বাবা? সজল মুখ টিপে আপনমনে হাসে। সে শুনেছে শ্রীনাথ তার বাবাও নয়। তার আসল বাবা হল জেঠু।
জেঠুই বাবা? ভাবতে একরকম রোমহর্ষ আর আনন্দ হয় তার। লম্বা চওড়া হুল্লোড়বাজ ওই লোকটার কথা মনে হলেই তার ভাল লাগে।
হে ভগবান, জেঠুই যেন তার আসল বাবা হয়।
০৬. মালদা থেকে গভীর রাতে দার্জিলিং মেল
মালদা থেকে গভীর রাতে দার্জিলিং মেল ধরল সরিৎ। ট্রেনে অসম্ভব ভিড়। এই শীতে সাধারণত ভিড় এত হয় না কলকাতা-যাত্রীদের। তার কপালে হল। টিকিট কেটে ট্রেনে ওঠবার অভ্যাস বহুকাল হল তার নেই। দরকার হয় না। সব লাইনেই আজকাল রেলের রানিং স্টাফ একটা প্যারালেল ব্যবস্থা চালু রেখেছে। সেকেন্ড ক্লাস টিকিটের প্রায় অর্ধেক খরচে দিব্যি যাতায়াত করা যায়। মালদার রেলের লোকেরা প্রায় সবাই সরিতের চেনা বা মুখচেনা। স্টেশনের চ্যাটার্জিদাকে ধরতেই রেটটা আরও কিছু কমে গেল। চ্যাটার্জিদা বললেন, থ্রি টায়ারে উঠে কন্ডাক্টর গার্ডকে দুটো টাকা দিয়ে, আরামে শুয়ে যেতে পারবে।
কিন্তু সরিতের কাছে দুটো টাকাও অনেক টাকা। দু’ প্যাকেট চারমিনার আর দেশলাই হয়েও বেশি থাকবে। ফালতু ঘুমোনোর জন্য উঠতে হল। পাঁচ-সাতজন বন্ধু তুলে দিতে এসেছিল স্টেশনে। তারাও বলল, ওঠ।
কন্ডাক্টর লোকটা মহা ফ্যাচালে পার্টির। কেবল খ্যাচ খ্যাচ করে যাচ্ছিল, নেমে যান, নেমে যান। আজ কোনও অ্যাকোমোডেশন নেই।
বলে লোকটা মালদা স্টেশনেই জি আর পি ডেকে আনল। মহা ঝামেলা!
সরিৎ বেগতিক দেখে নেমে পড়েছিল। পিছন দিকে একটা মিলিটারি কামরা মোটামুটি ফাঁকা এবং দরজা খোলা দেখে আরও দশ বারোজন যাত্রীর সঙ্গে সেটাতে উঠে পড়ে সরিৎ। ঘুমন্ত আধ-ঘুমন্ত মিলিটারিরা প্রথমে কিছু বলেনি। তারপরই হঠাৎ দশ-বারোটা কালো কালো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরা জওয়ান তেড়ে এসে হুমহাম করে ভারতের অচেনা কোনও ভাষায় প্রচণ্ড ধমক চমক দিতে লাগল। ধমক শুনে ভয় খেলেও ট্রেন ছাড়ার সেই শেষ মুহূর্তে কারও নামবার ইচ্ছে ছিল না। তখনই হঠাৎ বিনা নোটিশে মিলিটারিগুলো কিল চড় আর লাথি চালাতে শুরু করে। কে মার খেল আর কে খেল না তা দেখার জন্য দাঁড়ায়নি সরিৎ। মালদা শহরে সে মস্তানি করে বেড়ায় বটে, কিন্তু মিলিটারি কামরায় হুজ্জতি করলে যে জল কত দূর গড়াবে তার ঠিক নেই বলে ঝট করে নেমে। পড়ল। কিন্তু অপমানটা পুরো এড়াতে পারল না। নামবাব মুহূর্তে পাছায় একটা কেডস পরা পায়ের প্রবল লাথি হজম করতে হল।
বন্ধুরা দৃশ্যটা হয়তো দেখেনি, এই যা ভরসা। ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে, সরিৎ দৌড়ে গিয়ে ফের থ্রি টায়ারে উঠে পড়ল। আবার কন্ডাক্টরের খ্যাচ খ্যাচ, ভীতি প্রদর্শন এবং যাত্রীদের দিক থেকেও প্রবল প্রতিবাদ।
সরিৎ জানে, বোবার শত্রু নেই। তাই চুপ করে কিটব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দরজা ঘেঁষে। কন্ডাক্টরকে দুটো টাকাই দিতে হবে, না কি কিছু কম-সম দিলেও হবে তা বুঝতে পারছিল না। দু’জন আর্মড পুলিশও কামরা পাহারা দেওয়ার জন্য উঠেছে। ডাকাত উঠলে আটকাবে। তবে তারা সরিৎকে কিছু বলল না। আরও জনা তিন-চার সরিতের মতোই ফালতু যাত্রী বাথরুমের গলিতে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কন্ডাক্টর অবশ্য আর বেশি খ্যাচ খ্যাচ করল না। খানিক বাদে যাত্রীরা যে যার ঘুমিয়ে পড়লে দরজার প্যাসেজে দাঁড়িয়ে একটা কাগজের দিকে খুব আনমনে চেয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল, কোথায় যাবেন?
