দিলীপ একটু সময় নিল চিনতে। তারপর বলল, ওঃ দীপু! তাই বল। না রে প্রীতম আসেনি। তবে আসবে বলে বহুকাল আগে একটা চিঠি দিয়েছিল।
কথাটা দীপনাথ বিশ্বাস করল না। কারণ, এতকাল বাদে দেখা হওয়া সত্ত্বেও দিলীপ তাকে ঘরে নিয়ে যেতে চাইছে না। দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দীপনাথ ভারী ক্লান্ত। কাজেই কথার মারপ্যাচে গেল না। একটুক্ষণ চেয়ে রইল দিলীপের দিকে। তারপর বলল, তুই আজকাল কী করিস?
বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাই। একটা স্কুল করেছি।
চলে সেটা?
চলে যায়।
এই বাড়িতে?
এই বাড়ি আর কোথায়! একখানা মোটে ঘর আমার।
বসতে বললি না?
বসবি?—খুব অনিচ্ছার সঙ্গে দিলীপ বলে, আয় তা হলে।
দিলীপ দরজা ছেড়ে ভিতরে সরে যাওয়ায় খুব হতাশ হল দীপনাথ। দরজা যখন ছেড়ে দিল তখন প্রীতম নেই। ঠিকই নেই।
প্রীতম ছিলও না। ঘরে এলোমেলো রঙের পাত্র, তুলি, ভাঙা গ্লাস আর কাপ, ক্যানভাস, ইজেল ছড়ানো। সরু চৌকিতে নোংরা বিছানা। একধারে জনতা স্টোভ, অ্যালুমিনিয়াম আর কলাই করা বাসন। দারিদ্রের গভীর ক্ষতচিহ্নগুলি চারদিকে ছড়ানো। একটা দেশি মদের বোতলের মুখে একটা রক্তজবা গুঁজে রেখেছে দিলীপ। বোধহয় প্রতীক।
কোমরে হাত রেখে আশাহীন চোখে চারদিকে চেয়ে দেখে দীপনাথ। প্রীতম এলেও এখানে বেশিদিন থাকতে পারত না। এই পরিবেশ সহ্য করার সাধ্য প্রীতমের নেই।
ভদ্রতাবশে খানিকক্ষণ বসে উঠে পড়ে দীপনাথ। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিড়ে গেছে কবে। এখন দেখা হলে কথা আসে না। কোনও আবেগ বোধ করে না।
দীপনাথ দুপুরে একটা বাস ধরে সন্ধেবেলা শিলিগুড়ি ফিরে এল। প্রীতমের বাড়িতে গেল না। পিসির বাড়িতে ফিরে একটু খেয়ে সন্ধে থেকে ভোর অবধি ঘুমোল। পরদিন একটা জিপ ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ল অফিসের কাজে। দার্জিলিং জলপাইগুড়ি গ্যাংটক ছুটে বেড়াল দিন দুই। কিন্তু সারাক্ষণ মনটা প্রীতম প্রীতম’ করে যায়। একবারও একটুক্ষণের জন্যও ভুলতে পারে না।
রওনা হওয়ার দিন সকালে প্রীতমের বাড়িতে একবার গেল দীপনাথ। বিমর্ষ মুখ। হতাশায় মনটা বড় ভারী।
শতম দরজা খুলে চুপ করে রইল।
দীপনাথ বলল, আজকের ফ্লাইটে চলে যাচ্ছি। কোনও খবর পেলে জানাস।
শতম মাথা নাড়ল। জানাবে।
শতমের মুখ-চোখে বিমর্ষতা ভেদ করে একটা দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছিল। স্নায়ু খুব টান টান। সজাগ।
দীপনাথ বলল বীনাগুড়িতে শুভব্ৰতর বাড়িতে কয়েকদিন ছিল, জানিস?
শুনে চমকে ওঠে শতম, সত্যি?
সত্যি। শুভব্রতর বউ বলল, খুব নাকি ধর্মের কথা বলত।
বলত?–শতমের মুখে ভোরের মতো স্নিগ্ধ প্রসন্নতা।
সেখান থেকে কোথায় গেল?
মাথা নাড়ে দীপনাথ, জানি না। তবে পুলিশকে খবরটা দিলে ওরা হয়তো ট্রেস করতে পারে।
পুলিশ!—শতম বিরক্ত হয়ে বলে, ওরা কিছু করবে না। ওদের অনেক পলিটিক্যাল ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে। দাদা তো আমার দাদা, সরকারের কে?
