খাওয়াব গো, অত ভেবো না। কিন্তু তোমার কথাই যে আমি সারাক্ষণ ভাবি। আমার যে আর কেউ নেই!
দীপনাথ একটু ম্লান হয়ে বলে, সবাই মোরে করেন ডাকাডাকি, কখন শুনি পরকালের ডাক?
ছিঃ দীপু! পরকালের ডাক আমিই শুনছি। তুমি ছাড়া আর কেউ আমাকে সান্ত্বনা দিতে পারবে না।
দীপনাথ একটু অবাক হয়। বউদিকে এরকম চঞ্চল, বিভ্রান্ত সে কোনওকালে দেখেনি।
৬৮. তৃষা যখন তার জন্য চা করতে গেল
তৃষা যখন তার জন্য চা করতে গেল তখন দীপনাথ সারা বাড়ি ঘুরে দেখতে বেরিয়ে পড়ল।
তার মন ভাল নেই। এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। হাঁফ ধরে যায়। জীবন থেকে কী একটা হারিয়ে গেল হঠাৎ। মনের মধ্যে একটা আলো জ্বলত এতদিন। সেটা নিভিয়ে কে যেন একটা ঘুম-আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। একটা লাবণ্য ছিল, একটা উগ্র আগ্রহ ছিল দিন যাপনের, বেঁচে থাকার। সেসব আর মনেই হয় না। সকাল থেকে কেবল গড়িমসি ভাব। দিন গড়িয়ে গড়িয়ে কাটে।
বোস সাহেবকে নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হয়েছে। মাইল্ড স্ট্রোক। বিপদ তেমন কিছু নয়। তবু ডাক্তাররা সাবধান হচ্ছেন। ডাক্তার সেনগুপ্ত বলেছেন, মাইল্ড স্ট্রোকের পরের স্টেজেই মেজর স্ট্রোক হতে পারে।
মহুয়াকে আগে কখনও দেখেনি দীপনাথ। কাল নার্সিংহোমে দেখল। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি নয়। খুব সেজে এসেছিল বলেই কি না কে জানে, দারুণ সুন্দরী দেখাচ্ছিল। মহুয়া বোস সাহেবের কীরকম বোন তা জানে না দীপনাথ। রঞ্জন অতটা ভেঙে বলেনি। শুধু বলেছে, মহুয়াদির সঙ্গে অনেকদিনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ফ্যামিলির ব্যাপার বলে আমরা বাইরে এ নিয়ে আলোচনা করি না।
গভীরভাবে দীপনাথ জিজ্ঞেস করেছিল, মহুয়া কেমন মেয়ে?
খারাপ বলে কিছু শুনিনি কখনও। কিন্তু এ ব্যাপারটা ডেভেলপ করার পর সবই অন্যরকম হয়ে গেছে। মহুয়াদিকে কি আর ভাল বলা যায়!
দু’জনের মধ্যে কার ইনিশিয়েটিভ বেশি, জানো?
রঞ্জন মাথা নেড়েছে, যা ঘটবার তা ঘটেছে আমাদের অজ্ঞাতে।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, আমি এই ভেবে অবাক হচ্ছি, এতদিনের ব্যাপার, তবু আমি জানতে পারিনি কেন!
রঞ্জন হেসে ফেলে বলেছে, দীপুদা, এটা আপনার জানার কথাই নয়। মহুয়াদি আমার সেজো পিসির মেয়ে, ওদের বাড়িতে আমাদের ভীষণ যাতায়াত; তবু আমরাই ভাল করে জানি না। ভাসা ভাসা শুনেছি মাত্র।
মহুয়ার ঠিকানাটা আমাকে দেবে?
