বিলু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, তুমি ওকে কত ভালবাসতে তা আমি জানি সেজদা। দুঃখ পাবে বলে শিলিগুড়ি থেকে ফিরে প্রথমে খবরটা দিইনি। কিন্তু আমি একা আর পারছি না। আজই শতমের চিঠি এল। এখনও কোনও খোঁজ নেই।
দীপনাথের আজ আবার দৃশ্যটা মনে পড়ে। বাচ্চা প্রীতম রোগাভোগা, নিরীহ, জীবনে কোনওদিন কারও কাছে মার খায়নি। সেই প্রীতমকে শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার রাস্তায় মারছে দীপনাথ। ভীষণ মারছে।
গলার কাছে একটা বাতাসের বল কিছুতেই গিলতে পারছে না দীপনাথ। অবরোধ ঠেলে অতি কষ্টে সে বলতে পারল, তুই চলে এলি কেন?
বিস্মিত বিলু বলে, বাঃ, আমার যে চাকরি।
তাই তো! ওঃ হ্যাঁ।—এইরকম অর্থহীন কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করে দীপনাথ।
বিলু একটু ভয়ের গলায় বলে, তোমাকে কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে সেজদা! কী হল বলো তো তোমার? পায়ে পড়ি, ওরকম নার্ভাস হোয়ো না। তা হলে আমি দাঁড়াব কোথায়?
এটা হাসির সময় নয়। তবু দীপনাথ তার ঠোঁট রবারের মতো প্রসারিত করে বীভৎস একটু হাসার চেষ্টা করল। বলল, ও কিছু নয়। এক গ্লাস জল দে।
বিলু তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে জল আনে।
দীপনাথ জলের গ্লাসটার অর্থহীনতার দিকে চেয়ে সেটাকে হাতে নিয়ে বসে থাকে। তারপর আপনমনে বলে, তোর মতো সাহসী ক’জন ছিল বে? তবে পালালি কেন?
এ কথা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা তা জানে বিলু। তাই ফের ভয়ের গলায় বলে, তুমি ওরকম ভেঙে পোড়ো না সেজদা!
আবার রবারের ঠোঁট টেনে হাসে দীপনাথ। তারপর মাথা নেড়ে বলে, না। ভেঙে পড়ার কী আছে?
তবে ওরকম করছ কেন?
দীপনাথ গ্লাস থেকে জল হাতের কোষে ঢেলে নিয়ে নিজের চোখ কান ভিজিয়ে নেয়। কয়েক ঢোক খায়ও! তারপর আস্তে করে বলে, প্রীতম! ওঃ! প্রীতম!
হয়তো হঠাৎই কান্নার ঝড় আসত, ভেসে যেত দীপনাথ। কিন্তু হঠাৎ খুব রূঢ় এক ঝটকায় সে উঠে দাঁড়াল।
কোথায় যাচ্ছ?—আর্তস্বরে জিজ্ঞেস করে বিলু।
দার্জিলিং মেল।—প্রায় সাংকেতিক শব্দটা উচ্চারণ করেই সে ঘর থেকে বাইরের ঘরে চলে আসে।
পিছু পিছু বিলু এসে পথ আটকায়, পাগল হয়েছ! এখনই তো সাড়ে সাতটা বাজে। কখন দার্জিলিং মেল চলে গেছে।
তাই তো।—আবার সোফায় বসে পড়ে দীপনাথ, তোর কি মনে হয় প্রীতম বেঁচে নেই?
আমার বিশ্বাস ও কোথাও লুকিয়ে আছে গিয়ে।
কিন্তু কোথায়?
আমি তো শিলিগুড়ি বা নর্থ বেঙ্গলের সব চিনি না। কোথায় কোথায় ওর চেনা লোক আছে তাও জানি না। সেইজন্যই বলছি তুমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। তুমি হয়তো ওকে খুঁজে বের করতে পারবে। রোগা শরীরে ও বেশিদুর যেতেই পারে না।
রোগা শরীর!—বলে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দীপনাথ। তারপর মাথা নেড়ে বলে, প্রীতমের যা মনের জোর তাতে রোগকে ও বহুদূর ছাড়িয়ে গেছে। রোগ ওকে রুখবে কী করে!
