বিলুর মুখে দুশ্চিন্তা নেই, উদ্বেগ নেই, শুধু কঠোর লাবণ্যহীন একটা আক্রোশ জ্বলছে।
উদ্বেগে ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যাওয়ায় মা বিছানায় শোয়া। বাবা ঘর বার করছে। ছবি দুপুরে ডালসেদ্ধ আর ভাত নামিয়ে রাখল কোনওক্রমে। কেউ খেল, কেউ খেল না, তবে কেউ কাউকে খাওয়ার জন্য সাধাসাধি করল না। বিলু অবশ্য মেয়েকে নিয়ে খেতে বসল। খেতে খেতেই ছবিকে বলল, ওরা অত খোঁজাখুঁজি না করলেই পারত।
ছবি চমকে উঠে বলে, কেন বউদি?
তোমার দাদা তো আর অচেনা জায়গায় নেই। পাছে আমি কলকাতায় নিয়ে যাই সেই ভয়ে ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এতটা না করলেই হত। তেমন আপত্তি থাকলে আমি না হয় ওকে নিয়ে যেতাম না।
ছবি অবাক হয়ে বলে, সরিয়ে দেওয়া হয়েছে! কে সরাল? আমরা?
তাও তোমরাই জানো। ওর মতো পঙ্গু লোকের পক্ষে খুব দূরে তো যাওয়া সম্ভব নয়।
ছবি অল্প বয়সের ধর্মেই একটু মুখিয়ে উঠে বলে, দাদাকে পঙ্গু বলছ কেন? যে হাঁটতে পারে, সাইকেল চালাতে পারে সে কি পঙ্গু মানুষ?
মোটেই পারে না। ওসব ও করে মরার জন্য। একদিন এভাবেই একটা অ্যাকসিডেন্ট করে মরবে, তোমরা তখনও চোখ বুজে থেকো।
এ কথার জবাব এল না ছবির মুখে। অসহায়ভাবে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে ডালের হাতাটা মেঝেয় রেখে সে দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদতে বসল।
ছবির মুখ থেকে কথাটা ছড়িয়ে পড়তেও বেশি দেরি হল না। দুপুরে খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে বিকেলের দিকে বিলু যখন উঠল তখন তিন ভাই শ্মশানফেরত চেহারা নিয়ে বারান্দায় বসে আছে। দুপুরে ডাক্তার ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে যাওয়ায় মা অঘোরে ঘুমোচ্ছ। বাবা বাড়ি নেই। ছবি চা করছে।
বিলুকে দেখে শতম উঠে এল। বিলুকে ঘরে ডেকে এনে বলল, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে, বউদি।
বলো।–খুব নিস্পৃহ স্বরে বিলু বলে।
তোমার মনে যত সন্দেহই থাক, দাদাকে আমরা কিন্তু সত্যিই লুকিয়ে রাখিনি।
বিলু এ কথার জবাব দিল না। কিন্তু মুখটা আরও গম্ভীর আর কঠিন হল।
দাদা শেষরাতে বেরিয়ে গেছে। কোথায় গেছে জানি না। ব্যাপারটা হালকাভাবে দেখো না। এর মধ্যে লুকোচুরি নেই।
বিলু নীরস গলায় বলে, প্রীতমকে খুঁজে বের করা খুব শক্ত কাজ নয় শতম, কোথায় যেতে পারে তা তোমাদের অজানা থাকার কথা নয়।
আমরা সব জায়গায় খুঁজেছি। দাদার সব বন্ধুর বাড়িতে গেছি। কোথাও পাইনি।
বিলু তবু বিশ্বাস করল না। মৃদু বিষ-গলায় বলল, একটা কথা তো মানবে। প্রীতম মোটর নিউরো ডিজেনারেশনের রুগি। তার পক্ষে স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা সম্ভব নয়। সে কতদূর যেতে পারে?
তা তো জানি না।
এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে বলো?
