দীপনাথ ম্লান হেসে বলে, বাবাও যে সংসারের একজন এবং খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একজন সে কথা মনে না রাখাটা আমাদের পক্ষে গৌরবের নয় বউদি। ইন ফ্যাক্ট, আমিও ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি
তো পরের মেয়ে।
এইখানে চা খাবে, না ঘরে?
এই তো বেশ। দাও উঠোনে দাঁড়িয়ে খাই।
বৃন্দাকে মোড়া পেতে দিতে বলি। দাঁড়াও।
বৃন্দা মোড়া দিয়ে যায়। দীপনাথ আর তৃষা চায়ের কাপ নিয়ে মুখোমুখি বসে।
দীপু!
বলো।
তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন বলো তো আজ?
মন ভাল নেই বউদি।
কেন?
সব কি বলা যায়?
আমাকে যায়। আমি তোমার পুরনো বন্ধু।
দীপনাথ একটু হেসে বলে, তোমাদের সংসার-টংসার অনেক দেখলাম বউদি। কিছু ভাল লাগে, একদিন পাহাড়ে চলে যাব দেখো।
আবার পাহাড়? ওটা যে তোমার মাথায় একটা কী ঢুকেছে!
দীপনাথ চায়ে চুমুক দিতে দিতে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। সেটা লক্ষ করে তৃষা আজ খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে দীপু?
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সংসারে কারও সঙ্গেই খুব একটা মাখামাখি করতে নেই বউদি, তা হলে দুঃখ পেতে হয়। যত জড়াবে তত অশান্তি। এই অশান্তির ভয়েই কত লোক সাধুসন্ন্যাসী হয়ে পালিয়ে যায়।
তুমিও কি সাধু হওয়ার কথা ভাবছ?
প্রবল একটা শ্বাস ফেলে দীপনাথ মাথা নাড়ে, না বউদি, সাধু হওয়ার মতো পজিটিভ মেটেরিয়াল আমার ভিতরে নেই। তবে একটা কিছু করব। আর ভাল লাগছে না।
দীপু, জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হয়। ব্যাপারটা কি হৃদয়ঘটিত?
আরে দূর! তা নয়। অন্তত আমার হৃদয়ের ব্যাপার নয়।
তবে কার হৃদয়?
দীপনাথ মৃদু একটু হাসল, পেটের কথা বার করতে চাও?
মুখে হতাশার ভাব দেখিয়ে তৃষা বলে, আমার কি সে সাধ্যি আছে?
দীপনাথ হাসিমাখা মুখেই চেয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, বরং তোমার কথা বলল তোমাকে আগের মতো দেবী চৌধুরানি মার্কা লাগছে না কেন বলো তো? ব্রজেশ্বর কি তোমার ওপর ডাকাতি করেছে? হৃদয় ছিনতাই?
ভ্রু কুঁচকে তৃষা বলল, খুব রকবাজদের ভাষা শিখেছ তো! তোমাব ব্রজেশ্বরের বয়েই গেছে আমার হৃদয় নিয়ে টানাটানি করতে।
তা হলে সেই দেবী চৌধুরানির মুখ-চোখ হাবভাব এমন প্রফুল্লময়ীর মতো হয়ে গেল কেন?
চেহারায় লাবণ্য এসেছে বলছ?
লাবণ্য তোমার বরাবর ছিল। ইয়ারকি কোরো না। কী বলবে বলছিলে যে!
তৃষা সত্যিই হয়তো আর আগের মতো নেই। নইলে তার হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস আসবে কেন? খানিকক্ষণ সে মুখ নিচু করে বসে রইল। তারপর বলল, দীপু, সংসার আর আমাকেও টানে না। তোমার দাদাকে বলেছি, কাশীতে বাড়ি করে দু’জনে গিয়ে থাকব।
দু’জনে?–বলে হাঁ করে থাকে দীপনাথ। বলে, এক বাড়িতে দু’জনে থাকবে? তা হলে যে দু’দিন বাদে বাড়ি থেকে দুটো লাশ পাওয়া যাবে। দু’জনেই দু’জনকে খুন করে ফেলেছে।
আমরা দুজনে কি দু’জনের অতটাই শত্রু দীপু?
