দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, আমার জীবনে তো তেমন কোনও কিছু ঘটেনি।
ও আপনাকে খুব পছন্দ করে।
বোস সাহেব?–বলে দীপনাথ একটু হেসে বলে, আগে হয়তো বা করতেন। এখন করেন না।
আপনি কি রিজাইন করতে চেয়েছিলেন?
চেয়েছিলাম। বোস সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে না পড়লে হয়তো এর মধ্যেই কাজ ছেড়ে দিতাম। কিন্তু উনি নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ায় আমাকেই সব সামলাতে হচ্ছে।
জানি। সব শুনেছি। এও শুনেছি, ওর অসুখ সম্পর্কে আপনিই ওকে অনেকদিন আগে ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন!
আমার মনে হয়, ওঁর এই অসুখটা অনেকদিন ধরে পাকাচ্ছিল।
মহুয়া মৃদু স্বরে বলল, এসব অসুখ অনেকদিন ধরেই তৈরি হয়। কিন্তু আমরা যারা ওকে ভালবাসি বলে ক্লেম করি তারা কেউই এটা লক্ষ করিনি। আপনি করেছেন।
দীপনাথ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। আমার ওয়ার্নিং উনি পাত্তা দেননি।
পাত্তা দেয়নি নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণার ফলে। ও মনে করে ও খুব ফিট, খুব এফিসিয়েন্ট।
আমি কিন্তু বোস সাহেবের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে চাইছি না।
মহুয়া এ কথাতেও রাগল না। বলল, আপনাকে বলতে হবে না। আপনি কী জানতে চান তা আমি জানি।
দীপনাথ চুপ করে ছিল। মহুয়া উদাসভাবে কিছুক্ষণ জলের দিকে চেয়ে থেকে বলে, ভুল করছি তাও জানি। কিন্তু তবু তো এরকম কিছু ঘটে যায়। যাকে ঠেকানো যায় না।
ভুল কথাটা খুব নরম। এ ক্ষেত্রে শব্দটা হওয়া উচিত অন্যায়। আপনি তাও কি জানেন?
জানি। কিন্তু আমার দিক থেকেও কিছু বলার আছে।
বলুন। আমি শুনতেই চাইছি।
কিছু করতে চাইছেন। ঠিক তো?
সম্ভব হলে।
মহুয়া মৃদু হেসে বলল, আমিও আপনাকে হেলপ করতে চাই। কিন্তু পারব কি না জানি না। আপনার কথাটা বলুন।
আমার কথা হল, ও খুব হেলপলেস। দীপা বউদি ওকে কম্প্যানিয়নশিপ দিতে পারেনি। ওর দিক থেকেও একইরকম। যদি ওরা পারত তবে আমি সরেই দাঁড়াতাম।
আপনি সরে দাঁড়ালে কি পারবে?
বোধহয় না। আমি সরেই ছিলাম। বুধোদার সঙ্গে বহুকাল আমার কোনও সম্পর্কই ছিল না। অতীতে যে সফটনেস ছিল সেটা আমি জোর করে মন থেকে সরিয়ে রাখতাম। খুব কাজ করতাম। তারপর একদিন, খুব রিসেন্টলি, বুধোদা আমার কাছে গিয়ে বলল, জীবনের আর মোটে ক’টা দিন আমার অবশিষ্ট আছে। এ ক’টা দিন আমাকে একটু শান্তি দাও। আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।
সঙ্গে সঙ্গেই কি আপনি প্রস্তাবটা মেনে নিলেন?
না। বুধোদার কাছে সব আগে শুনলাম। অনেক ভেবে, বিশ্লেষণ করে বুঝলাম, বুধোদা হয়তো ঠিক কথাই বলেছে। একটা কথা বলে রাখি, ও কিন্তু দীপাবউদির কোনও নিন্দে করেনি আমার কাছে। বউদি কেমন তা আমরাও জানি।
কেমন বলুন তো!