তবুও তো প্রীতম আর অতিমানুষ নয়।
তা নয়। কিন্তু আমি জানি ওই রোগটা খুব ভুল লোককে বেছে নিয়েছিল, যে তোক কখনও রোগের কাছে হার মানছে না। মরার দিন পর্যন্ত প্রীতম ঠিক হাসিমুখে বলে যাবে, ভাল আছি। খুব ভাল আছি।
বলতে বলতে প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছিল। গলা কেঁপে উঠল দীপনাথের। ঠিক যেমন করে বমি আসে তেমনি অপ্রতিরোধ্য গতিতে কান্না উঠে আসছিল চোখে। দীপনাথ কয়েকবার ঢোক গিলল, হাতের মুঠো পাকিয়ে রইল শক্ত করে। কয়েকবার কেঁপে স্থির হল। বিপদের সময় স্থির থাকতে হয়।
দীপনাথের কথায় হঠাৎ প্রীতমের জন্য নতুন করে শোক উথাল-পাথাল হয়ে উঠল বুকে। বিলু সোফায় বসে কাঁদতে থাকে।
পাশের ঘরে দরজা বন্ধ করে টিউটরের কাছে পড়ছিল লাবু। নিঃশব্দে দরজা খুলে পরদা সরিয়ে মুখে একটা আঙুল পুরে সে চেয়ে রইল। প্রীতমের মেয়ে। দীপনাথ কিছু না ভেবেই দু’হাত বাড়িয়ে দিল। ঠিক ছুটে এল না লাবু, কিন্তু একটু জড়তার সঙ্গে পায়ে পায়ে এল কাছে। একটু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কাছ ঘেঁষে। নিঃশব্দে তাকে জড়িয়ে ধরে থাকে দীপনাথ। এই ছোট মেয়েটার মধ্যে একটা বিদ্রোহ টের পাচ্ছিল।
বাবা আবার ফিরে আসবে লাবু। ভাবিস না।
লাবু কথা বলল না। শরীরের শক্ত ভাবটাও নরম হল না।
লাবু, বাবার কথা বুঝি সবসময় ভাবিস?
না, তোমরা কাঁদছিলে কেন?
কই আমি তো কাঁদিনি।
মা কাঁদছিল কেন?
এমনি। ব্যথা-ট্যাথা পেয়েছে বোধহয়।
লাবু ফের চুপ করে যায়।
তোর টিউটর চলে গেছে?
না। আমি বাথরুমে যাব বলে এসেছি।
তা হলে যাও। বাথরুম সেরে পড়তে চলে যাও।
লাবু তেমনি নিঃশব্দে গুটগুট করে চলে গেল।
ও কি বাবার কথা বলে রে বিলু?
বিলু লাল চোখ তুলে তাকাল। মুখে কথা এল না। মাথা নেড়ে জানাল, না। একটু সামলে নিয়ে বলল, মেয়েটা কেমন হয়ে গেছে। কথা বলে না, হাসে না। সবসময় শক্ত হয়ে থাকে। খুব ভাবে।
আমি কাল শিলিগুড়ি যাচ্ছি।-বলে দীপনাথ উঠে দাঁড়ায়।
আমি কী করব বলে যাও সেজদা।
তুই! তোর আর কী করার আছে?
বিলু আবার খানিকক্ষণ আঁচলে মুখ ঢেকে রেখে বলল, সবাই বোধহয় ভাবছে আমার জন্যই প্রীতম নিখোঁজ হল।
দীপনাথ আস্তে করে বলল, ওকে কলকাতায় আনার জন্য জোরাজোরি না করলেও পারতিস।
তুমিও কি ভাবো যে, প্রীতম সেজন্য পালিয়েছে।
অসম্ভব নয়। তবে ওর দেখা না পেলে তো সত্যি কথাটা কখনও জানা যাবে না। তুই ভেঙে পড়িস না। মেয়েটাকে দেখিস।
রুদ্ধ স্বরে বিলু বলে, ওকে নিয়েই তো আছি। এখন ওই আমার সব।
দীপনাথ বেরিয়ে পড়ে। বড় শূন্য লাগে আজ। চারদিক ছাইবর্ণ। প্রীতমের জন্য এতটা হবে বলে ভাবেনি কখনও। বলতে কী, প্রীতমের মৃত্যুর জন্য মনে মনে প্রস্তুতও ছিল সে একসময়। প্রীতম বেঁচে নেই। এমন কথা এখনও বলা যায় না। তবু বুকটা ধক ধক করে। বেঁচে থাকলে প্রীতম অন্তত তাকেও কি জানত না যে, সে বেঁচে আছে।
