দীপনাথ সোজা হয়ে জিজ্ঞেস করল, সজল কোথায়?
হিংস্র বন্য বিদ্বেষে ভরা দুটি চোখ একটু আড়াল থেকে লক্ষ রাখছিল তৃষাকে। দীপনাথের শূন্য ঘরের দাওয়ার কাছ ঘেঁষে মস্ত এক নারকেল গাছ। তারই পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে সজল। সে দূর থেকেই টের পাচ্ছিল, তার মা বড়কাকার কাছে চুকলি কাটছে। কীসের চুকলি তা সে জানে না। কিন্তু মায়ের যে সবসময়েই কিছু গোপন করার আছে তা সে জানে। মা বড়কাকাকে কী বলছে তা জানার জন্য সজল ছটফট করছিল। বলতে কী, বড়কাকাকে তার ভীষণ ভাল লাগে। মা যদি তার সম্পর্কে বড়কাকাকে আজেবাজে কথা বলে বিষিয়ে দেয় তবে সে মাকে ছেড়ে দেবে না। বড়কাকার কাছে মা’র সম্পর্কে সব বলে দেবে। যা জানে সব।
সজল নিজেও টের পায়, তার শবীবে রাগ বড় বেশি। এত রাগ যে, সারা গায়ে বিষ-বিছুটির জ্বালা ধরে যায় মাঝে মাঝে। আর তার বেশির ভাগ রাগই মায়ের ওপর। বাবার খাবারে মা বিষ মেশায় কি না তা সে সঠিক জানে না। কিন্তু বাবাকে রামলাখনের আড্ডায় নিয়ে যাওযার জন্য মা যে রঘু স্যাকরাকে লাগিয়ে দিয়েছিল তা সে জানে। লোকমুখে ছেলেবেলাতেই সে শুনেছে, জ্যাঠামশাইয়ের এইসব বিষয়-সম্পত্তি মা খুব সম্ভবে পায়নি। ছোট কাকাকে মা যে গুন্ডা লাগিয়ে মার দিয়েছিল এও তার অজানা নয়। সবচেয়ে বড় হয়ে যে প্রশ্নটা তার মনে দেখা দেয় মাঝে মাঝে, তা হল, তার বাবা কে?
বড় হয়ে একদিন সে মাকে এই প্রশ্নটা করবে।
সজল দেখে, মা উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। বড়কাকা একটু ভ্রু কুঁচকে বসে বসে কী যেন ভাবছে। মুখটা গম্ভীর। তারপর বড়কাকা দাঁড়িয়ে চারদিকে চেয়ে দেখে। আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে বারবাড়ির দিকে।
সজল গাছের আড়াল ছেড়ে ক্ষেতের মধ্যে নেমে দৌড়োতে থাকে। ঘুরপথে গিয়ে মুখোমুখি হবে।
খুব তাড়াতাড়িই চলে সজল। বড়কাকা সদ্য ভাবন-ঘরের কাছ বরাবর পৌঁছেছে।
তাকে দেখে খুব ক্ষীণ একটু হাসল বড়কাকা।
সজল ভাল মানুষের মতো জিজ্ঞেস করে, কখন এলে?
অনেকক্ষণ। তুই কোথায় ছিলি?
এইখানেই।
দীপনাথ হাত বাড়িয়ে তার কাঁধটা ধরে। বলে, কত লম্বা হয়েছিস!
এই কাঁধে একটু হাত রাখা আর কত লম্বা হয়েছিস প্রশ্নটুকুর মধ্যে এক অথৈ সমুদ্রের গভীরতা। সজল এইটুকু এ বয়সে বুঝতে পারে, কোনটা স্নেহ, কোনটা স্নেহ নয়। দীপনাথের হাতের স্পর্শটুক আর গলার নরম কোমল লাবণ্য অনেকক্ষণ তার শরীর আর শ্রবণে কাজ করবে। সজল মুখ টিপে হেসে বলে, এখনও তোমার সমান হইনি।
দীপনাথ মুগ্ধ চোখে হাড়োব প্রাণবান চেহারার সজলকে দেখছিল। দেখে তার চোখ আর মন ভরে গেল। চোখে বুদ্ধির ঝিলিমিলি খেলা করছে, বেড়ে ওঠা শরীরে এখনও শিশুর লাবণ্য ও মুখশ্রীতে পৌরুষ সত্ত্বেও এক বিস্ময় নাখানো সরলতা দেখে ভারী খুশি হল। এই তাদের বংশধর, এখনও পর্যন্ত একমাত্র বংশধর। কাঁধে সস্নেহে হাতের ভর রেখে দীপনাথ বলে, আয় ওই বারান্দায় বসি।
ভাবন ঘরের বারান্দায় পাশাপাশি বসে দীপনাথ বলে, খুব ইচ্ছে ছিল কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে তোকে নিয়ে যাব। ভাল স্কুলে পড়াব। কিন্তু সে আর হল না।
কেন কাকা?
