আজই আমাকে শিলিগুড়ি যেতে হচ্ছে বোস সাহেব।
বোস একটু অবাক হয়। তারপর হেসে বলে, আপনি তো আমাদের ছেড়ে চলেই যাচ্ছেন। আবার এই উটকো ছুটি কেন?
ব্যক্তিগত জরুরি দরকার।
খারাপ কিছু?
খুব।
দেন মেক ইট অ্যান অফিসিয়াল ট্যুর।
তা হয় না।
হয়। নর্থ বেঙ্গলে আমাদের একটু কাজও আছে। কবে যাচ্ছেন?
আজকের ফ্লাইটে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে এনেছি।
অফিসের গাড়ি নিয়ে চলে যান। মেক ইট অফিসিয়াল। নর্থ বেঙ্গলে আমাদের কী কাজ আছে তা আপনি তো জানেনই।
সময় পাব কি না সেটাই প্রশ্ন।
টেক ইয়োর টাইম। ফিরে এসে বিল করবেন।
দীপনাথ হাসল। বলল, জানি বোস সাহেব।
ভ্রু কুঁচকেও বোস হাসল। সত্যিই তো। এই অফিসের দু’নম্বর লোকটা কি এসব প্রিলিমিনারিজ জানে না!
বোস বলল, চার্জটা কাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন?
যাকে বলবেন।
বোস একটু ভেবে বলে, থাকগে। আপনার অত সময়ও হবে না। আমি দেখে নেব।
পারবেন?
পারব। আই ফিল বেটার।
তা হলে যাই?
আসুন।
ঘণ্টা চারেক বাদে দীপনাথ শীততাপনিয়ন্ত্রিত সুগন্ধী বোয়িং-এর অভ্যন্তরে বসে গভীর ক্লান্তিতে চোখ বুজল। ভিতরটা কতখানি শূন্য তা টের পেল এতক্ষণে।
৭৪. প্রীতমের বাবা-মা আরও বুড়ো
প্রীতমের বাবা-মা আরও বুড়ো হয়ে গেছেন। ভাইবোনদের চেহারা শ্রীহীন। বাড়িটায় জমাট বেঁধে আছে এক শশাকের শূন্যতা।
দীপনাথকে যা বলবার তা বলল শতম, দাদা নিখোঁজ হওয়ার পর প্রায় একমাস কেটে গেছে। আমরা সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গায় খুঁজেছি। এখন আপনিই বলুন আর কী করা যায়?
দীপনাথের মন এখন স্থির হয়েছে। মাথা ঠান্ডা। সে ধীর গলায় বলল, অসুখে প্রীতম বাঁধা পড়েনি। রোগা শরীরেও ও বহুদূর চলে যেতে পারে। কিন্তু বাধা হবে টাকা-পয়সা। কোথাও গিয়ে বেশিদিন থাকতে হলে টাকা চাই। প্রীতম কত টাকা সঙ্গে নিয়ে গেছে জানিস?
না। ওর কাছে কত টাকা ছিল তা জানি না।
দীপনাথ মাথা নাড়ল, জানলে ভাল হত। তবে আমার মনে হয় লুকিয়ে থাকলে একদিন না একদিন হাতের টাকা ফুরোবে। তখন ঠিক খবর দেবে।
কোথায় দাদা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
কোনও চেনা লোকের কাছে নয়। ওর এই রোগা শরীরে কোনও লোকই ওকে লুকিয়ে রাখবে। চেনা লোক হলে খবর দেবেই।
আমাদের কি আর কিছু করার নেই দীপুদা?
দীপনাথ মৃদু একটু হেসে বলে, তোর তো ঠাকুরের ওপর অগাধ বিশ্বাস। তুই কেন তবে ভেঙে পড়ছিস? বিশ্বাসের জোর নেই?
