কেন?–প্রীতম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
এসব কী হচ্ছে শুনি! এ কি চিকিৎসা? লোকটা তো তেমন উঁচুদরের ডাক্তারও নয়। প্র্যাকটিসই নেই।
প্রীতম থম ধরে থেকে কিছুক্ষণ বাদে বলে, এর ওষুধে আমার কাজ হচ্ছে।
ছাই হচ্ছে! হাতি ঘোড়া গেল তল, এখন মশা বলে কত জল। আমি এসব পছন্দ করছি না। এবারই আমি তোমাকে নিয়ে যাব।
নিয়ে কী করবে?
যদি হোমিয়োপ্যাথিই করাও তবে তার জন্যেও কলকাতায় ঢের বড় ডাক্তার আছে। এ লোকটা কিছু জানে না।
কী করে বুঝলে?
রুগিই নেই। কেমন ক্যাবলার মতো সবসময়ে হাসে।
ওগুলো যুক্তি নয়, বিলু।
কোনটা যুক্তি নয়?
ডাক্তারের বিচার করতে যেয়ো না। আমার রোগের কোনও চিকিৎসা এখনও অ্যালোপাথিতে নেই। কলকাতার ডাক্তাররা সে কথা আকারে-ইঙ্গিতে বলেই দিয়েছে। হোমিয়োপাথিতে আছে কি না আমি জানি না। জানি না বলেই ভরসা করতে পারছি। এ লোকটা শতমের চেনা। ক্যাবলা হলে শতম ওকে দিয়ে আমার চিকিৎসা করাত না।
বিলু সাময়িকভাবে চুপ করে গেল বটে, কিন্তু যুক্তিটা মেনে নিল না।
বিকেলেই সে শতমকে বলল, এখানে তোমার দাদার ভাল চিকিৎসা হচ্ছে না। আমি ভাবছি ওকে কলকাতায় নিয়ে যাব।
এ কথায় একটু থতমত খেয়ে যায় শতম। সত্য বটে, দাদার দায়দায়িত্ব সে নিজের ঘাড়ে নিয়েছে, কিন্তু এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দাদার ওপর অধিকার তার চেয়েও বউদিরই বেশি। পুরুষ মেয়ে উভয়পক্ষই বিয়ের পর আত্মীয়স্বজনের কাছে একটু পর হয়ে যায়। দাদা মরলে বউদিরই তো সবার আগে শাঁখা ভাঙবে, সিঁদুর মুছবে। কাজেই বউদির যতটা অধিকার তার ততটা নয়।
সে বলল, আবার কলকাতা!
কলকাতাই ভাল। এখানে কেউ তোমরা ওর ওপর ঠিক নজরও রাখতে পারছ না। শুনলাম, দু’দিন ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি আসবার আগের দিনই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। যদি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেত?
শতম একটু হাসল, আমাদের পাড়াটা তেমন কনজেসটেড নয়, তাই রক্ষা। যদি এ কাণ্ড দাদা কলকাতায় করে তা হলে কী হবে বউদি, বলো তো! তুমি অফিসে থাকো, লাবু ইস্কুলে, দু’জন মাইনে-করা লোক কতক্ষণ নজর রাখবে?
দরকার হলে আমিই ছুটি নিয়ে বাসায় থাকব।
ছুটি নেবে? কেন, চাকরিটা ছেড়ে দাও না!
দরকার হলে তাও ছাড়ব।–কয়েক মাস আগে শতম যে জবরদস্তিতে দাদাকে নিয়ে এসেছিল সেই অপমানটা ভোলেনি বিলু। আজ বহুদিন বাদে সেই শুষ্ক ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ টের পায় সে। বাঘিনীর মতো জিভ দিয়ে সেই রক্তের স্বাদ নেয় সে।
শতম বউদির চেহারায় বিদ্রোহের আভাস পাচ্ছিল। তাই কথা বাড়াল না। মৃদু স্বরে বলল, নিয়ে যেতে হয়, যাবে। তার আর কথা কী!
