মেসে ফিরে দেখল সুখেন বসে আছে তার জন্য। মুখটা কিছু করুণ, শুকনো। তাকে দেখে একটু চমকে উঠে বলে, কোনও খারাপ খবর নাকি দাদা?
দীপনাথ মাথা নাড়ল, খারাপ। খুব খারাপ।
কী হয়েছে?
জুতো মোজা ছাড়তে ছাড়তে সংক্ষেপে প্রীতমের ঘটনাটা বলল দীপনাথ। সুখেন মন দিয়ে শোনে। শুনতে শুনতে দুঃখের ভাব ফুটে ওঠে মুখে।
হাত-মুখ ধুয়ে এসে দীপনাথ যখন নিজের বিছানায় চিতপাত হয়ে শোয় তখন সুখেন খুব সন্তর্পণে বলে, আমার একটা কথা ছিল।
কী কথা?
বীথি বহুদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
বীথি?—বলে বিরক্তির ভাব দেখায় দীপনাথ, কেন?
ওর বাসায় একবার পায়ের ধুলো…
সুখেন!–বলে একটা ধমক দেয় দীপনাথ।
সুখেন কুঁকড়ে যায়। রুমমেট ছাত্রটি পরীক্ষার পর চলে গেছে। সিটটায় নতুন বোর্ডার আসেনি এখনও। তবে কাল বা পরশুই আসবে। তাই বাঁচোয়া।
সুখেন মুখখানা কাঁচুমাচু করে বলে, অন্য কিছু নয়। কেবল একটু ভাল খাওয়া-দাওয়া।
আমার মন ভাল নেই।
জানি। কিন্তু সেজন্য ঘরে বসে থেকেই বা কী হবে? বীথি আমাকে বলে দিয়েছে, আপনাকে আজই ধরে নিয়ে যেতে। ওর ছেলে আজ থাকছে না। আমরা তিনজন।
না সুখেন।একটু দুর্বল গলায় বলে দীপনাথ। কিন্তু এক শূন্যতাবোধ, নিরবল সময়ের এই ফাঁকটুকু তার একাও থাকতে ইচ্ছে করে না। প্রীতমের খবর বুকে পাথর হয়ে জমে আছে। আজ সারা রাত ঘুম হবে না। দুশ্চিন্তায় কণ্টকিত হয়ে থাকবে সে। তাই বীথির নিমন্ত্রণ এক জটিল মানসিকতার ধাঁধার ভিতর দিয়ে তাকে টানে। বস্তুত বীথির কাছে কিছু পাওয়ার নেই তার। তাই বোধহয় যেতে ইচ্ছে করে। সেখানে শোক নেই। যা আছে তা তাৎক্ষণিক। দাগ কাটবে না।
সুখেন আরও মিনিট পাঁচেক ঘ্যান ঘ্যান করার পর দীপনাথ ওঠে। খুব বিরক্তি আর অনিচ্ছার ভাব দেখিয়েই ওঠে। এবং পোশাক পরে।
বেরোবার সময় সুখেন বলে, আজ রাতে আমরা না-ও ফিরতে পারি।
কথাটা শুনেও শুনল না দীপনাথ। গা তবু শিউরে উঠল একটু। টানা রিকশায় বসে সারা রাস্তাটা সে একটাও কথা বলল না।
বহুদিন পর বীথির সঙ্গে মুখোমুখি। যেমনি সুন্দরী, তেমনি ক্ষুরধার বুদ্ধির সঙ্গে মেশানো নষ্টামি। দু’হাত বাড়িয়ে বলল, আজ যে কোনদিকে সূর্য উঠেছে!
দীপনাথ উদাস মুখে একটু হাসল।
আজ বৈঠকখানার সাজসজ্জা অন্যরকম। চমৎকার একগুচ্ছ ধূপকাঠি জ্বলছে। টাটকা রজনীগন্ধার গন্ধ। বীথির রান্নার লোকও আজ হাজির। দুর্দান্ত মাংসের গন্ধে পাড়া মাত। খুব আস্তে করে চালানো রেকর্ড-প্লেয়ারে সময়োচিত “এসো এসো আমার ঘরে এসো, আমার ঘরে…” বেজে যেতে থাকল। রবীন্দ্রনাথ সকলের জন্য লিখেছেন, তা জানে দীপনাথ, তা বলে বীথির ঘরে তার এই আগমনের জন্যও কি রবীন্দ্রনাথের কলম ধরার দরকার ছিল?
