প্রীতম বলল, চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে না।
পড়তেও নয়? শুনলাম আমার চিঠি এলে তুমি নাকি তা খুলে পড়তেও চাও না।
ছবি বলেছে বুঝি! আসলে ভুলে যাই। মনে রাখলে কষ্ট পাব বলে জোর করে ভুলে যাই। নইলে তোমার চিঠি পড়তে লোভ হয় খুব। কিন্তু পড়লেই দুর্বল হয়ে যাব যে।
এ কথায় বিলু বোধহয় একটু ভিজে যায়। তবু বলে, ও কথার মানে হয় না। চিঠিতে কত জরুরি কথাও থাকতে পারে তো।
জরুরি! কী আর এমন জরুরি থাকতে পারে বলো তো জীবনে? ঘর-সংসার-সম্পর্ক সবই তো ছেলেখেলা বিলু।
সন্নিসি ঠাকুর, আমার মুখ চেয়ে না হয় একটু ছেলেখেলাই করলে। তোমার অসুখটা তো আমার কাছে ছেলেখেলা নয়। মেয়েটাও দিনের মধ্যে দশবার বাবার চিঠি এসেছে কি না জানতে চায়। ওকে কী বলি বলো তো!
তুমি বেশ সুন্দরী হয়েছ বিলু।
আচমকা এ প্রশংসায় একটু কুঁকড়ে গিয়ে বিলু বলে, যাক বাবা, আমাকে দেখেছ তা হলে। আমি তো ভাবলাম, সন্নিসির বুঝি বউয়ের মুখ দেখাও বারণ।
প্রীতম ক্ষীণ একটু হাসল। তারপর বলে, বেশ লাগে এখন তোমাকে দেখতে।
থাক, আর বলতে হবে না। নিজের দোষ ঢাকতে এখন এরকম অনেক মিথ্যে কথা তোমাকে বলতে হবে।
প্রীতম গম্ভীর মুখে হঠাৎ বলে, একটা কথা বলব বিলু?
বলো।
তোমার এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। আমার গেছে। কেন আমার স্মৃতি নিয়ে তোমার নিজের জীবনকে নষ্ট করছ?
বিলু নড়ে বসল। তারপর বলল, ওরকম একটা কথা তুমি আগেও বলেছ। আর বোলো না।
শোনো, আমি অভিমান থেকে বলছি না। আমারও একটুও ঈর্ষা হবে না, অধিকারবোধেও লাগবে না। আমি তোমাকে সুখী দেখতে চাই।
যদি সুখী না হই? তুমি চাইলেই কি সুখের পাখি এসে আমার কোলে বসবে?
তবু আমি চাইছি।
বোলো না। আমি এখনও অত আত্মকেন্দ্রিক নই।
বিলু, তুমি বড় পাপবোধে কষ্ট পাচ্ছ। কিন্তু যাকে পাপ বলে ভাবছ তা পাপ না-ও হতে পারে।
৭২. প্রীতম নিজে থেকেই মাস দুই আগে
প্রীতম নিজে থেকেই মাস দুই আগে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছে। ইদানীং ওষুধের প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল তার। পিঠের দিকে আর মাজায় ক্ষত দেখা দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে হাঁফানির মতো শ্বাসকষ্ট হত। অ্যালোপ্যাথি ওষুধের বেশিরভাগই কমবেশি বিষ জাতীয় জিনিস! ডাক্তারকে সে একদিন বলল, আমি আর ওষুধ খাব না।
ডাক্তার অবাক হয়ে বললেন, খাবে না? তা হলে কী করবে?
আমার ড্রাগ-রিঅ্যাকশন হচ্ছে।
ডাক্তার নিজেও সেটা জানেন। বিচক্ষণ প্রবীণ ডাক্তার। একটু ভেবে বললেন, খেয়ো না। ভগবানকে ডাকো। তাঁর চেয়ে বড় ডাক্তার আর কে আছেন?
