বেকার জীবনের একটা শূন্যতা আছে। সর্বদাই একটা খাঁ-খাঁ করা ভাব বুকের মধ্যে। মনে হয়, ভিতরের অনেক আগুন কাজে না লেগে আস্তে আস্তে নিভে আসছে। চাকরির জন্য সরিৎ পলিটিক্স করেছে, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লেখানো থেকে শুরু করে নানাবিধ পোস্টাল ট্রেনিং নিয়েছে, শর্টহ্যান্ড আর টাইপ শিখে রেখেছে। কিছুতেই কিছু হয়নি। সরকারি চাকরির বয়স পার হতে চলল। এখন কেমন যেন একটা নেতিয়ে পড়া ভাব, কিছু হবে না’ গাছের একটা ধারণার কাছে আত্মসমর্পণের ঝোক এসেছে। শুনেছিল তার গরিব সেজদির অনেক টাকা হয়েছে, ভাসুরের সম্পত্তি পেয়েছে বিস্তর, তাছাড়া নগদ টাকাও। কিন্তু তখন তার কাছে যাওয়া বা তার সাহায্য চাওয়াটা ভারী লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ সম্পত্তি পাওয়ার কিছুকাল আগেই সেজো জামাইবাবুর প্লুরিসির চিকিৎসার জন্য ভাইদের কাছে কিছু টাকা হাওলাত চেয়েছিল সেজদি। কেউই টাকাটা দেয়নি। ঘরের ঘটিবাটি গয়না বিক্রি করে সেজদিকে সে যাত্রা সামাল দিতে হয়। অভাবের সংসার থেকে বড় মেয়ে চিত্রাকে পাচার করতে হয়েছিল সেদিকে মেজদির কাছে, এলাহাবাদে। তখন সেজদিকে সবাই সাহায্য করার ভয়ে এড়িয়ে চলত। সেই সেজদি হঠাৎ বড়লোক হওয়ার পর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে যাওয়াটা কি লজ্জার নয়?
বহুকাল বাদে সেজদি হঠাৎ একটা চিঠিতে সরিৎকে তার কাছে যেতে লিখেছে। সরিৎ বড়দার সংসার থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। সেজদির কাছেও হয়তো তেমন আদর হবে না। না হোক। আদর ভালবাসা কেমন তা ভুলেই গেছে সরিৎ। মধ্যপ্রদেশে মেজদার কাছেও আর আশ্রয় নেই। মেজদা একটা খনিতে কাজ করে। সামান্যই পায়। মা বাবা তার ঘাড়ে থাকায় সে আর কোনও দায়িত্ব নিতে নারাজ। বড়দি কেরানির ঘর করে নিউ কুচবিহারে। কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। মেজদি অবশ্য বড়লোক। কিন্তু বাপের বাড়ির সঙ্গে তারও বিশেষ সম্পর্ক নেই। মেজদিকে ভাল করে চোখেই দেখেনি সরিৎ। বড়লোক বলে ভয়ও পায়। সরিতের কাছে সব দরজাই বন্ধ ছিল। এখন হঠাৎ সেজদির দরজাটা খুলেছে। আদরের কথা সে আর ভাবে না, শুধু একটা আশ্রয়ের কথা ভাবে।
গাড়ি ফরাক্কা ব্যারেজ পার হচ্ছে গুমগুম শব্দ করে। প্রচণ্ড শীত। মাফলারের অভাবে সরিৎ রুমালটা দু’ভঁজ করে কান ঢেকে কপালে গেরো দিয়ে বসল। পুরনো পুলওভারে শীত মানতে চায় না। হাত-পা অবশ করা শীত থেকে পরিত্রাণ পেতে সে অনেক হিসেব করে একটা সিগারেট ধরাল। টাকার অভাব তো অনেক বড় জিনিস, তার চেয়েও ছোট জিনিস আধুলিটা সিকিটা নিয়ে সরিৎকে অনবরত মাথা ঘামাতে হয়। ছোট জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতে ভিতরের মানুষটাও কি ছোট হয়ে যায় না?
