স্টক কিনতে কত লাগবে তোমার কোনও আইডিয়া আছে?
তুমি তো বাপু যোধপুরের বড়লোকদের ঘোল খাওয়াতে চাও। তা হলে কস্টলি শাড়ি বা এক্সক্লসিভ চাই। দ্যাট উইল কস্ট ইউ মোর।
তবু শুনি।
আমার কোনও আইডিয়া নেই। রাফলি অ্যানাদার লাখ। সবশুদ্ধ আড়াই নিয়ে নেমে পড়ো।
আমি তোমার সঙ্গে শিগগিরই দেখা করব।
শিগগির নয়। কালই। কোনও স্পেস পড়ে থাকছে না। দেয়ার আর পিপল টু পে টু লাখস ফর দ্যাট শপ। ভাল কথা, তোমার হাজব্যান্ড কেমন?
ভাল।
কবে আনছ নার্সিংহোম থেকে?
দু’এক দিনের মধ্যেই।
আজ ছাড়ছি। কাল সকালের দিকেই চলে এসো।
আচ্ছা। বলে ফোন ছাড়ে মণিদীপা। তারপর সম্পূর্ণ বে-খেয়ালে সে একটা চেনা নম্বর ডায়াল করে।
হ্যালো! বলেই জিভ কাটে মণিদীপা। মনে ছিল না, বিভ্রম। নইলে দীপনাথের সঙ্গে যে এখন তার টকিং টার্মসই নেই।
ওপাশ থেকে গম্ভীর গমগমে সেই কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, হ্যালো। চ্যাটার্জি স্পিকিং, হ্যালো।
মণিদীপার গায়ে কাঁটা দেয়। বুক ঢিপঢিপ করে। সর্বোপরি গলা কেঁপে যায়।
একটু সময় নিয়ে সে বলে, হ্যালো!
দীপনাথ হঠাৎ বুঝি গলাটা চিনতে পারে। একটু হেসে বলে, কী হল? বলুন! আমি সেই দীন সেবক দীপনাথ।
বাজে বকবেন না।
কোনও প্রবলেম নাকি?
হুঁ। কিন্তু আপনাকে বলে লাভ কী?
এখনও কি মাথায় ব্যাবসা ঘুরে বেড়াচ্ছে?
বেড়াচ্ছে।
কী করতে হবে আমাকে? টাকার জোগাড়?
পারবেন?
কত?
ওঃ সে অনেক। থাক, বলব না।
৭০. অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল বিকেলে
অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল বিকেলে। অফিসের পর দীপনাথ সোজা চলে আসে নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে। আজ বোস সাহেব নেই। মণিদীপা একা রয়েছে। দীপনাথের আজ বুক কাপল না।
দরজা হাট করে খোলা। পরদা সরিয়ে দীপনাথ অতি পরিচিত বাসস্থানটিতে ঢুকল। আপাতদৃষ্টিতে মনোরমভাবে সাজানো, শান্ত ও সুন্দর এই বাসাটির ভিত ভিতরে ভিতরে কত ক্ষয়ে গেছে তা তার মতো নির্মমভাবে আর কে জানে!
তবু কয়েক দিনের অবিরল বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও দুশ্চিন্তা করে আর একটি জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে খুঁজতে দীপনাথ বুঝি কিছু প্রবীণ হয়েছে। বয়ঃসন্ধির সেই আবেগ আর নেই। বয়ঃসন্ধি! এই বয়সে কথাটা তার ক্ষেত্রে আর চলে না। তবে ভেবে দেখলে তার কৈশোরের বয়ঃসন্ধি তো আজও ঠিক মতো কাটেনি।
সাদা খোলের কালো নকশাপাড় একটা শাড়ি গায়ে আঁট করে জড়ানো, মিশমিশে কালো ব্লাউজ আর এলো খোপায় মণিদীপাকে আজ দারুণ ভাল দেখাল ভিতরের ঘর থেকে বসবার ঘরে ঢুকবার সময়। দীপনাথ মণিদীপার প্রবেশ থেকে বসা পর্যন্ত অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখল।
আজ দু’জনেই অস্বাভাবিক শান্ত।
দীপনাথ বিনা ভূমিকায় মৃদু স্বরে বলে, কী ঠিক করলেন?