পরদিন থেকেই একজন হোমিয়োপ্যাথ প্রীতমকে দেখছে। বেশ সাধু-সাধু চেহারার দাড়িওলা হাসিখুশি মানুষ। বলার চেয়ে শোনেন বেশি, আর তার চেয়েও বেশি হাসেন। লোকটাকে পছন্দ হল প্রীতমের। লোকটা একটু বাঙাল আর বাহে টানে খাঁটি উত্তরবঙ্গীয় বুলিতে শুধু বলে গেলেন, ভাল হইয়া যাইবেন গিয়া।
ছোট ছোট মিষ্টি গুলির ওষুধ খেতে আপত্তি নেই প্রীতমের। উপকার হোক না হোক, অপকারও নেই। ডাক্তার বড় একটা আসেন না, শতম গিয়ে অবস্থার বিবরণ দিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। তাতে কাজ হয় কি না বোঝা যায় না, কিন্তু শতম খুব নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ায়। ওষুধের মাত্রা খুবই অবিশ্বাস্য রকমের কম। সাতদিনে মাত্র একদিন একটি ডোজ, খালিপেটে এবং সকালে।
এই চিকিৎসার ব্যবস্থায় মোটেই খুশি হল না বিলু। পরের দিনই সে নিজে দাড়িওলা ডাক্তারের বাড়িতে হানা দিল।
ডাক্তারবাবু, এই ওষুধে কি কাজ হবে?
ডাক্তারবাবু এই সাজগোজ করা বুদ্ধিমতী মেয়েটিকে দেখে একটু তটস্থ হয়ে বললেন, হবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। একটু দেরিতে ক্রিয়া হয়।
বিলু ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনার কি মনে হয় না ওর এখনই অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা বন্ধ করাটা ঠিক হয়নি?
ডাক্তার একটু ফাঁপরে পরে বলেন, ওই চিকিৎসাতেও বিশেষ উপকার হইতেছিল না।
আপনি কি পারবেন?
ডাক্তার হেসে বললেন, রোগীর এখন-তখন অবস্থা না হইলে কেউ তো আর হোমিয়োপ্যাথের কাছে আসে না। আমার সব রোগীই তাই মরুইন্যা। তাগো ভাল করতে সময় তো একটু লাগেই, মা। আপনে নিশ্চিন্তে যান গিয়া।
ডাক্তারের পসার বেশি নয়, তা বাইরের ঘরে বসেই টের পেল বিলু। সকালবেলার দিকেও রুগি বলতে ডাক্তারের বাইরের ঘরে প্রায় কেউই নেই। ডাক্তার নিজেও তার ক্ষেতির কাজ দেখছিল। খবর পেয়ে মাটিমাখা হাতেই উঠে এসেছে। দুটো ভাঙা আলমাবিতে রাজ্যের পুরনো হোমিয়োপ্যাথির বই আর জার্নাল। দুটো ছোট পুরনো আলমারিতে হাজারখানেক শিশি আর বোতল। দেয়ালে মহাত্মা হ্যানিম্যানের ছবিতে ঝুল পড়েছে। ডাক্তার গা-আদুড়, ধুতি হাঁটু অবধি তোলা। দাড়ির ফাঁকে হাসি।
বিলু খুশি হচ্ছিল না। বলল, কলকাতায় ওকে বড় বড় স্পেশালিস্ট দেখছিল। তারাই কিছু করতে পারল না।
ডাক্তার শুধুই হাসছিলেন।
বিলু অগত্যা উঠল। তার ইচ্ছে করছিল, এক্ষুনি প্রীতমকে কলকাতায় ফেরত নিয়ে যায়। এরকম অব্যবস্থায় বিনা চিকিৎসায় লোকটা মরেই যাবে।
বেরোনোর মুখে বিলু বাঁ হাতে ডাক্তারের বাগানটা দেখল। চোখ জুড়িয়ে যায়। কী সবুজ! কী সবুজ!
ওটা কি শশা নাকি?
শশাই, মা। খাইবেন? লইয়া যান কয়টা।—বলে ডাক্তার গিয়ে মাচান থেকে কয়েকটা দুধকচি শশা পেড়ে এনে বিলুর হাতে দেয়।
বিলু শশাগুলো নিয়ে এসেছিল বটে, কিন্তু বাড়িতে না দিয়েই প্রীতমকে বলল, এবারই আমার সঙ্গে তোমাকে ফিরে যেতে হবে।
