তবু শান্ত ধ্যানমগ্ন নীলিমায় ফের আর-এক ফোটা জল জন্ম নেয়। দেখে শ্রীনাথ। আর আতঙ্কে নীলবর্ণ হয়ে চেঁচাতে থাকে, কী হল? কী হচ্ছে আঁ!
ঠিক এই সময় তাকে ঠেলে তোলে সজল, বাবা! ও বাবা! কী হয়েছে?
ঘুম ভেঙে শ্রীনাথ উঠে বসে তড়াক করে। স্বপ্নের ঘোর এখনও কাটেনি।
বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে?— সে জিজ্ঞেস করে।
সজল অবাক হয়ে বলে, হচ্ছে তো। রাত থেকেই হচ্ছে। একটানা। তোমাকে বোবায় ধরেছিল বাবা?
শ্রীনাথ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। কথা বলতে পারে না। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টির শব্দ। লক্ষণ ভাল নয়। বছর পাঁচেক আগে এ রকম সাংঘাতিক একটানা বৃষ্টির পর এ বাড়িতে কোমরসমান জল দাঁড়ায়। পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে সপরিবারে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল তাকে। এই বৃষ্টিটাকে তাই শ্রীনাথ খুব সন্দেহ করে। স্বপ্নটাও জলেরই স্বপ্ন। কী হয় কে জানে!
শ্রীনাথ বলল, যা তো, উঠোনে কতটা জল জমেছে দেখে আয়।
সজল টর্চ হাতে উঠে দরজা খোলে, উঃ ব্বাস! খুব জল জমেছে গো বাবা। অনেক।
কতটা? –উদ্বেগে শ্রীনাথের গলা সরু হয়ে যায়।
দু’ফুট হবে।
দু’ফুট মানে অনেক জল। হাঁটুর ওপর হবে!–শ্রীনাথ উত্তেজিত গলায় বলল, তা হলে এখুনি আমাদের অন্য কোথাও চলে যাওয়া দরকার। ভিতরবাড়িতে ওরা কেউ কিছু টের পাচ্ছে না নাকি? তোর মাকে একটা খবর দে।
সজল বেশির ভাগ সময়েই শ্রীনাথের অকারণ উদ্বেগ দেখে হাসে। কিন্তু এখন হাসল না। বারান্দায় ফিরে গিয়ে উঠোনের জলে টর্চের আলো ফেলে সে দেখতে পেল স্রোত চলছে। স্রোতটা আসছে নদীর দিক থেকে। মাটির বাঁধটা যদি ভেঙে গিয়ে থাকে তবে ব্যাপারটা আর হাসিঠাট্টার নয়।
স্বপ্নটা এখনও শ্রীনাথকে তাড়া করছে। সে বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে সজলের পাশে দাঁড়ায়।
ও বাবা! এ যে ভীষণ জল রে!
সজল বলে, তুমি অত ভেবো না তো বাবা।
তোর মাকে অনেক দিন আগেই আমি বলেছিলাম, দাদার ঘরের ওপর একটা দোতলা তুলতে। দোতলা হলে বানের জলে তেমন ভয় নেই।
এখন আর সে কথা বলে কী হবে?
জলটা বাড়ছে না? টর্চটা জ্বালা তো।
সজল টর্চ জ্বালল। জল বাড়ছে কি না বোঝা গেল না। তবে জল যে পাক খাচ্ছে, স্রোত চলছে তা বোঝা যাচ্ছিল।
ঘরের পিছন দিক থেকে বৃষ্টির শব্দের ভিতর দিয়েও একটা চেঁচামেচির শব্দ আসছিল। কান পেতে শব্দটা বোঝার চেষ্টা করছিল শ্রীনাথ। বলল, নিতাই চেঁচাচ্ছে না?
নিতাই বটে। একটু বাদে অন্ধকার ফুড়ে বৃষ্টি ভেদ করে দুই মূর্তি উঠে এল বারান্দায়। মাথায় পোঁটলা, হাঁড়ি, টিনের বাক্স।
নিতাই একগাল হেসে বলল, আগেই বুঝেছিলাম, এবারও খরা হবে। তাই সেই বোশেখ মাসে একটা বরুণ বাণ মেরে রেখেছিলাম। তাজ্জব কাণ্ড! সেই বাণে যে এতটা হবে তা বুঝতে পারিনি।
সজল টর্চটা ঘুরিয়ে নিতাইয়ের মুখে ফেলতেই নিতাই সামলে গেল। ঢোক গিলে বলল, ছোটকর্তা নাকি? হেঃ হেঃ, ভিজে একেবারে ঢোল হয়ে গেছি দেখুন!