আগে চা। কেমন?–বলে বীথি উড়ে গেল ঘর থেকে ঠিক প্রজাপতির মতোই। শাড়িখানা দু’রকম ছাপা এবং খুবই নতুন ধরনের। বীথিকে মানিয়েছে এবং বয়সটাকে বছর দশেক কমিয়ে ফেলেছে।
সুখেন বীথির সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে গিয়েছিল। কিছু বলে থাকবে। চায়ের ট্রে নিয়ে বীথি যখন ফের ঘরে ঢুকল তখন তার মুখে করুণা। বলল, আহা রে! আমার ধারণা আপনার ভগ্নিপতি কোথাও গিয়ে পালিয়ে আছে।
দীপনাথ এ কথায় কোনও রা কাড়ল না।
বীথি বলল, অত মন খারাপ করবেন না তো। আপনার ওই ভগ্নিপতির কথা সুখেন আমাকে বলেছে। ও মানুষ সহজে মরবার নন।
দীপনাথ এ কথাটা বিশ্বাস করে। তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বীথি চা বানিয়ে কাপ হাতে তুলে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, আগে জানলে আজ আপনাকে কষ্ট দিতে টেনে আনতাম না।
দীপনাথ বলল, আজ বোধহয় আমার একটু অন্যমনস্ক হওয়ারও দরকার ছিল।
সত্যি বলছেন? সত্যিই।
কী যে কদিন ছটফট করেছি আপনার জন্য। কেবলই মনে হত, আপনি আর আসবেন না। ভীষণ রাগ করেছেন।
দীপনাথ মুখ নিচু করে চায়ে চুমুক দেয়।
বীথি আস্তে একটা হাত বাড়িয়ে দীপনাথের কপাল থেকে একটা চুলের গুছি সরিয়ে দিয়ে বলে, শরীরের দিকে একদম নজর দিচ্ছেন না।
দীপনাথের কাঁপের চা একটু চলকে যায়। সে চোখ বোজে। আর সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে ঘন্য জেদি একরোখা কিশোরীপ্রীতম মণিদীপা এসে দাঁড়ায়।
চোখ খুলে দীপনাথ বলে, খুব খাটুনি যাচ্ছে।
জানি। আপনি এখন বড় চাকরি করেন। আরও বড় চাকরিতে জয়েন করতে যাচ্ছেন।
সবই জানেন তা হলে।
বীথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এও জানি এরপর বীথির ঘরে আর কখনও পায়ের ধুলো পড়বে না আপনার।
দীপনাথ এই ঘনিষ্ঠতাটা উপভোগ করছিল এবং সেজন্য অবাকও হচ্ছিল কম নয়। সে বলল, কেন ডেকেছেন বলুন তো?
ও মা!–বীথি চোখ কপালে তুলে বলে, সেসবও কি খুলে বলতে হবে নাকি?
দীপনাথ একটু রূঢ় স্বরে বলে, কেন?
আপনার মেজাজ আজ ভাল নেই। আমি কিন্তু একেবারে হৃদয়হীনা নই। কোনও কোনও মানুষকে আমি সত্যিই ভালবেসে ফেলি। আপনি বিশ্বাস করবেন না, তবু বলছি, কথাটা সত্যি।
দীপনাথ জানে, সে এক ভিখিরি। বহুকাল ধরে তাকে কেউ সত্যিকারের ভালবাসেনি। বীথির কাছেও সেই ভালবাসা নেই। তবু ভান তো আছে। তাৎক্ষণিক? পুরো জীবনটাই তো আপেক্ষিকভাবে তাই।
বীথির ঘরেই খুব ভোরে ঘুম ভাঙল দীপনাথের। জাগা মাত্রই শঙ্খধ্বনির মতো বুকে ঢাক বেজে উঠল—প্রীতম।
আর কোনওদিকে তাকাল না দীপনাথ। ছেড়ে রাখা পোশাক পরে নিয়ে তড়িৎ পায়ে নেমে এল নীচে। তারপর মেসবাড়ি। দাড়ি কামানো, স্নান।
সাড়ে নটায় সে বোস সাহেবের চেম্বারে ঢুকল।