বাঁপাশে দুটো পুলিশ, ডানধারে ফালতু যাত্রীরা। যাত্রীদের মধ্যে ঠিক পাশে বসা লোকটাকে সরিৎ মালদার বাজার-হাটে দেখেছে। সঠিক পরিচয় না জানলেও মুখচেনা। লোকটা হঠাৎ বলল, আপনি ডাক্তারবাবুর ভাই না?
হুঁ।—গম্ভীর গলায় আওয়াজ দেয় সরিৎ।
কলকাতায় যাচ্ছেন কি ইন্টারভিউ দিতে নাকি?
না। দিদির বাড়ি বেড়াতে।
অ। মলিনকে চেনেন? মলিন সাহা?
মলিনকে চেনে সরিৎ। তারই বয়সি ছেলে। খুব ফাঁটে একটা স্কুটার হাঁকিয়ে বেড়ায়, পরনে সবসময়ে দারুণ সব জামা প্যান্ট। শুনেছে বড়লোকের ছেলে। মলিনের বোন মলিনা বিখ্যাত সুন্দরী। তার জন্য কলেজের পথে বিস্তর ছেলে লাইন দেয়। সরিৎ দিয়েছে। সরিৎ বলল, চিনি। কেন বলুন তো!
আমি মলিনের বাবা।
শুনে সিগারেটটা ফেলে দেওয়া উচিত হবে কি না ভাবছিল সরিৎ। ভারী অবাকও হচ্ছিল সে। মলিনের বাপ বলে লোকটাকে বিশ্বাসই হয় না। কালো একটা তুসের চাদর আর মাফলার জড়িয়ে দানহীনের মতো বসে আছে। কিন্তু দীনেন সাহা যে ডাকের বড়লোক, এ সবাই জানে। লোকটা মালদায় স্থায়ীভাবে থাকে না। থাকলে চিনতে পারত সরিৎ। শুনেছে, লোকটার চারটে মিনিবাস চালসা, শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া অঞ্চলে চালু আছে। আর আছে হরিশ্চন্দ্রপুরে আমরাগান, শিলিগুড়িতে ঠিকাদারি। লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক দীনেন সাহা বিনা টিকিটে এইভাবে যাচ্ছে দেখে ভারী অবাক হল সে।
সরিৎ ভেবেচিন্তে সিগারেটটা হাতের আড়াল করেই ফেলল। উঠে বাথরুমে গিয়ে খেয়ে আসবে।
দীনেন সাহা কিন্তু নিজেই পকেট থেকে বিড়ি বের করে বলল, আপনার ম্যাচিসটা একটু দিন তো!
দেশলাইটা দিতে পেরে আর সংকোচ রইল না সরিতের। মুখটা একটু নিচু করে সিগারেটে আর-একটা টান দিল।
দীনেন সাহা ম্যাচটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ট্রেন লেট আছে।
হুঁ। —আওয়াজ দেয় সরিৎ। মনে মনে বলে, হাঁ বে শালা শ্বশুর, লেট আছে।
খুব বিষয়ী চোখে সরিৎকে আর-একবার দেখে নিয়ে দীনেন সাহা বলল, রেলগাড়ির যা অবস্থা হয়েছে আজকাল, বলার নয়। গত দশ বছর আমি টিকিট কেটে কোথাও যাইনি। ব্যবস্থা যখন আছে, টিকিট কেটে যাবই বা কেন? যাদের ফালতু পয়সা আছে তারা যাক।
সরিৎ সিগারেটটা শেষ করে বাঁচল। লোকটা যদি সত্যিই কোনওদিন তার শ্বশুর হয়?
দীনেন সাহা জিজ্ঞেস করে, আপনি চাকরি-বাকরি করেন নাকি?
না। চেষ্টা করছি।
মলিনটার তো কাজকারবারে মন নেই। খুব বাবুগিরিব দিকে নজর।
সরিৎ একটু হাসে মাত্র। মনে মনে বলে, আমাকে জামাই করলে তোমার কাজকারবারে বিনে মাইনেয় খাটব, বুঝলে হে শ্বশুরমশাই?
দিদির বাড়ি কলকাতার কোথায়?—দীনেন জিজ্ঞেস করে।
কলকাতায় ঠিক নয়। কাছেই রতনপুর নামে একটা জায়গা। হাওড়া থেকে যেতে হয়।
