সন্ধেবেলা ঘরে এসে টেবিলের ওপর বিলুর চিঠিটা পড়ে থাকতে দেখল প্রীতম। কিন্তু একবারও খুলে পড়তে ইচ্ছে হল না তার।
আগের মতো প্রীতম এখন ঘরবন্দি থাকে না। সকলের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খায়। অনেক রাত অবধি পারিবারিক আড্ডায় জেগে অংশ নেয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে সেই শৈশবের শিলিগুড়িকে পেয়ে গেছে বুঝি। এখন আর তাই বিলুকে মনে পড়ে না, লাবুর জন্য চিন্তা নেই, মন কেমন করে না তেমন।
টেলিগ্রামটা এল বেশ রাতে। অ্যারাইভিং টুয়েলভথ অ্যাটেন্ড। বিলু।
টেলিগ্রামটা পিয়োনের হাত থেকে নিয়ে ঘরে এসেই মরম চেঁচায়, বউদি কাল আসছে। হুররে।
খবরটা মরমের মুখ থেকে বেরোতে না বেরোতেই বাড়িতে একটা আনন্দের কোলাহল পড়ে যায়। মা খুশি, বাবা খুশি, ছবি খুশি। শুধু প্রীতমই এই খবরে তেমন উত্তেজনা বোধ করে না। বরং তার একটা ভ্রু একটু উর্ধ্বমুখী হয়। বিলু, কে বিলু?
রাতে ঘুমঘোরে প্রীতমের মনে হয়, তার কোনও অভাব নেই। তার কিছু প্রয়োজন নেই। আর কাউকে ছাড়াও তার চলে যাবে। সকালে বাচ্চা নিয়ে যে মহিলাটি সামনে এসে দাঁড়াবে সে এই পৃথিবীর আর হাজার হাজার মহিলার মতোই একজন। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু লাবু! লাবু তো তার মেয়ে! প্রীতম আধোঘুমেই ভাবে, তাই বা ভাবছি কেন?
লাবু আমারই বা কেন হবে? লাবু এই পৃথিবীতে আসার একটি মাধ্যম খুঁজেছিল। প্রীতম সেই মাধ্যম মাত্র। সে তো লাবুর সৃষ্টিকর্তা নয়। লাবুর প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা যে, লাবু তারই। প্রীতম শুধু এক বিভ্রম এক মায়াবশে ভাবে, লাবু আমার মেয়ে। কিন্তু সত্য ঘটনা তো তা নয়।
খুব সকালেই স্কুটার হাঁকিয়ে বউদিকে আনতে নিউ জলপাইগুড়ি চলে গেল শতম। বাড়িতে গোছগাছ করতে লাগল ছবি আর মা।
গোছগাছের জন্যই সাতসকালে বিছানা ছাড়তে হয়েছে প্রীতমকে। ছবি তাকে ঠেলে তুলে বিছানা টানটান করে ভাল বেডকভার দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। টেবিলে পেতেছে নিজের হাতে কাজ করা সবুজ ঢাকনা। আজ সব জানালায় দরজায় টানটান পরদা।
একটু বিরক্তমুখে কাচা ধুতি পরতে হয়েছে প্রীতমকে। গায়ে সাদা কটকটে গেঞ্জি। চুল পাট করে সেজেগুজে বসে আছে বারান্দায়। ছবি চা দিতে এলে তেতো মুখে বলল, আজ কি পাত্রীপক্ষ আমাকে দেখতে আসছে রে? তোরা যা শুরু করেছিস!
আসছেই তো দেখতে। যা অগোছালো হয়ে থাকো, বউদি দেখে গিয়ে আমাদের নিন্দে করবে।
এমনিতে বুঝি করে না?
করলে করে। তবু যতদূর পারি মন রাখার চেষ্টা করি।
তোর বউদি হল কলকাত্তাই মাল। কলকাত্তাইরা অত সহজে খুশি হয় না।
কী যে সব বলল না দাদা!