গুল মারাটা বন্ধ করবে এবার থেকে?
নিতাই আবার ঢোক গিলল। বলতে নেই, কর্তামাকে সে ভয় খায় বটে, কিন্তু বুকের মধ্যে ততটা গুড়গুড়ুনি ওঠে না। কিন্তু এই ছোকরার মুখোমুখি পড়লেই তার আজকাল পায়ের তলায় ভূমিকম্প হতে থাকে।
নিতাইয়ের বউ কথা বলছে না। ভেজা কাপড়ে বারান্দার এক ধারে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।
শ্রীনাথের কষ্ট হল। জিজ্ঞেস করল, তোদের শুকনো জামাকাপড় নেই?
মেয়েটা মাথা নাড়ল, নেই।
ভেজা কাপড়ে এই হাওয়ায় বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে যে!
এ কথায় নিতাই আর তার বউ হেসে ফেলে। নিতাই বলে, বাবুর যেমন কথা! কোন দালানকোঠাওলা বাড়ির মেয়ে যে ঠান্ডা লাগবে! বরাবর বৃষ্টি হলেই ভিজেছে। ওসব সয়ে গেছে ওর।
তোর ঠান্ডা লাগে না?
সজল সামনে না থাকলে নিতাই এ কথায় হেসে উঠত। শোনো কথা! মহাযোগী নিতাই খ্যাপার নাকি ঠান্ডা লাগবে! কিন্তু সজল খোকা থাকায় নিতাই অতটায় গেল না। বিজ্ঞের মতো একটু হেসে বলল, আজ্ঞে, আমিও রোদে-জলে মানুষ। আপনি ভাববেন না।
কিন্তু শ্রীনাথ ভাবে। আগে পৃথিবীর সম্পর্কে খানিকটা উদাসীনতা ছিল তার। আজকাল সব কিছু নিয়ে উদ্বেগ। বলল, খুব বাহাদুর তোরা বুঝেছি। এখন ঘরে গিয়ে আলনায় দেখ, গোটা কয়েক জলে কাচা ধুতি আছে। পুরনোই। দু’জনে পরে নে। যা।
বউটা মৃদু স্বরে বলে, না বাবা, আপনার পরনের ধুতি পরতে পারব না। বড্ড পাপ হবে।
তোর মাথা হবে! গুরুজনদের কথা শুনতে হয়। যা।–শ্রীনাথ ধমক দেয়।
সজল টর্চের আলোটা নিতাইয়ের বউয়ের দিকে তাক করে বলল, যাও না ভৈরবীদি। বাবা বলছে যখন, যাও।
ভৈরবী ওর নাম নয়। কিন্তু নিতাইয়ের বউযের এ নামটাই চালু হয়ে গেছে। তান্ত্রিকের বউ বলেই বোধ হয়।
টর্চের আলোয় লজ্জা পেয়ে বউটি তার তেলে কাপড়ের ঘোমটার তলায় মূখ আড়াল করে বলে, আমার শীত লাগছে না।
নিতাই অবশ্য বাবুর দু-দুটো ধুতি হাতানোর এই মওকাটা ছাড়তে চাইছিল না। বউয়ের দিকে চেয়ে বলল, বাবু হল ভগবানের মতো। তা ভগবানেব দেওয়া আলোটা বাতাসটা কলাটা মলোটা নিলে আর দোষের কী? যাও কাপড়টা ছেড়ে ফেলো গিয়ে।
বউটা জেদি আছে। রাজি হল না। চক্ষুলজ্জায় নিতাইও গেল না।
টর্চ জ্বেলেই রেখেছে সজল। জল ইঞ্চিখানেক বেড়ে গেল দেখতে না দেখতেই।
নিতাই বলে, মাটির বাঁধটা গেছে। এই সেদিনও দেখি, পরাশর ঘর তুলবে বলে বাঁধ থেকে মাটি কাটিয়ে আনছে। পইপই করে বললুম, বাপু, তোমরা সবাই যদি বাঁধের মাটি চুরি করে তা হলে কিন্তু একদিন বিপদ আছে। এই নদীর চেহারা এমনিতে ভালমানুষের মতো কিন্তু খেপলে সমদূরে।