বলি। কারণ, কথাটা সত্যি। এমনকী আমরা রেললাইন ধরেও খুঁজেছি, যদি সুইসাইড করে থাকে। ধারেকাছে পুকুর-টুকুর নেই, থাকলে জলে লোকনামাতাম। খুঁজে দেখেছি, দাদা তার একটা হাতব্যাগ সঙ্গে নিয়ে গেছে। সেই হাতব্যাগে দাদার সব টাকাপয়সা থাকত।
বিলু চুপ করে রইল।
শতম মিনতি করে বলল, বিশ্বাস করো বউদি, লুকিয়ে রাখলে এতক্ষণে স্বীকার করতাম।
বিলু মৃদু স্বরে বলে, তা হলে ও নিজেই হয়তো লুকিয়ে আছে। তোমাদের আর খুঁজতে হবে না। আমি চলে গেলে ঠিক ফিরে আসবে।
শতম ভীষণ উদ্বেগের গলায় বলে, তুমি এ অবস্থায় চলে যাবে? দাদা ফিরে না এলেও?
আমি না গেলে যে ও ফিরবে না।
শতম একটু অবিশ্বাসভরে বউদির দিকে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, যদি দাদা না ফেরে?
ফিরবে। যে সুইসাইড করতে যায় সে সঙ্গে টাকা নেয় না।
মানছি। কিন্তু দাদা তো সুস্থ সবল নয়। হয়তো রাস্তায় বিপদে পড়ে যাবে।
বিরক্ত বিলু বলে, তার আমি কী করব বলো তো?
কিছু করতে হবে না। আমরা চারদিকে হাল্লাক ফেলে দিয়েছি। দু-চারদিনের মধ্যেই খবর এসে যাবে। যতদিন খবর না পাই ততদিন তুমি থাকো। নইলে পাঁচজনের চোখেই যে খারাপ দেখাবে।
লোকনিন্দার কথাটা রাগের মাথায় ভেবে দেখেনি বিলু। এখন ভাবল। লুকিয়েই থাক, আর যা-ই হোক, এই অবস্থায় তার কলকাতায় চলে যাওয়াটা খুবই বিসদৃশ।
বিলু অসহায় মুখে বলে, আমার যে ছুটি নেই!
ছুটি বউদি!—খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ শতম হেসে ফেলে, ছুটি নেই! হায় ঠাকুর, দুনিয়ায় ছুটি নেইটাই সবচেয়ে বড় কথা হল? দাদা যে নেই সেটা কিছু নয়?
বিলু এইসব খোঁচালো কথা সহ্য করতে পারে না। তবে এ সময়ে ঝগড়াও করল না সে। সে চুপচাপ চলে এল নিজের ঘরে।
লাবু ঘুম থেকে উঠে কেমন পাথরের মতো বসে আছে। অস্বাভাবিক একটা স্থিরতা। চোখ দুটোর পলক পড়ছে না। দাঁত দিয়ে খুব জোরে নীচের ঠোঁটটাকে কামড়ে রেখেছে। চোখের দৃষ্টি খানিকটা শূন্যতায় ভরা। কিছু দেখছে না।
বিলু তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে লাবুকে কোলে টেনে নিয়ে বলে, কী হয়েছে লাবু, শরীর খারাপ নয়তো!
লাবু অবাক হয়ে মাকে একটু দেখল। তারপর হঠাৎ শরীরে ঢেউ দিল তার। ঠোঁট কেঁপে উঠল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে হিক্কা তুলে সে বলল, বাবার জন্য ভীষণ মন কেমন করছে মা।
৭৩. এক-একটা সর্বনাশের সময় আসে
এক-একটা সর্বনাশের সময় আসে যখন সবকিছুকেই মনে হয় ভস্মাবশেষ ছাই। দীপনাথের কাছে তেমনি চারদিকটা ছাইরঙা হয়ে গেল।
বিলু প্রীতমের কথা শেষ করে মুখ নিচু করে কাঁদছে বিছানায় বসে। প্রীতমেরই বিছানা। কলকাতায় শেষদিন পর্যন্ত সে এই বিছানায় শুয়ে গেছে।
দীপনাথের কান্না আসছিল না। তার ভিতরটা বড় বেশি শুকনো, অনুভূতিহীন। তার চোখের সামনে সমস্ত ঘরটা তার জিনিসপত্র সমেত ছাই হয়ে গেছে। পৃথিবীর আর কোনও বর্ণ নেই, অর্থ নেই।