প্রীতম ভ্রু কুঁচকে চা খায়। তারপর হঠাৎ উদাসী এক হাওয়া আসে। প্রীতম চরাচরের দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে আলো আর ছায়া, সবুজ আর নীল, প্রাণ আর জীবনের খেলা দেখতে থাকে। সামনের মাঠে খোঁটায় বাঁধা গোরুর পাশে ছাগল চরছে। ঘাস পতঙ্গ পাখি, তুচ্ছ সব ওড়াউড়ি, অস্তিত্ব, শব্দ তাকে এক গভীর প্রাণের রাজ্যে নিয়ে যেতে থাকে। সেখানে নামহীন অস্তিত্ব আর বুদ্ধির জগৎ। বিলু নেই, লাবু নেই, কেউ নেই।
এই গভীর ধ্যানের মধ্যে স্কুটারের পি শব্দ হঠাৎ হানা দেয়। স্কুটারের পিছু পিছু গুড়গুড় করে আসে একটি অটোরিকশা। বাড়ির সামনে থামে।
লাবু চেঁচিয়ে ডাকে, বাবা!
ভোরের সুন্দর আলোয়-ধোয়া মুখে একটু হাসে প্রীতম। হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধ স্বরে বলে, আয়।
লাবুকে কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে প্রীতম টের পায়, আজ এরকমই সস্নেহে সে একটি ছাগলছানাকেও কোলে নিতে পারে। তার স্নেহ অনেকটা নৈর্ব্যক্তিক হয়েছে এখন।
লাবু অনেকটা লম্বা হয়েছে। অনেক বেশি সুন্দরও। তার মুখে এখন নিখুঁতভাবে প্রীতমের মুখের আদল চেপে বসেছে। খুব দামি আর সুন্দর একটা ফ্রক তার পরনে। দু’হাতে লাবুর মুখখানা তুলে নিবিষ্ট চোখে দেখছিল প্রীতম।
লাবুও মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে বাবার দিকে। বলল, তুমি ভাল আছ বাবা?
ভালই মা। তুমি?
আমিও ভাল আছি বাবা।
বাড়িসুদ্ধ লোক বেরিয়ে এসেছে বাইরে। মা বাবা ছবি মরম রূপম। ভাইরা সুটকেস, বাসকেট, বিছানা নামাচ্ছে অটোরিকশা থেকে। ছবি গিয়ে বউদির হাত ধরে টেনে আনছে।
ভারী সুন্দর এই দৃশ্য। কিন্তু প্রীতম নড়ল না। এক হাতে মেয়ের হাতটা ধরে নির্বিকার বসে রইল। বিলুর দিকে চেয়ে সে স্পষ্টই বুঝতে পারে, বিলু সেই আগের মতো নেই। সামান্য মেদবৃদ্ধির ফলে তার চেহারাটা পরিপূর্ণ শ্রীময়ী। মুখে ক্লান্তির আস্তরণের নীচে তৃপ্তির চিহ্ন। বিলু আর তার নেই।
প্রীতমের দীর্ঘশ্বাস এল না। দুঃখ হল না। উদাসীনতার এক গৈরিক রং আজ তার মন ছেয়ে আছে। সে দেখল। মনে মনে ক্ষমা করল। সবাইকে।
ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পর বিলু শাড়ি পালটে, মুখ হাত ধুয়ে বারান্দায় আসে। আর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলে, আমার একটা চিঠির জবাব দাওনি।
আমি ভাল আছি বিলু।
সে কথাটাও তো জানাতে পারতে!
তুমি কেন এত জানতে চাও?
চাইব না!— বিলু অবাক হয়, রোগা মানুষটাকে এতদূরে ফেলে রেখে কলকাতায় থাকি, জানতে চাইব না?
প্রীতম বিরক্ত হয় না, কিন্তু গভীর বিষণ্ণতার গলায় বলে, বেশ তো আছি।
বেশ আছ জানি। মাঝে মাঝে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে পড়ো, তাও শুনেছি। কিন্তু আমি কেমন ছটফট করি, তা জানো?
প্রীতম কৌতূহলভরে বিলুর দিকে তাকায়। সন্দেহ নেই, প্রীতমের জন্য বিলুর উদ্বেগ আছে, দায়িত্ববোধ আছে, দুঃখ আছে। কিন্তু এও জানে প্রীতম, বিলুর জীবনের ঠিক কেন্দ্রস্থলে সে নেই। বিলুকে চাকরির ঘানিতে ঘোরাচ্ছে কে? বিলুকে কলকাতার জালে আটকে রেখেছে কে? সে কি এক শূন্যগর্ভ নিরাপত্তার বোধ? বিলু কি জানে না, কেউই কোথাও কখনওই নিরাপদ নয়?
