কেন, তোর বাবাকে দেখার লোকের অভাব আছে নাকি?
বাবা আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না।
দীপনাথ একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সজল কি মেজদার ছেলে? না বড়দার? লোকে নানা কথা বলে। সেসব কি সত্যি? তবু শ্রীনাথের প্রতি সজলের এই প্রগাঢ় টান বড় ভাল লাগল দীপনাথের। শ্রীনাথের ছেলে যদি না-ও হয়ে থাকে সজল, তা হলেও এই বংশেরই ছেলে। দীপনাথ আর-একবার মায়াভরে সজলের লম্বা চিকন চুলে ভরা মাথাটা একটু নেড়ে দেয়। বলে, ঠিক আছে। কিন্তু এখানে থাকলে শুধু বাবাকে নিয়ে থাকলেই তো হবে না, মা তো ভেসে আসেনি। মাকে দেখবে কে?
বাঃ, মা’র তো বাবার মতো অবস্থা নয়। মাকে দেখার কী আছে?
সজলের চোখে হঠাৎ যে ঝলকানি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল তা বেশ লক্ষ করল দীপনাথ। ঘৃণা, বিদ্বেষ, আক্রোশ সব দগদগ করছে ভিতরে। কিন্তু ওইটুকু বাচ্চা ছেলের মন এত বিষিয়ে গেল কী করে তা ভেবে পেল না দীপনাথ। আবার সজলের জন্ম-রহস্য নিয়ে প্রশ্ন উঁকি দেয় মনের মধ্যে। বড়দা মল্লিনাথের ছিল বুনো শুয়োরের মতো গোঁ, খ্যাপা রাগ, ভয়ংকর সাহস। যার ওপর রেগে যেত তাকে পারলে খুন করে। সজলের চেহারায় এবং স্বভাবে নির্ভুল সেই বড়দার ছাপ।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠল। মন ভাল নেই। কোথাও বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না।
সন্ধেবেলা বউদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে ফেরার ট্রেন ধরল। তৃষা অনেকবার তাকে আটকাতে চাইল, কিন্তু দীপনাথ থাকতে রাজি হল না। অনেক ভাঙচুরের টুকরো চারিদিকে ছড়ানো। জোড়া লাগানোর এক বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। তবু চেষ্টাই তো জীবন!
হাওড়া থেকে সে সোজা চলে এল নার্সিংহোমে।
বোস সাহেব অনেকটা ভাল। ঘরে ভিজিটর কেউ নেই। একা বোস সাহেব আধশোয়া হয়ে একটা থ্রিলার পড়ার চেষ্টা করছে।
আজকাল দেখা হলে বোস আর তেমন খুশি হয় না। কেবল শূন্যগর্ভ এক দৃষ্টিতে দীপনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওই ভ্যাবলা দৃষ্টির অর্থ বোঝে না দীপনাথ। কিন্তু এটা টের পায়, বোসের ভিতরে খুব বড় রকমের একটা ভূমিক্ষয় ঘটে যাচ্ছে।
আজ কেমন আছেন?
তেমন কিছু খারাপ নয়। তবে এত ওষুধ খাওয়াচ্ছে যে, মুখটা বিস্বাদ।
এবার কিছুদিন কোথাও বেড়িয়ে আসুন।
কোথায় যাব?-হতাশার গলায় বোস বলে।
যে-কোনও স্বাস্থ্যকর জায়গায়।
বোস করুণ মুখ করে বিশাল জানালা দিয়ে বাইরে আদিগন্ত কলকাতার আলো-অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। গিয়ে লাভ নেই।
দীপনাথ কী বলবে, চুপ করে থাকে।
বোস সাহেব দূরের দিকে চেয়ে থেকেই বলে, আপনি আমার ভাল করতে চাইছেন, সে কথা শুনেছি। কিন্তু আমার কীসে ভাল হয় তা আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করাটা ঠিক নয়। তাতে ভাল না হয়ে খারাপও হতে পারে।
দীপনাথ আস্তে করে বলল, মণিদীপাকে আমি বিয়ে করলে যে ভাল হবে সেটাই বা আপনি তা হলে ধরে নিয়েছিলেন কেন?
