তবু সব বাধাকে ছাড়িয়ে প্রীতম চলতে থাকে। খানিকটা অন্ধের মত, খানিকটা যন্ত্রের মতো। রাস্তা খুবই সরু। এত সরু যে একটা রিকশা উল্টোদিক থেকে এলেই সে বিপদে পড়বে। সাইকেলের ওপর তার এত নিয়ন্ত্রণ নেই যে, অল্প জায়গা দিয়ে গলে যেতে পারবে। তবু বেপরোয়া প্রীতম প্রবল শ্বাস ফেলতে ফেলতে হেলে প্যাডেলে চাপ দিয়ে সাইকেলটাকে যথাসাধ্য বেগবান রাখছিল।
আর-একটা মোড় ঘুরতে গিয়ে প্রীতম পড়ল। পড়বে, প্রীতম জানতও। কিন্তু তার জন্য কোনও প্রস্তুতি নেয়নি সে, সাবধান হয়নি। তাই জানা সত্ত্বেও পড়াটা হল আচমকা।
বাঁ হাতে আর-একটা পাথরকুচির রাস্তায় বাঁক নিয়েই সে দেখতে পায় সামনে ইট বোঝাই এক টাটা মারসিডিস লরি থেকে মাল খালাস হচ্ছে। নীর অবরোধ। প্রীতমের সাইকেলে ব্রেক ছিল বটে, কিন্তু সেটাকে যথেষ্ট জোরে চেপে ধরার মতো শক্তি ছিল না তার হাতে। সুতরাং শুকনো একটা নর্দমার খাতে সাইকেল সুষ্ঠু নেমে খানিকদূর গড়িয়ে গেল সে। তারপর ধাক্কা মারল ইটের পাঁজায়। বেঁকে গেল সাইকেল। আরও একটু নিয়ে গেল তাকে। ফাঁকা ঘাসজমির ওপর ঢলৈ পড়ে গেল প্রীতমকে নিয়ে।
ব্যথা-বেদনা টের পেল না প্রীতম। তবে চোখে অন্ধকার নেমে এল। গভীর শ্বাস ফেলে তৃপ্তিতে চোখ বুজল সে। মথিত ঘাস আর ভেজা মাটির গন্ধ, রোদের সুঘ্রাণে ভরে গেল তার শাস। ঘাসপোকাদের শব্দ শুনতে শুনতে সে চেতনা হারাল।
খুব বেশিক্ষণের জন্য অবশ্য নয়। চোখে-মুখে প্রথম জলের ঝাপটা পড়তেই চোখ মেলে সে। হাত তুলে ওদের বারণ করে আর জল দিতে। হাসিমুখে ঘাসে শুয়ে থেকে সে উজ্জ্বল আলোয় মাখা অনেকখানি আকাশকে চেয়ে দেখে। এতখানি স্বাধীনতা বহুকাল ভোগ করেনি সে।
পাড়ার ছেলেরা তাকে ধরে তোলে, প্রীতমদা, এবার বাড়ি চলুন।
ওরা তাকে একটা রিকশায় তোলে। একজন তার পাশে বসে তাকে ধরে থাকে।
পাড়া ভিড়ে ভিড়াক্কার। ভারী লজ্জা করছিল প্রীতমের। আর তার মুখের ওই লাজুক হাসিটি দেখে অনেকেই অবাক মানল, তা হলে কি প্রীতম ভাল হয়ে উঠছে?
মা প্রীতমকে শোওয়ার ঘরে নিয়ে যেতে চাইছিল। শতম বলল, থাক মা। দাদা যা চাইছে তাই করো।
প্রীতম আবার বারান্দায় বসে। কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে না, অভিযোগ করে না, শাসন করে না। বোধহয় শতম সবাইকে বারণ করেছে।
খুবই ক্লান্ত ছিল প্রীতম। দুপুরে অনেকক্ষণ ঘুমোল। বিকেলে মনোরম আলোয় বারান্দায় এসে বসল আবার। ছবি চা দিতে এসে সহসা ফিরে গেল না। চেয়ারের পাশটিতে বসে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে একগাল হেসে বলল, তোমার আর কলকাতার জন্য মন খারাপ হয় না, না দাদা?