মণিদীপা ততোধিক মৃদু স্বরে অপরাধী মুখে বলে, আমার এ ছাড়া উপায় নেই। গড়িয়াহাটা ব্রিজের ওপাশে একটা দোকানঘর পাওয়া গেছে। অনেক টাকা সেলামি চাইছে।
কত টাকা?
শুনলে আপনি বকবেন।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, তা হলে না-ই বললেন। কারণ আপনার সোর্স অফ ক্যাপিটাল খুবই লিমিটেড।
মণিদীপা হাল ছাড়তে চায় না। তাই করুণ গলায় বলে, আমার কিছু গয়না আছে। বেচলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে। বাকিটা কোনও ব্যাংক বা কেউ দেবে না?
আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে এটুকু জানি, সেলামির খাতে কোনও লেজিটিমেট লোন থেকে টাকা পাওয়া অসম্ভব। আপনি সেলামির জন্য টাকা চাইছেন শুনলে কোন ব্যাংকার খুশি হবে বলুন!
আমি আপনার পরামর্শই চাইছি। শুধু শুধু কেন নেগেটিভ সাজেশন দিচ্ছেন!
আপনার দোকান যদি না চলে তা হলে টাকা পেলেও শোধ দেবেন কেমন করে?
চলবে। আমি জানি চলবে।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, আপনি জানেন না যে আপনি আসলে স্বপ্ন দেখছেন। এই হাড্ডাহাড্ডি কমপিটিশনের বাজারে আপনার মতো অনভিজ্ঞের পক্ষে দোকান চালানো কত শক্ত জানেন?
আমি পারব দেখবেন। দীপনাথ আর-একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আপনি আপনার না-হওয়া দোকানটাকে ইতিমধ্যেই ভালবেসে ফেলেছেন দেখছি।
আমার বাপের বাড়ি ওই এলাকায়। দরকার হলে আমার ভাইরাও হেলপ করতে পারবে। যোধপুর পার্কে আমার চেনাজানা অনেকে আছেন, তারাও পেট্রনাইজ করবেন। দোকানটা চলবে। আপনি ভাববেন না।
দীপনাথ আচমকা জিজ্ঞেস করে, স্নিগ্ধদেব এখন কোথায়?
মণিদীপা একটু অবাক হয়ে বলে, কেন, আমেরিকায়! আপনাকে তো বলেইছি।
দীপনাথ একটু হাসল, জানি। শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম। এক বিপ্লবী আমেরিকায় দেদার টাকা কামাচ্ছে, আর এক বিপ্লবিনী যোধপুরে শাড়ির দোকান খুলতে সেলামির টাকা জোগাড় করছে। বিপ্লবকে একদম ড়ুবিয়ে দিলেন মিসেস বোস!
মণিদীপা একটু গম্ভীর হয়, শুনুন, কী একটা কথা আছে না! হাতি ফাঁদে পড়লে…
দীপনাথ শব্দ করে হাসল।
আমিই সেই চামচিকে তা হলে! যাকগে, নো অফেনস টেকন। আমি বলতে চাইছিলাম, টাকাটা তো অনায়াসেই স্নিগ্ধদেব আপনাকে পাঠাতে পারে। ধার হিসেবেই দিক। পরে দেশে এলে শোধ দিয়ে দেবেন।
স্নিগ্ধর টাকা নেব?
কেন নয়? এক সময়ে তাকে আপনি বিস্তর টাকা দিয়েছেন। কত টাকা তার হিসেব আছে?
মণিদীপা খুব গম্ভীর রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, স্নিগ্ধকে আমি যত টাকা দিয়েছি তা হিসেব করলে হয়তো এই সেলামির টাকার চেয়ে বেশি দাঁড়াবে। কিন্তু টাকাটা তো স্নিগ্ধ নেয়নি, পার্টির কাজে লেগেছে।
ঠিক জানেন?
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলল, না। তবে স্নিগ্ধকে অবিশ্বাস করারও কিছু নেই।
পার্টির সঙ্গে আপনার ডাইরেক্ট যোগাযোগ ছিল না?
