না। কোথায় ওদের আন্ডারগ্রাউন্ড সেন্টার তাও আমি জানি না।
টাকার কোনও রসিদ পেয়েছেন কখনও?
না। সেরকম নিয়ম নেই।
দীপনাথ আবার অন্য দিক থেকে সওয়াল শুরু করে, স্নিগ্ধদেব যখন আমেরিকায় গেল তখন ধরে নিতে হবে সে পার্টির আদর্শে অনুগত ছিল না। সে যে টাকাটা পার্টির ফান্ডেই জমা দিয়েছে এমন কথাও মনে করা যায় না। মোর ওভার, সে ছিল দরিদ্র স্কুলমাস্টার।
মণিদীপা তীক্ষ্ণ চোখে দীপনাথকে ভস্ম করে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, মানছি স্নিগ্ধ ইজ নাউ এ ফলেন গাই। কিন্তু বরাবরই সে এ রকম ছিল না।
আপনি কী করে জানেন, বোকা মেয়ে? স্নিগ্ধদেবের মতো সুপার ইনটেলিজেন্সের লোককে বুঝতে পারা কি সহজ?
আপনি বিচার করছেন কিছু না জেনেই। স্নিগ্ধদেবকে আপনি চোখেও দেখেননি কখনও।
আমি অভিজ্ঞতা থেকেই জানি।
মণিদীপা তার ঘাড় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে নেড়ে বলে, না জানেন না। স্নিগ্ধ নিজের দরকারে টাকা চাইলেও আমি দিতাম। স্নিগ্ধ নিজের জন্য কখনও ভাবত না। তার ধ্যানজ্ঞান ছিল পার্টি এবং আদর্শ। বিপ্লবের জন্য অনেক টাকা দরকার। স্নিগ্ধদেব গরিব হলেও নিজের মাইনে থেকে একটা
পারসেনটেজ বরাবর পাটিতে ডোনেট করত।
ওঁর পতনের শুরু কবে থেকে তা কি আপনি জানেন?
না। ওর স্বভাব ভীষণ চাপা।
এমনও তো হতে পারে স্নিগ্ধদেবের পতন অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আপনি টের পাননি। আপনি ওঁর বাইরের ছদ্মবেশেই মুগ্ধ ছিলেন, আর তখন স্নিগ্ধদেব পার্টির নাম করে আপনার কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিজের ঘর গোছাত!
এ রকম হতে পারে না তা বলছি না। কিন্তু হয়নি।
আপনি এখনও স্নিগ্ধদেবের প্রতি দুর্বল।
মণিদীপা মৃদু হেসে বলে, যেমন আপনি এখনও স্নিগ্ধ সম্পর্কে ভীষণ ভীষণ জেলাস।
দীপনাথ গাম্ভীর্য ঝেড়ে হেসে ফেলে। অত্যন্ত সরল প্রাণখোলা হাসি। তারপর বলে, তবু বলি স্নিগ্ধদেবের খপ্পরে পড়ে আপনি অর্ধেকটা জীবন নষ্ট করেছেন।
মুহূর্তে মণিদীপা জবাব দেয়, বাকি অর্ধেকটা নষ্ট করেছে কে জানেন? যে মূর্তিমানটি এখন আমার সামনে বসে জ্বালাচ্ছে।
দীপনাথ হাসল, লাল হল। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, স্নিগ্ধদেব কিন্তু সত্যিই টাকাটা আপনাকে ধার হিসেবে দিতে পারেন। একটা চিঠি লিখে দেখুন না!
কিন্তু আমি যে স্নিগ্ধর টাকা চাই না। না খেতে পেয়ে মরলেও না।
কেন বলুন তো!–দীপনাথ সন্দেহের গলায় জিজ্ঞেস করে।
দ্যাট ইজ মাই কনসেপশন অফ সেলফ-রেসপেক্ট। যাকে আমি এক সময়ে টাকা দিয়েছি, তার কাছে হাত পাততে আমার আত্মমর্যাদায় লাগে। থ্যাংক ফর দি সাজেশন, বাট ইট ইজ নট অ্যাকসেপটেবল।
দীপনাথ মৃদু হাসে। বলে, আমি অবশ্য জানতাম।
কী জানতেন?