প্রীতম কথাটা ভেবে দেখল। কলকাতার কথা তার খুব মনে পড়ে। কিন্তু না, প্রথম প্রথম যেমন হত, ফিরে যেতে ইচ্ছে করত, তেমনটা আর হয় না। সে মাথা নাড়ল।
তুমি কলকাতার নোক হয়ে যাওয়ার পর আমরা ধরেই নিয়েছিলাম তুমি আমাদের পর হয়ে গেছ। এভাবে যে অনেকদিন আমাদের কাছে থাকতে পারবে তা কখনও ভাবতেই পারতাম না।
প্রীতম হেসে গভীর শ্বাসও ফেলল সেইসঙ্গে।
ছবি.বলল, বউদির চিঠি আজও এসেছে। তোমার নামে। তুমি বউদির চিঠিগুলো কেন পড়েও দেখো না বলো তো! আগের চিঠিটাও আঁটা খামে তোমার টেবিলে পড়ে আছে। জবাব না দিলে, পড়তে দোষ কী?
প্রীতম উদাসমুখে চুপ করে থাকে। কী জবাব দেবে? বিলুর চিঠি তার পড়তে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, বিলুর চিঠির মধ্যে অনেক মিথ্যে সাজানো কথা থাকবে। ওইসব কথা তার এখন সহ্য হয় না।
প্রীতম বলে, তোদের কাছে তো চিঠি দেয়ই।
তা দেয়। তবু, তোমার কাছে তো আলাদা করে কিছু বলার থাকতে পারে।
থাকলে কী করব? আমার তো এখন আর ওর জন্য কিছু করার নেই।
তুমি ভীষণ অন্যরকম হয়ে গেছ।
কীরকম রে?
কেমন যেন। তোমাকে বাপু আজকাল ভয় করে।
ভয় পাস?
ভয় পাই তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না বলে। লাবুসোনার জন্যও তুমি আজকাল ভাবো না দাদা?
প্রীতম চট করে এ কথার জবাব দিল না। সারা গায়ে একটু ব্যথার টাটানি রয়েছে এখনও। তার অবশ প্রায় অনুভূতিহীন শরীরে এই ব্যথাটুকু খুব উপভোগ করছিল সে। দুরের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, লাবুকে নিয়ে ভাববার কিছু তো নেই। যদি কোনও অ্যাকসিডেন্ট বা অকালমৃত্যু না ঘটে তা হলে ওর জীবন তো নিরাপদই। ওর মা ভাল চাকরি করে, আমারও কিছু টাকা রয়ে গেছে। তার চেয়ে বরং স্বার্থপরের মতো এখন আমার নিজেকে নিয়েই চিন্তা করতে বেশি ভাল লাগে।
বলে প্রীতম একটু হাসল।
কথাটার অর্থ ছবি খুব ভাল ধরতে পারল না, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। বলল, কিন্তু বউদি যে আমাদের কথা বিশ্বাস করে না, তার কী করবে? প্রতি চিঠিতেই আমরা লিখি, দাদা ভাল আছে। কিন্তু বউদির সন্দেহ, তুমি ভাল নেই। ভাল থাকলে নিজের হাতেই চিঠি লিখতে।
খুব চিন্তা করে বুঝি?
খুব। লেখে, তোমরা আমাকে সব কথা জানাচ্ছ না।
এবার লিখে দিস, দাদার জন্য তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। দাদার তো আয়ু বেশি নয়, তাই বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সেকেন্ড সে নিংড়ে নেয়। তার সময় কই যে তোমাকে চিঠি লিখবে?
ছবি হেসে বলে, এসব কথা লেখা যায় বুঝি!
প্রীতমও হাসে, তা হলে কিছুই লিখিস না।
বউদিকে নিজের হাতে তোমার একটু লেখা উচিত। একটিবার লেখো। ওই যা যা সব বললে তাই না হয় লেখো। অত ভাষা তো আর আমাদের কলমে আসবে না।
তোর বউদি যদি আমাকে নিয়ে ভাবনায় পড়ে থাকে তবে একটু ভাবতে দে না। ভাবলে ভালবাসা বাড়ে।