দীপনাথ হাসতে হাসতে দুলতে থাকে, তা একটু আছ তোমরা।
একটু যে আছি তা অস্বীকার করছি না তো! তা বলে খুন করার মতো?
আরে না, না! ঠাট্টা করলেও দেখছি বিপদ!
তোমার দাদাও ওরকম কথা বলে প্রায়ই। তার খাবারে নাকি বিষ মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্লো পয়জন।
শ্রীনাথ চাটুজ্জে একটু বায়ুগ্রস্ত, জানোই তো! রাগ করো কেন?
আজকাল রাগ হয় না। সজলও বাবার কথা বিশ্বাস করে।
সজল! সজল কি তার বাপের ভক্ত হয়েছে নাকি আজকাল?
ভীষণ! বাপের জন্য সব পারে। দরকার হলে পরশুরামের মতো মাকে মেরে ফেলতেও, শুধু বাপ যদি হুকুম করে।
আচ্ছা! বলে দীপনাথ খুব অবাক হয়ে ব্যাপারটা ভাবতে থাকে। যত ভাবে ততই অবিশ্বাস্য মনে হয়।
সজলের হাতেই একদিন আমি খুন হয়ে যাব, দেখো।
৬৯. দীপনাথ কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে
দীপনাথ কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে বলে, সজল তোমাকে মারবে! কী যে বলো তুমি বউদি! তোমার মাথাটাই গেছে।
তৃষা হাসে না। বিষণ্ণ আর্তি মাখানো মুখে দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, আমার অবস্থায় না পড়লে কেউ আমার সমস্যা বুঝবে না জানি। কিন্তু আমার ভরসা ছিল, আর কেউ না বুঝুক, তুমি বুঝবে।
একটু অসহিষ্ণু গলায় দীপনাথ বলে, সেই যে কারা রাতে তোমাকে বোমা মেরে গেছে, সেই থেকে তুমি সবাইকে সন্দেহ করতে শুরু করেছ। আমি বলি, তুমি আরও কিছুদিন সংসার থেকে ছুটি নাও, দূরে কোথাও গিয়ে বেড়িয়ে এসো। তোমার ভীষণ স্ট্রেন যাচ্ছে।
নিবু নিবু গলায় তৃষা বলে, যেখানেই যাই, কপাল আর কর্মফল তো সঙ্গেই যাবে।
দীপনাথ একটু হাসল, তোমার কপাল কি এতই খারাপ বউদি? বেশ তো আছ! জমজমাট তোমার সংসার। মেয়ের বিয়ে দিয়ে শাশুড়িও বনে গেছ।
তৃষা মৃদু স্বরে বলে, সংসারে কোথায় যে দাঁড়াব এখন সেই জায়গাটাই খুঁজে পাচ্ছি না যে। আজকাল কেন যে কেবলই মনে হয়, এসব আমার নয়, এরা আমার নয়, এখানে আমার কোনও জায়গা নেই। একদিন যদি মেরে না-ও ফেলে, তবুও ঘাড় ধরে বের করে দেবে। এরা কেউ কেন আমাকে দেখতে পারে না বলো তো? আমি কী করেছি?
কারা দেখতে পারে না?
তোমার মেজদা, স্বপ্না, মঞ্জু, সজল, কেউ না।
অভিমান নয়, তৃষার গলায় একটা সত্যিকারের আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে দীপনাথের কাছে। সে টক করে কিছু বলল না। একটু ভাবল। তারপর একটু লঘু স্বরে বলল, তোমার দাপট কি একটু কমে আসছে বউদি?
তৃষা মাথা নাড়ল। বলল, কমেনি দীপু। কমলে আজ এত ভাবনায় পড়তাম না। আসলে আজকাল আমাকে ওরা কেউ ততটা সমীহ করে না, ভয় পায় না। বিশেষ করে সজল। ওর সঙ্গে কথা বলতে আজকাল আমারই ভয়-ভয় করে। কী কথার কী জবাব দেবে তার ঠিক নেই।