আপনি স্নিগ্ধদেবের টাকা নেবেন না। অনেক দিন আগে আপনি একবার বলেছিলেন, বোস সাহেব ছাড়া অন্য কারও টাকা নিতে আপনার ঘেন্না করে।
মণিদীপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, হ্যাঁ। আজও করে। আফটার হোয়াট হ্যাজ গন বিটউইন আস। কিন্তু আমরা প্রসঙ্গ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
প্রসঙ্গটা কী যেন?
সেলামির টাকা।
কত তা এখনও বলেননি।
দুই লাখ।
দীপনাথ হাঁ করে চেয়ে থেকে হঠাৎ চাপা আর্তস্বরে বলে উঠল, জল! জল! বাতাস!
মণিদীপা তড়িঘড়ি উঠতে গিয়েও থেমে হেসে ফেলে, খুব প্র্যাকটিক্যাল জোক শিখেছেন!
বাস্তবিকই আমার মাথা ঘুরছে।
ইয়ারকি মারবেন না! ইট ইজ এ কোশ্চেন অফ মাই একজিসটেনস।
দু’লাখ! আমি ভুল শুনিনি তো!
না। আর আপনি এও জানেন যে, দু’-তিন লাখে আজকাল কিছুই হয় না। আপনি এখন একটি বড় বিজনেস ফার্মের প্রায় হর্তাকর্তা। আপনার না জানার কথা নয়।
দীপনাথকে আজ দীর্ঘশ্বাসে পেয়েছে। খুব জোরালো একটা শ্বাস ফেলে সে বলে, আমরা হচ্ছি চিনির বলদ। কিন্তু মিসেস বোস, আমি আপনাকে খুশি করতে আমার যা সাধ্য তা করব।
করবেন?
করব। আমার নিজের বোধহয় হাজার ত্রিশেক টাকা ব্যাংকে আছে। এল আই সি থেকেও কিছু রেইজ করতে পারি। অফিসও কিছু অ্যাডভানস দেবে। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ-ষাট হাজার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর বেশি নয়।
আপনি দেবেন?–খুব অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে থাকে মণিদীপা।
দিলে আপনি নেবেন না?
মণিদীপা জবাব দিতে পারে না অনেকক্ষণ। দীপনাথ–দীপনাথই হয়তো তার সত্যিকারের সর্বনাশের মূল। তবু বহুকাল ধরে গোপনে গোপনে নদীর ভূমিক্ষয়ের মতো মণিদীপার সব অহংকার ভাসিয়ে নিয়েছে যে অনভিপ্রেত ভালবাসা তারই মোহনা ওই দীপনাথ। কোনওদিনই আর দীপনাথকে ভালবাসার কথা বলবে না মণিদীপা। কিন্তু ভাল না বেসেও তার উপায় নেই। কিন্তু দীপনাথের টাকাও যে নেওয়া যায় না। কিছুতেই না।
মণিদীপা ঠোঁট উলটে বলল, একজন শ্লেভের টাকা নিয়ে তাকে নিঃস্ব করে দিতে চাই না।
প্রশ্নটা নয়। প্রশ্ন হল আমার টাকা নিতে আপনার কোনও শুচিবায়ু আছে কি না!
হয়তো আছে।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দীপনাথ বলে, বাঁচলাম। পৃথিবীতে এখনও এইজন্যই বুঝি চন্দ্র-সূর্য ওঠে।
কথাটার মানে কী?
মানে বুঝে আপনার দরকার নেই। আই ওয়াজ জাস্ট থিংকিং অ্যালাউড! কিন্তু টাকা না নিলে আপনার দোকানের কী হবে?
মণিদীপা হঠাৎ বসে বসে ছেলেমানুষের মতো ঠ্যাং দুটি নাচাল একটু। তারপর নিপাট ভালমানুষের মতো মুখ করে বলল, হবে না।
হবে না?
না। কেউ যখন চাইছে না তখন না হওয়াই ভাল।
দীপনাথ ভ্রু কুঁচকে একটু কী যেন ভাবে। তারপর হঠাৎ একটু সরল হাসি হেসে বলে, কথাটা ঠিক হল না।