একটু হেডস্ট্রং। একটু বেপরোয়া। খুব অহংকারী। বুধোদার দরকার ছিল ধীর স্থির বিবেচক একটি মেয়ে।
দীপনাথ সামান্য উম্মার সঙ্গে বলে, কিন্তু বোস সাহেবই যে কিছুদিন আগে মিসেস বোসকে ডিভোর্স দিতে রাজি ছিলেন না।
মহুয়া শান্ত গলায় বলে, এখনও ঠিক রাজি নয়। ডিভোর্স মানেই পাবলিসিটি। ও তা পছন্দ করে। তাই চায়নি। আর তাতেই প্রমাণ হয়, বুধোদার দিক থেকে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।
দীপনাথ গুম হয়ে থেকে কিছুক্ষণ বাদে জিজ্ঞেস করে, আপনারা কোনও ফাইনাল ডিসিশন নিয়েছেন?
ওর অসুখ না হলে নিতাম। অসুখের জনাই এখনও নিইনি।
ডিসিশনটা কি পজিটিভই হবে?
মহুয়া হেসে ফেলে বলে, আমি সিরিয়াসলিই আপনাকে হেলপ করতে চাই। বিশ্বাস করুন।
কথাটার মধ্যে কোনও বিদ্রুপ বা প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ ছিল না। মহুয়া যে ভাল জাতের মেয়ে তাতে কোনও সন্দেহ করেনি দীপনাথ। সে শুকনো মুখে বলল, আপনি যদি চেষ্টা করেন তবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মহুয়া ম্লান হেসে বলে, আমি তো এ ব্যাপারে একটি পার্টি। আমার চেষ্টায় আন্তরিকতা থাকবে না। বরং আপনার মাথায় যদি কোনও সাজেশন আসে তবে আমাকে বলবেন।
আপনি যদি বিয়ে করেন?
মহুয়া এ কথায় চটে উঠল না। তবে একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ও প্রসঙ্গটা থাক। মানুষ তো পুতুল নয়।
দীপনাথ লজ্জিত হয়ে বলল, মাপ করবেন, আমার বুদ্ধিসুদ্ধি একটু গুলিয়ে যাচ্ছে।
মহুয়া উঠল। বলল, আজ আসি।
সেই থেকে দীপনাথ আনমনা, বিমর্ষ। একা একা মেসবাড়িতে ফেরার সময় তার মনের মধ্যে নানা আবেগ, রাগ, হতাশা খেলা করে গেল। কিছু করার নেই তার? কিছু করা যাবে না?
ঘুরতে ঘুরতে দীপনাথ বাবার ঘরে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা খোলা। বাবা অবশ্য এখানে নেই, সোমনাথের কাছে আছে। ফাঁকা ঘরটার দিকে শূন্য চোখে চেয়ে থাকে সে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে। ধীরে হেঁটে এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ায়।
বউদি।
তৃষা চা ছাকতে হুঁকতে ফিরে চেয়ে বলল, কিছু বলছ?
বলছি, হারটা বাবার নাম করে চিত্রাকে আশীর্বাদি দিয়ো।
তোমার নামে নয়?
না, বাবার নাম করেই দিয়ে। বাবা হয়তো তেমন কিছু দিতে পারবে না। চিত্রার শ্বশুরবাড়িতে এ নিয়ে কথা হতে পারে।
তৃষা মুখ টিপে একটু হাসল। বলল, সংসারী বুদ্ধি তো দিব্যি টনটনে, বিয়ে না করলে কী হবে!
দীপনাথ একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, বিয়ে তো আর তোমরা দিলে না!
বিয়ে দিতে কি ইচ্ছে করে বলো! এমন ভাল দেওরটিকে কোন টগবগে মেয়ে এসে দখল করে নেবে, দেওর আর ফিরেও চাইবে না আমাদের দিকে। এখনই চায় না, বিয়ে হলে তো আরও।
মনে থাকবে তো বউদি? বাবার নাম করে দিয়ো।
থাকবে গো, থাকবে। তোমার মতো বুদ্ধি বিবেচনা বাপু আমারও নেই। কথাটা আমার মাথাতেও খেলেনি।
