কোন কথাটা?
কেউ চাইছে না এমন কিন্তু নয়। অন্তত বোস সাহেব চেয়েছিলেন যে আপনি দোকান-টোকান কিছু করে সেলফ-সাফিসিয়েন্ট হোন।
বটে? বলেনি তো কখনও।
আমাকে বলেছিলেন। আমি তাকে অন্য পরামর্শ দিই।
মণিদীপাকে এই স্বীকারোক্তি খুব একটা স্পর্শ করে না। তবু আলগা গলায় জিজ্ঞেস করে, তারপর?
তারপর আর কথাটা এগোয়নি। তবে ভাবছি, এখন একবার বোস সাহেবকে অ্যাপ্রোচ করলে উনি হয়তো টাকাটা দিয়ে দেবেন আপনাকে।
দিয়ে দেবে ঠিকই। বাট হি উইল বাই হিজ লিবার্টি বাই দ্যাট মানি।
কিন্তু আপনিও লিবার্টি দিতেই চান।
চাই। কিন্তু সেটা টাকার বিনিময়ে নয়। আই উইল গিভ হিম লিবার্টি আউট অফ পিটি, আউট অফ হেট্রেড। টাকা নয়।
দীপনাথ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, বড় গোলমালে ফেললেন।
আমাকে নিয়ে আপনার অনেক গোলমাল চলছে, সরি দীপনাথবাবু।
এই সময়ে বেয়ারা ট্রে ভর্তি খাবার আনে এবং ক্ষুধার্ত দীপনাথ খেতে খেতে গোটা সমস্যাটাই ভুলে যায়।
৭১. বহুদিন বাদে ছবির কাছে
বহুদিন বাদে ছবির কাছে একটা আয়না চাইল প্রীতম, আয়নাটা দে তো ছবি, আজ আমি নিজেই দাড়িটা কামাব।
কেন বড়দা? হারু নাপিত তো কামাতে আসবেই।
না, আজ একটু সেলফ-সার্ভিস করে দেখি।
ছবি দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম এনে দেয়। আয়নাটা ভারী অদ্ভুত। প্ল্যাস্টিকের ফ্রেমে বাঁধানো ছোট আয়নাটার দুপিঠেই মুখ দেখা যায়। একপিঠে ম্যাগনিফাইং উত্তল কাচ থাকায় মুখটা বিরাট বড় দেখায়। এ জিনিসটা এই প্রথম দেখল প্রীতম। তার অসুস্থতার অবকাশে কত নতুন জিনিস বেরিয়ে গেছে। নিজের চার-পাঁচ গুণ বড় মুখের দিকে চেয়ে রইল প্রীতম। সে কতটা শীর্ণ, কতটা ফ্যাকাসে তা ঠিক বুঝতে পারল না। তবে সে যে দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড এবং বিপুল শক্তিমান সে কথা আয়নাটা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল। সেই সঙ্গে এ কথাও মনে করিয়ে দিয়ে লাগল যে, দু’-তিন বছর আগেও সে যেমন ছিমছাম স্মার্ট চেহারার মানুষ ছিল এখনও সেইরকমই আছে।
বিনা দুর্ঘটনায় দাড়ি কামিয়ে ফেলে প্রীতম বারান্দায় তার প্রিয় চেয়ারে গিয়ে বসে। হাতে আয়নাটা। আরও স্পষ্ট আলোয় আয়নাটা মুখের সামনে ধরে সে নিজেকে মিথ্যে মিথ্যে করে বলে, তুমি আগের চেয়ে ভাল আছ। তোমার উন্নতি হচ্ছে। তুমি মরবে না।
নিজেকে সে প্রশ্ন করতে লাগল:
জীবাণুদের কোলাহল?
নেই। বহুকাল শুনিনি।
সেই নিঃসঙ্গতার বাঘটা?
ডাকছে না।
মৃত্যুভয়?
একটু আছে। এত সামান্য যে ঠিক ভয় বলা যায় না। মৃত্যু-চিন্তাই হবে হয়তো।
তবে যাও প্রীতম, তুমি মুক্ত। যেখানে খুশি চলে যাও।
যাব?
