয় সব হবে নাকি?
এ জায়গায় যে আমরা সেট করে গেছি। অন্য কোথাও গেলে পুরনো বন্ধুদের কোথায় পাব?
নতুন বন্ধু হবে।
নতুন বন্ধু চাই না।
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, না যেতে চাইলে তোমরা এখানেই থেকো।
তুমি থাকবে না?
না। আমি চলে যাব।
একা?
দরকার হলে একাই।
সজল হঠাৎ একটু হাসল, মেয়েরা একা থাকতে পারে নাকি? তোমার বাজার করে দেবে কে?
তৃষা ক্লান্ত মুখে ছেলের দিকে চেয়ে বলে, ওসব কথা এখন থাক। পায়জামাটা ছাড়বি কি না! ক’বার বলতে হবে?
আমি শাড়ি পরব না।
তা হলে মংলুকে বল, পশ্চিমের ঘর থেকে পায়জামা এনে দেবে।
আগে বলো তুমি কোথায় যাবে?
আমি তোদর সঙ্গে থাকব না। এখানেও থাকব না।
আমাদের কি তুমি দেখতে পারো না মা?
তৃষা এ কথার জবাব দিল না। খাটের তলা থেকে তোরঙ্গ টেনে বের করে ডালা খুলে জিনিসপত্র ঘাঁটতে লাগল।