শুভব্রতর ঠিকানাটা সোজা। বীনাগুড়িতে গিয়ে শুভব্রত মজুমদারের নাম বললেই হবে। পারলে তুই একবার যাস।
আজই যাব।
দীপনাথ দুপুরে বাগডোগরা থেকে প্লেন ধরল। বড় শূন্যতা বুক জুড়ে। প্রীতম নেই। পুরনো চাকরি ছেড়ে নতুন কোম্পানিতে চলে যাচ্ছে সে। জীবন থেকে অনেক কিছুই কি হারিয়ে যাচ্ছে না? প্রীতম, মণিদীপা, বোস সাহেব!
প্লেন যখন উড়ছিল তখন উত্তরের মহামহিম পর্বতমালার দিকে নিস্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে ছিল দীপনাথ। পাহাড় অবিরল তাকে ডাকে। আয় আয় আয় আয়। যাওয়া হয় না যে!
যখন চাকরি ছিল না দীপনথের, তখন বোস সাহেবের ফাইফরমাশ খেটে চাকরি রাখতে হয়েছে। কিন্তু আজকাল এ-বেলা ওবেলা চাকরির টোপ ফেলে বিভিন্ন কোম্পানি। সে কলকাতায় ফেরার পরদিনই অফিসে টেলিফোন এল।
চ্যাটার্জি? আমি সানফ্লাওয়ার এজেন্সির মিত্র বলছি।
আরে বলুন, কী খবর?
অনেকদিন খবর নেন না। কেমন চলছে?
ওই একরকম।
শুনুন, একটু কথা আছে। জরুরি।
ফোনে বলা যাবে?
না। ছুটির পর ক্যালকাটা ক্লাবে চলে আসুন। আই উইল বি দেয়ার।
দীপনাথ জানে কী কথা। আরও ভাল অফার। আরও বেশি দায়-দায়িত্ব। তার বড় ক্লান্তি লাগে।
তবে মিত্র ভারী খুশি হল দীপনাথকে পেয়ে। ডিনারের পর গাড়িতে পৌঁছে দিল এসপ্ল্যানেড অবধি। গাড়িতেই কথা হয়।
আমাদের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল, জানেনই তো।
জানি। সব কোম্পানিকেই জানি।—দীপনাথ ক্লান্ত গলায় বলে।
রজার্স আপনাকে যা দিতে চায় আমরা তাই দেব।
কিন্তু রজার্স আগে কনট্যাক্ট করেছে।
কথাটা আমি শেষ করিনি চ্যাটার্জি। রজার্স যা আপনাকে দিতে পারে না তা হল ছ’মাস নিউইয়র্কে পোস্টিং।
নিউইয়র্ক!—দীপনাথ সত্যিই চমকায়।
নিউইয়র্ক ফর এ নমিনাল ট্রেনিং। অবশ্য তার জন্য একটা বন্ডও সই করতে হবে। তিনবছর কোম্পানিকে সার্ভ করবেন। রাজি?
রজার্সের খবর আপনাকে কে দিল?
মিত্র হাসে, খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কথাটা হল, সানফ্লাওয়ার আপনাকে চায়।
ভেবে দেখি।
দেখুন। আমরা একমাস অপেক্ষা করব।
মিস্টার মিত্র, আমি খুব টায়ার্ড ফিল করি আজকাল। আমার মন ভাল নেই। পার্সোনাল কিছু ঘটনার জন্য। গিভ মি সাম মোর টাইম।
মিত্র খুবই ভদ্রলোক। তবু হঠাৎ বলে ফেলল, দ্যাট অ্যাফেয়ার উইথ মিসেস বোস?
আবার চমকায় দীপনাথ। কিন্তু কথা বলতে পারে না কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে না জানায়।
মিত্র একটু লজ্জা পেয়ে বলে, সরি। কথাটা আনগার্ডেড মোমেন্টে বেরিয়ে গেছে। কিছু মনে করবে না। বাট দ্যাট ইজ দা টক অফ দি টাউন। অল বোগাস স্ক্যান্ডাল। যাকগে, ডিসিশন নিতে আপনার কত সময় লাগবে?