দীপনাথ একটা মস্ত শ্বাস ছেড়ে বলে, অনেক অসুবিধে রে। আমাকে মাঝে মাঝে লম্বা ট্যুরে যেতে হয়। রান্নাবান্নার লোক, কাজের লোকও বড় পাওয়া যায় না। তার চেয়ে ভাবছি তোকে নরেন্দ্রপুরে ভর্তি করে দিলে কেমন হয়।
সেখানে জিমনাসিয়াম আছে?
থাকারই কথা। তুই কি ব্যায়াম করতে ভালবাসিস?
সজল মুখ বিকৃত করে বলে, না। শরীর সাজাতে আমার ভাল লাগে না।
তবে?
আমি মার্শাল আর্টটা শিখতে চাই। আর বক্সিং।
সেসব ওখানে বোধহয় নেই। দেখব খোঁজ করে। ওসব শিখতে চাস কেন? সেলফ-ডিফেন্স, না গুন্ডামি করবি?
সজল হাসল, যারা অন্যায় করে আমি তাদের শিক্ষা দিতে চাই।
করুণ একটু হাসি ফোটে দীপনাথের মুখে। খুব ধীরে ধীরে সে বলে, সব অন্যায় কি শুধু গায়ের জোরে ঠেকানো যায়? আগে নিজে ন্যায়বান হতে হয়, সাহসী হতে হয়, মানুষকে ভালবাসতে হয়, মানুষ কোথা থেকে জোর পায় জানিস? ভালবাসা থেকে। মা-বাবাকে যদি ভালবাসিস, দিদিদের যদি ভালবাসিস, সবাইকে যদি ভালবাসিস তা হলে দেখবি গায়ের জোরের তত দরকার হয় না।
তোমার গায়ে কি খুব জোর বড়কাকা?
আমার গায়ে?–দীপনাথ প্রথমে অবাক হয়, পরে হাসে। বলে, দূর বোকা! আমি কি ব্যায়ামবীর, না বক্সার? আমার কোনও জোরই নেই। তবে তুই জোরওয়ালা মানুষ হলে আমাদের আর দুঃখ থাকবে না। তবে সেটা শুধু গায়ের জোর নয় কিন্তু।
গায়ের জোর কি খারাপ?
তা নয়। তবে বেশি গায়ের জোরের কথা মনে রাখলে মনটা শরীরমুখী হয়ে যায়। তখন আর মাথায় সুক্ষ্ম চিন্তা আসতে চায় না।
সজল মাথা নিচু করে চটির ডগা দিয়ে একটা কাকরকে মেঝেতে ঘষছিল। হঠাৎ বলল, তুমি আমাকে খারাপ ভাববো না তো বড়কাকা?
দীপনাথ অবাক হয়ে বলে, তোকে খারাপ ভাবব কেন?
কেউ যদি তোমার কাছে কিছু লাগায় তা হলে তো ভাববে!
তোর নামে আবার কী লাগাবে?
লাগাতে পারে।–বলে সজল একটু হাসল, কিন্তু তুমি বিশ্বাস কোরো না। বরং বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখো, আমি খারাপ কি না।
দীপনাথ সস্নেহে হাসে। বলে, তোকে কেউ খারাপ ভাবে না।
সজল একটু ভ্রু কুঁচকে কী ভাবে। তারপর বলে, আমি বোর্ডিং-এ যাব না।
কেন রে? বোর্ডিং-এ কত মজা জানিস?
জানি। আমার যেতে ইচ্ছেও করে। কিন্তু আমি চলে গেলে বাবাকে দেখবে কে?