কেন? সেখানে যাবেন? গিয়ে লাভ নেই। মহুয়াদি ভীষণ রিজার্ভ মেয়ে। একটি কথাও বের করতে পারবেন না।
কাল নার্সিংহোমেও খুব রিজার্ভ দেখাচ্ছিল বটে মহুয়াকে। বেশি হাসে না, কথা বলে না। এম এসসি পাস করে পোকা-মাকড়ের ওপর শক্ত ধরনের রিসার্চ করছে বলে শুনেছে দীপনাথ। মুখে-চোখে পড়ুয়া ছাপটা আছে। বেশ লম্বা, ফর্সা, অভিজাত চেহারা। মুখখানা অসম্ভব মিষ্টি দেখতে। এই মেয়ে বোস সাহেবের প্রেমে কেন পড়বে তা বুঝতে পারছিল না দীপনাথ। রহস্যটা। ভাঙতেই হবে।
মণিদীপা নার্সিংহোমে আসে সকালের দিকে। বিকেলে কখনওই নয়। বোধহয় বিকেলে দীপনাথ যায় বলেই। কিন্তু বিকেলে বোস সাহেবের বাড়ির লোক, আত্মীয়কুটুমরা আসে, আসে মণিদীপার বাড়ি থেকেও কখনও কেউ। বেশ ভিড় হয়ে যায় ঘরের মধ্যে। কালও ছিল এরকম ভিড়ের দিন।
বোস সাহেবকে কয়েকটা কুশল প্রশ্ন করে এবং মহুয়াকে খুব ভাল করে দেখে করিডোরে এসে অপেক্ষা করছিল দীপনাথ। মহুয়ার জন্য।
পৃথিবীর সব সমস্যারই সমাধান সে করতে পারবে, এমন কথা সে নিজেও ভাবে না। কিন্তু দীপনাথের এ যাবৎকালের জীবন কেবল কতগুলি প্রয়াস এবং চেষ্টার সমষ্টি। চেষ্টা করতে দোষ কী?
সবাই চলে যাওয়ার পরও আধ ঘণ্টা বেশি থেকেছিল মহুয়া। যখন বেরিয়ে এল তখন খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল তাকে। চোখ নিচুর দিকে, বটুয়াটা বুকের কাছে চেপে ধরা।
সিঁড়ির কাছ বরাবর দীপনাথ তার সঙ্গ ধরে বলল, আপনিই কি মহুয়া? নমস্কার। আমার নাম দীপনাথ চ্যাটার্জি। আমি বোস সাহেবের
মহুয়া একটু থতমত খেয়ে অবাক হয়ে তাকায়। তারপর বলে, জানি। ওর কাছে শুনেছি।
কোনদিকে যাবেন?
মহুয়া একটু হাসল। বলল, আমাকে এগিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।
মরিয়া দীপনাথ বলে, কিন্তু আপনার সঙ্গে যে আমার একটু জরুরি দরকার!
মহুয়া বোধহয় দরকারটা জানে। বোস সাহেবের কাছেই শুনে থাকবে। সংক্ষেপে বলল, আসুন।
বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।
নার্সিংহোমের গায়েই মিন্টো পার্ক। মাঝখানে পরিষ্কার চৌকো জলাশয়। মহুয়া বিনা ভূমিকায় পার্কে ঢুকল এবং প্রায় একবারও দীপনাথের দিকে না তাকিয়ে বলল, এইখানে কথা বলা যায়।
হ্যাঁ।-বলে দীপনাথ বসবার জায়গা খুঁজছিল।
মহুয়া ঘাসের ওপর বসে বলল, বলুন।
দূরত্ব রেখে দীপনাথ বসে এবং কোনওরকম দ্বিধা সংকোচ এসে বাধা দেওয়ার আগেই বলে, আপনি ভুল করছেন।
মহুয়া ন্যাকামি করল না, বিস্ময়ের ভান করল না, কিংবা জানতেও চাইল না কোন কাজটার কথা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। একটু চুপ করে থেকে মৃদু স্বরে বলল, আপনি খুব উদ্যোগী পুরুষ শুনেছি।
দীপনাথের স্বভাবে একটা ঠাট্টা-রসিকতার পুরনো রোগ আছে। সে জিজ্ঞেস করল, অধ্যবসায় আর উদ্যোগ শব্দের অর্থ কি এক?
না। একটু আলাদা।
তা হলে আমি উদ্যোগী নই। তবে অধ্যবসায়ী।
মহুয়া এ কথাটা বাঁকাভাবে ধরল না। খুবই সিরিয়াস গলায় বলল, আমাকে আপনার কথা বলুন।
কেন বলুন তো! আমার কথা জেনে কী হবে?
আমি ধৈর্যশীল অধ্যবসায়ী লোকদের কথা পছন্দ করি।