যাও।
মরমের সাইকেলটা বারান্দায় ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। লক করা, কিন্তু চাবিটা খুলে নেয়নি মরম।
কিছু না ভেবেই প্রীতম চেয়ার ছেড়ে ওঠে। বারান্দা থেকেই উবু হয়ে চাপে সাইকেলের সিটে। লকটা খুলে নেয়। শরীর কাঁপে, পা কাঁপে। তবে খুব বেশি নয়। সিটে বসে সামান্যক্ষণ দম নেয় সে। প্যাডেলে ডান পা রেখে বাঁ পায়ে যতদূর সম্ভব জোরে একটা চাড় দেয় সে। হ্যান্ডেলটা বার দুই প্রচণ্ডভাবে ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে গিয়ে আচমকা সোজা হয়।
একটু ঢালু মতো জায়গাটার ওপর দিয়ে হঠাৎ সাইকেলটা গড়িয়ে যেতে থাকে। ভীষণ কাপছে হাতল, ভীষণ দুলছে প্রীতম। কিন্তু চেষ্টাই তো জীবন। প্রাণপণে সে পা দিয়ে প্যাডল করতে চেষ্টা করে।
রাস্তার ধারে ড্রেনের ওপর পাতা কংক্রিটের অপ্রশস্ত সাঁকোটা শুধু কপালজোরে পেরোতে পারে সে। তারপর রাস্তা… বিপজ্জনক… ভয়ংকর… তবু মুক্তি!
আশ্চর্য এই, টলোমলো সাইকেলটা পড়েও গেল না। চৌপথী ছাড়িয়ে গড়গড়িয়ে চলতে লাগল। চলন্ত সাইকেলে প্যাডল করতে খুব বেশি কষ্ট নেই। কিন্তু কষ্ট হ্যান্ডেল সোজা রাখায়। এ পাড়ায় ক্কচিৎ কদাচিৎ এক-আধটা মোটরগাড়ি আসে। রিকশা অবশ্য অনেক। আর সাইকেল। প্রীতমের ভয় করছিল, হয় কোনও সাইকেল বা রিকশার সঙ্গে ধাক্কা খাবে, নয়তো রাস্তা ছেড়ে পাশের নর্দমায় গিয়ে পড়বে।
কিন্তু পড়ছিল না। চৌপথী ছাড়িয়ে মাঠের ধার অবধি চলে এল সে। পিছনে একটা হইচই শোনা যাচ্ছে। আশেপাশের লোক অবাক হয়ে দেখছে। আনন্দধামের বারান্দা থেকে পিনুর মা অবাক গলায় চেঁচাচ্ছেন, ওরে শম্ভু! ও তারক! শিগগির গিয়ে প্রীতমকে ধর। দেখ, কী সর্বনেশে কাণ্ড করছে ছেলেটা!
হ্যাঁ, এটা ঠিকই যে, সে একটা সর্বনেশে কাণ্ডই করছে আজ। কিন্তু এই আধখানা বেঁচে থাকার নিরন্তর বন্দিত্ব থেকে মুক্তি আর খুব দুরে নয়। অনেকদিন তার জীবনে মৃত্যুর শাসন বড় গুরুভার হয়ে চেপে বসে আছে। সে তো জানে, মরবেই, তাই মৃত্যুর হাত থেকে এই ছুটি নেওয়া।
ওরা তাকে ধরে ফেলবে। পিছনে ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ আসছে। কারা চেঁচিয়ে ডাকছে, প্রীতমদা! প্রীতমদা! থামুন! আমরা আসছি।
প্রীতম তার সর্বস্ব দিয়ে ভর দিল প্যাডেলে। তার দুর্বল পায়ে তেমন জোর নেই যে সাইকেলকে এরোপ্লেনের মতো ছোটাবে। তবু এই অবস্থায় যতখানি জোরে সম্ভব সাইকেল ছুটতে থাকে। হ্যান্ডেলের আঁকাবাঁকা হয়ে যাওয়াটা একটু কমে এল। স্থির হল। সরু রাস্তায় যথাসাধ্য ধার ঘেঁষেই প্রীতম চালিয়ে নিতে পারছে। উল্টোদিকের চারটি রিকশা অনেকটা তফাত দিয়ে পেরিয়ে গেল তাকে। একটা মোটরগাড়িও। উত্তরাভিমুখী প্রীতমের সাইকেল রইল বহমান। কিন্তু এ পাড়ার শতকরা পঞ্চাশজনই তাকে চেনে। অচেনারাও সাইকেলে রুগ্ন চেহারার লোকটাকে দেখে অবাক হয়। সুতরাং সে প্রবলভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। পিছন দিক থেকে একটা-দুটো স্বাস্থ্যবান ছেলে বেগবান সাইকেলে এসে এক্ষুনি তাকে ধরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, তাও জানে প্রীতম। তাই সে যতদূর সম্ভব চেনা পরিচয়ের গন্ডি পেরিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো বাঁক ফিরল। কিন্তু বুকে হাঁফ ধরে আসছে, গায়ে ঘাম, হাত-পায়ের প্রতিটি সন্ধিতে খিল-ধরার যন্ত্রণা। প্রচণ্ড রোদে তার চোখ ঝলসে যাচ্ছিল। চোখের দৃষ্টিও কিছুটা আবছা এখন।