এত সহজে দুরন্ত শতম বাগ মানবে তা ভাবেনি বিলু। একটু ক্লান্ত স্বরে সে বলল, তিনটে ফাস্ট ক্লাসের টিকিট করে দাও তা হলে।
দেব। মাকে আগে একটু জানিয়ে নাও।
নিজের ঘরে বা বারান্দায় বসে প্রীতম সবই টের পায়। কলকাতায় যাওয়ার ব্যাপারে তার কোনও মতামত আর চাইছে না বিলু। অর্থাৎ প্রীতমের মতামত এখন উপেক্ষা করলেও তার চলে। বাড়ির কেউই বিলুর প্রস্তাবে বাধা দিচ্ছে না। তার মানে কি, প্রীতমকে এরা কেউ চায় না? ঠান্ডা লড়াইটা বিলু জিতে গেছে তা হলে?
শতম একদিন একটা ফার্স্ট ক্লাস কুপে রিজার্ভ করে এসে তিনটে টিকিট বউদির হাতে দিয়ে বলল, আগামী রবিবার।
বিলু টিকিট তিনটে তার ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে দিল।
এসবই ঘটল প্রীতমের চোখের সামনেই।
বাড়িতে আজকাল হইচই কমে গেছে। রাতে খাওয়ার পর আজ্ঞা নেই। ডাক্তার ওষুধ দেওয়া প্রায় বন্ধ করেছে।
একদিন সকালবেলা বারান্দায় বসে গোটা ব্যাপারটা ভেবে মৃদু মৃদু একটু হাসল প্রীতম। তার কেবলই মনে হচ্ছিল বিলু কোনওরকমে টের পেয়েছে যে, প্রীতম ভাল হয়ে উঠবে। আর যদি তা-ই হয় তবে সে কেন প্রীতমের আরোগ্যের যোলো আনা কৃতিত্ব নিজে দাবি করবে না!
এত গভীরভাবে কথাটাকে বিশ্বাস করল প্রীতম যে সকালে প্রথম বিলুর সঙ্গে দেখা হতেই সে বলল, তাই না বিলু?
অবাক বিলু বলে, কিসের তাই না?
এই যে তুমি আমাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছ, এর মূলে আছে একটা অন্য কথা!
কী কথা?
তুমি জানো যে, আমি ভাল হয়ে উঠছি। আর সেই ভাল হয়ে ওঠার জন্য তুমি নিজের কৃতিত্ব দাবি করতে চাও।
বিলু খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে কঠিন মুখ করে বলে, তুমি ভাল হয়ে উঠছ, এ কথা কে বলল?
আমি টের পাই, তুমিও টের পাচ্ছ।
আমি পাচ্ছি না, তা ছাড়া অত ঘোরপ্যাঁচ আমার মনের মধ্যে ছিল না। তুমি এসব ভাবলে কী করে?
প্রীতম হতাশার খাস ফেলে বলে, ছেড়ে দাও ওসব কথা। আইডল ব্রেন ইজ ডেভিলস। ওয়ার্কশপ।
তাই দেখছি। কিন্তু ওসব নিয়ে ভাববার সময় আমার নেই। আমি তোমাকে নিয়েই কলকাতা যাব।
প্রীতম জবাব দিল না।
পরদিন সকালে মরম চেঁচিয়ে উঠল, দাদা নেই! দাদা কোথায় গেল?
সারা বাড়ি তৎক্ষণাৎ জেগে উঠল। তারপর খোঁজ খোঁজ।
কিন্তু আশেপাশে কোথাও প্রীতমকে পাওয়া গেল না। এক ঘণ্টা গেল, দু ঘণ্টা গেল। সারাদিনটাই চলে গেল। প্রীতম ফিরল না।
বিলু ক্রমেই গম্ভীর আর থমথমে হয়ে উঠছিল। তারপর নিজের বাক্স-টান্স গোছাতে লাগল আপনমনে।
দুপুরের মধ্যেই সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সব জায়গা থেকে ঘুরে আসতে লাগল লোক। কোথাও প্রীতম নেই। থানা হাসপাতাল কোথাও না। ধারেকাছে জলপাইগুড়ি আর খোকসাডাঙায় প্রীতমের এক পিসি আর এক দূর সম্পর্কের জ্যাঠা থাকে। সেখান থেকেও খবর এল প্রীতম যায়নি।