বোস একটু হাসল। তবে কিছু বলল না বা দীপনাথের দিকে তাকালও না।
জুয়াড়ির মতো মুখ করে দীপনাথও চুপ করে বসে থাকে।
অনেক অনেকক্ষণ বাদে বোস বলে, আপনারা দুজনে হয়তো সুখী হতে পারতেন।
দীপনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, যার ভালবাসা এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে শিফট করে তাকে আমি ভয় পাই বোস সাহেব।
বোস তেমনি দূরের দিকে চেয়ে বলে, দীপা আপনাকে সত্যিই ভালবাসে।
স্নিগ্ধদেবকেও বাসত।
ইউ আর বিয়িং ক্রুয়েল।
আই অ্যাম সামটাইমস্ টুথফুল।
আপনাকে অ্যাভয়েড করতেই বোধহয় দীপা বিকেলের দিকে আসে না।
উনি কি রোজ আসেন?
বোস সাহেব একটা বড় শ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে বলে, তা আসে। মেকস মি টি, সার্ভস ব্রেকফাস্ট, সিগনিফাইং নাথিং।
দীপনাথ শেক্সপিয়রের ভাঙা উদ্ধৃতির অপব্যবহার শুনে একটু হাসল। বলল, আপনার কাজিনটি একসেপশনাল। কিন্তু তাকে বিয়ে করলেই যে আপনার সমস্যা মিটে যাবে এমন নয়। দেয়ার আর মোর দীপনাথস।
তার মানে?
আপনার যে বয়স এবং স্বাস্থ্যের যা অবস্থা তাতে অত্যন্ত যুবতী কোনও মেয়েকে তেমন কিছুই দেওয়ার নেই আপনার। কথাটা ভেবে দেখবেন।
বোস রাগল না। কিন্তু ঘাবড়ানো মুখে আবার ক্যাবলা চোখে তাকিয়ে রইল দীপনাথের দিকে।
নিঃশব্দে একজন কালো প্রায় কিশোরী নার্স ঘরে আসে। মৃদু ভদ্র স্বরে বলে, ভিজিটিং আওয়ার ইজ ওভাব। প্লিজ…
দীপনাথ ওঠে। দরজার কাছ বরাবর গিয়ে ফিরে তাকায়। নার্স বড় বাতি নিভিয়ে দিয়েছে। সবুজ আলোর এক অপ্রাকৃত পরিমণ্ডলে বোস এখনও আধশোয়া। এই সবুজের মধ্যেও তার মুখের ফ্যাকাসে রং দেখা যাচ্ছে।
বোস অনুচ্চ স্বরে বলল, ইট ওয়াজ এ নক আউট।
দীপনাথ বেরিয়ে আসে।
পেল্লায় বড়লোকদের এই নার্সিংহোমের পিছল মেঝের ওপর দিয়ে লিফটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হয় সুখের এত উপকরণ সাজিয়েও মানুষকে সুখী করা যায় না তা হলে? অ্যাঁ!
অঞ্জু টেলিফোন করল সকালে, হ্যালো দীপা! তোমার জন্য একটা খবর আছে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের ওপাশে একটা ঘর পাওয়া যাচ্ছে। নেবে? দু’লাখ সেলামি।
দু’লাখ! বলে মণিদীপা ঢোঁক গেলে।
দু’লাখ চাইছে। বাট উই মে ট্রাই টু বারগেন। দেড় লাখের নীচে নামবে না ধরে রাখো।
তা হলে ইনিশিয়াল ইনভেস্টমেন্ট যে অনেক পড়বে।
এখন তো সব কিছুই কস্টলি। ইন্টিরিয়র ডেকোরেটররা এক-একটি কাটথ্রোট। তবে আমার চেনা শান্তিনিকেতনের একটি ছেলে আছে। সে অনেক কমে দোকান সাজিয়ে দেবে।
কম মানে কত?
হাজার কুড়ির মধ্যেই। তোমার তো বাপু কেবল শাড়ি বেচা নিয়ে কথা। আমাদের মতো ঝামেলার ব্যাপার তো নয়।