সরিৎ পকেট থেকে একটা আধুলি বের করল। কন্ডাক্টর আড়চোখে আধুলিটা দেখে বলল, ওতে হবে না। এক টাকা।
সরিৎ পয়সা বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে বলল, জায়গা করে দিতে পারলে দু টাকা দিতাম। জায়গা তো নেই, মেঝেয় বসে যাব না হয়।
আবার খ্যাচ খ্যাচ। তবে কন্ডাক্টর তার নিজের বরাদ্দ লম্বা বেঞ্চটায় সিপাইদের পাশাপাশি সব ক’জন ফালতু যাত্রীর বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে এক টাকা করেই নিল। কিছুক্ষণ বাদে সিগারেট-টিগারেট দেওয়া-নেওয়া এবং গল্পসল্পও হতে লাগল।
সরিৎ অবশ্য বুড়ো কন্ডাক্টর বা বয়স্ক যাত্রীদের সঙ্গে জমাল না। একা বসে চোখ বুজে রইল, ঘুম আসবে না জানা কথা। মিলিটারির লাথিটা মাজায় জমে টনটন করছে। ফালতু ঝামেলা যত সব। ভাবতে গেলে অপমানে গায়ের ভিতরে জ্বালা ধরে যায়। তবু এত অপমান-অনাদরের পরেও যে বসার জায়গা পেয়েছে সেটাই একমাত্র তৃপ্তি।
সেজদি এতকাল তাদের বিশেষ পাত্তা দেয়নি। পয়সা হলে কে কাকে পাত্তা দেয়? সেজদি অবশ্য উলটো কথা বলে। তার যখন পয়সা ছিল না তখন নাকি বাপের বাড়ির লোকেরাই তাকে তেমন পাত্তা দিত না। সংসারের এইসব কূটকচালে ব্যাপার অবশ্য সরিৎ অত তলিয়ে বোঝে না। এতকাল পরে সেজদি যে তার বেকার ছোট ভাইকে ডেকে পাঠিয়েছে সেইটেই ঢের। সেজদির গোরু চরাতেও সে রাজি আছে, পয়সা পেলে। তারপর কলকাতায় একটা কিছু জুটে যাবে ঠিকই। কলকাতা তো আর মালদা নয়।
বড়দা মালদার সিভিল হাসপাতালের ডাক্তার। কান, নাক আর গলার স্পেশালিস্ট। কিন্তু ই এন টি-র ডাক্তারের তেমন প্রাইভেট প্র্যাকটিস থাকে না। বড়দারও নেই। তার ওপর লোকটা ঘরকুনো এবং ব্রিজ খেলার পাগল। যেখানেই বদলি হয়ে যায় সেখানেই ঠিক তার ব্রিজের বন্ধু জুটে যাবেই। ওই খেলাই বড়দার কাল হয়েছে। ডাক্তারির ব্যাপারটাকে আদৌ গুরুত্ব না দিতে দিতে রুগিদের কাছে এখন আর তার আদর নেই। পসার না থাকায় বাঁধা মাইনেয় সংসার চালাতে হয়। মধ্যপ্রদেশে মেজদার কাছে মা বাবা থাকে, সরিৎ আর তার ছোড়দি পড়ে আছে বড়দার ঘাড়ে। বউদি প্রথম-প্রথম খারাপ ব্যবহার করত না। ছোড়দি এই সংসারে রান্নাবান্না থেকে যাবতীয় কাজ বুক দিয়ে করে। তবু ইদানীং বউদি বস্তিবাড়ির মেয়েদের মতো জঘন্য সব গালাগাল দিয়ে ছোড়দির ভূত ভাগিয়ে দিচ্ছে। মুশকিল হল, ছোড়দিটার বিয়ে হওয়ার চান্স খুব কম। ওর কী একটা মেয়েলি রোগ থাকায় ডাক্তার বিয়ে দিতে বারণ করেছে। তবু হয়ে যেত হয়তো, কিন্তু ছোড়দি দেখতে খুব খারাপ। রোগা, কালো, তার ওপর মুখটা এমন ভাঙাচোরা যে, বুড়ির মতো দেখায়। সুতরাং ছোড়দির আর গতি নেই বড়দার আশ্রয় ছাড়া। সেইটে সার বুঝে বড় বউদি ছোড়দির ওপর সাত জন্মের শোধ তুলে নিচ্ছে। নিক, তাতে সবিতের তেমন আপত্তি নেই। ছোড়দিও বড় কম যায় না, যখন মুখ ছোটায় তখন দিনকে রাত করে দিতে পারে। কিন্তু সরিতের বিপদ নিজেকে নিয়ে। বি এস-সি পাশ করে বহুদিন বসে আছে। বয়স ছাব্বিশের কাছাকাছি। বড়দাবউদি খাওয়াচ্ছে বটে, কিন্তু খুশিমনে নয়। সরিৎ সংসারে বাজার হাট করা থেকে জল তোলা পর্যন্ত সবই করে দেয়, তবু হাতখরচ চালাতে তিন-চারটে টিউশানি করতে হয় তাকে। বড়দা খাওয়া ছাড়া আর কিছু দেয় না। ইচ্ছে থাকলেও বউদির জন্য দেওয়া সম্ভব নয়।