এ কথায় হঠাৎ কেমন হয়ে গেল শতম। মুখের অসহায় ভাবটা আস্তে আস্তে কেটে গেল। চোয়াল শক্ত হল। কপালে কিছু কুঞ্চন দেখা গেল। চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধক করে। একটা বড় মাপের শ্বাস ফেলে বলল, মাঝে মাঝে একটু ভেঙে পড়ি ঠিকই। কিন্তু ভেবো না। আমার মন বলছে, দাদার কিছু হবে না।
দীপনাথ এরকম সরল বিশ্বাস আজকাল কারও মধ্যে দেখে না। তার নিজের কোনও বিশ্বাসের জমি নেই। শতমের এই রূপান্তর দেখে সে বুঝি একটু খুশি হল। বলল, আমি একবার বীনাগুড়ি চা বাগানে যাব। সেখানে আমাদের এক পুরনো বন্ধু আছে। দেখি যদি তার কাছে গিয়ে থাকে।
শতম গম্ভীর স্বরে বলল, দেখুন গিয়ে।
বীনাগুড়ি বেশিদুর নয়। পরদিন দুপুরেই সেখানে পৌঁছে গেল দীপনাথ।
শুভব্রত তাকে দেখে খুব অবাক হল না। বলল, আয়। প্রীতমের খোজে তুই যে আসবি তা প্রীতমই বলেছিল। আমার কথা কেউ না জানলেও তুই জানিস।
প্রীতম কোথায়?
তা কে জানে! মাসখানেক আগে দু’জন রাস্তার লোক ওকে পৌঁছে দিয়ে যায়। দিন চারেক ছিল। আমি ওর বাড়ি খবর পাঠাব বলে ঠিক করলাম। পরদিন সকালেই হাওয়া। অনেক খুঁজেও পাইনি। আর পাইনি বলে খবরও পাঠাইনি। কী জানি ওরা হয়তো আমাকে ভুল বুঝবে।
যে চারদিন তোর কাছে ছিল সেই কয়দিন কী করত?
কিছুই না। বারান্দায় বসে থাকত। আমার বউয়ের সঙ্গে গল্প করত।
তোর বউকে ডাক।
শুভব্রতর বউ এল। মিষ্টি দেখতে। দীপনাথের জেরার মুখে পড়ে বলল, কোথায় যেতে পারে কিছু আন্দাজ করতে পারছি না। তবে কলকাতায় যাবে না নিশ্চয়ই। কলকাতার ওপর খুব রাগ।
এখানে থাকার সময় ওর শরীর কেমন ছিল?
যা রোগা! আমি তো ভয়ই পেতাম।
হাঁটাচলা করত?
করত। শরীরে কুলোত না, তবু মনের জোরেই বোধহয় খুব স্বাভাবিক চলাফেরার চেষ্টা করত।
কী নিয়ে কথা বলত?
ধর্ম নিয়ে। সব সময় কেবল ধ্যানের কথা বলত। গীতার অনেক শ্লোক ব্যাখ্যা করত। বেশ লাগত শুনতে। ক’দিন ওর সঙ্গ পেয়ে আমারও একটু ধর্মভাব এসে গিয়েছিল।—বলে শুভব্রতর বউ একটু হাসল। তারপর হঠাৎ খুব নিশ্চিন্তের মতো গলায় বলল, ওরকম মানুষের কোনও ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না আমার।
দীপনাথ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ক্ষতি ওদেরই সবচেয়ে বেশি হয়। ও কখনও ওর বউ আর বাচ্চার কথা বলত না?
নিজে থেকে নয়। তবে আমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলে একটু-আধটু বলত।
দীপনাথের আর কিছু করার ছিল না। অসহায়তায় তার সমস্ত শরীর অবশ। একটা রাত সে শুভব্রতর কাছে থেকে পরদিন কুচবিহার রওনা হল। যদি দিলীপের কাছে গিয়ে থাকে। দিলীপ তাদের হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধু। এইসব বন্ধুর কথা আর কেউ জানে না। হঠাৎ হঠাৎ বন্ধু হয়ে হারিয়ে গেছে কবে। দিলীপ ছবি আঁকত। কিন্তু যশ প্রতিষ্ঠা কিছুই পায়নি। পাগলা মতো। অনেকদিন যোগাযোগ নেই।
মড়াপোড়াদিঘির কাছে দিলীপের ডেরায় যখন পৌঁছোল দীপনাথ তখন বেলা বেশি হয়নি। দিলীপ বাড়িতে ছিল। ভারী রোগা হয়ে গেছে। চুলগুলো পেকে একশা। আর্টিস্ট হলেই মদ খেতে হয়, এরকম একটা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে সেই স্কুলে থাকতেই মদ ধরেছিল। এখনও ধরে আছে। তবে শিল্প প্রায় ছেড়েই গেছে তাকে।
