তৃষা। একটু একটু করে তার আয়ু কমে গেছে। বয়সের আগেই সে বুড়িয়ে গেছে কত।
গলা খাঁকারি দিয়ে শ্রীনাথ বলে, বিষের কথা মনে করিয়ে দিলে! আমার সর্বাঙ্গে বিষ। কী করে যে বেঁচে আছি!
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এইসব কথা বলেই না তুমি সজলকে বেয়াড়া তৈরি করেছ। ওরও সন্দেহ আমরা তোমার খাবারে বিষ দিই। বেশ কয়েকবার ও তোমার খাবার আর জলের নমুনা নিয়ে গিয়ে কেমিকেল টেস্ট করিয়েছে।
শ্রীনাথ উজ্জ্বল হয়ে বলে, কী পেয়েছে?
কী পাবে? বিষ তো তোমার মনে।
শ্রীনাথ চুপ করে থাকে।
তৃষা আস্তে করে বলে, সজলকে কেন আমার শক্ত করে তুললে বলো তো!
শ্রীনাথ করুণ হেসে বলে, আমি কাউকেই কিছু করার মধ্যে রাখি না। সজল যদি তোমার শত্রু হয়ে থাকে তবে তা হয়েছে তোমার জন্যেই!
তৃষা হঠাৎ আবার উদাস হয়ে বলল, তাই হবে। একটা দিকে বাধ দিতে গিয়ে আমার অন্যদিকটা ভেসে গেছে।
তৃষা অনেকক্ষণ এলোচুলে বসে থাকে। তারপর বলে, কাশীতে বাড়ি করার কথাটা তা হলে কোথায় দাঁড়াল?
বাড়ি করবে করো।
তুমি?
আমি কী? তোমার সঙ্গে এসে থাকব কি না?
সেই কথাই তো বারবার জিজ্ঞেস করছি।
হঠাৎ কেন যে আমাকে তোমার দরকার হচ্ছে সেইটেই বুঝতে পারছি না।
তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমার কোনও আশ্রয় নেই? কোনও অবলম্বন নেই?
শ্রীনাথ হেসে ফেলল, তুমি নিজেই কি বিশ্বাস করো? তুমি কত লোকের আশ্রয়দাত্রী, পালয়িত্রী। তোমার ডালে ডালে কত পাখি বাসা করে আছে, মৌমাছি চাক বেঁধেছে।
তৃষাও মৃদু হাসল। উঠে গরদের লালপেড়ে একটা শাড়ি পরতে পরতে বলল, চলো দু’জনে বিশ্বনাথের পুজো দিয়ে আসি।
পুজোয় আমার বিশ্বাস নেই। তুমি যাও।
আমারও নেই। কিন্তু কাশীতে এলে কেমন যেন ইচ্ছে হয়।
তৃষা বেরিয়ে যাচ্ছে। শ্রীনাথ সামনের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপিসাড়ে দেখল, লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরা বয়স্কা সুন্দরী মহিলা রিকশায় উঠছে। একটু ঘোমটা টানল। হাতে তোয়ালে দিয়ে ঢাকা একটা পিতলের রেকাব। দৃশ্যটা খুবই অভিনব। খুবই অদ্ভুত।
ছেলেমেয়েরা সরিতের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি দেখতে গেছে। বাড়িতে থাকলে ওদের ডেকে দৃশ্যটা দেখাত শ্রীনাথ, দ্যাখ, কর্মফল মানুষকে কত নরম-সরম করে তোলে। দ্যাখ, চেয়ে দ্যাখ।
ফাঁকা বড় বাড়িটায় শ্রীনাথ একা একা নিঃশব্দে অনেকক্ষণ হাসল। বৃন্দা আর মংলু রান্নার কাজে ব্যস্ত। ছাদে উঠে গেল শ্রীনাথ। মস্ত কেদো এক বাঁদর ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে ছিল রেলিং-এ। একবার তাকাল শ্রীনাথের দিকে, তবে গ্রাহ্য করল না। শ্রীনাথ বাঁদরটার হাত দশেক দূরে সঁড়িয়ে নীচের দৃশ্য দেখল অনেকক্ষণ। মনটা হালকা লাগছে। ফুরফুরে লাগছে।
রাতে পাঞ্জাব মেল ধরে কলকাতা হয়ে রতনপুর পৌঁছনো পর্যন্ত এমনই ফুরফুরে রইল মনটা।
সারাক্ষণ আড়াল-আবডাল থেকে আজকাল সজলকে লক্ষ করে তৃষা। এই বড়সড়, শক্তসমর্থ, বুদ্ধিমান, রাগী, তেজি আর সাহসী ছেলেটিকে বুঝবার চেষ্টা করে। এই একটি মানুষের কাছে এসে হোঁচট খেয়েছে তৃষা।
কবে সেই শিশু সজলের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল এই অচেনা পুরুষ তা বুঝতে পারেনি তৃষা। বুঝতে পারলে আগে থেকে সাবধান হত, লাগাম টেনে ধরত। কিন্তু এখন আর সময় নেই, বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। বুদ্ধিমতী তৃষা জানে, এখন রাশ ধরতে গেলে যে বিস্ফোরণ ঘটবে তা সামলানোর ক্ষমতা তার নেই। এই সংসারে নিশ্চিতভাবে তার আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এল।
সজল তার নিজস্ব কুংফু ক্লাব তৈরি করেছে। তার দলটি বিশাল। দাপট সাংঘাতিক। একদিন সজল এসে বলে, মা, স্কুলবাড়ির জমিটা পড়ে আছে, ওটা ক্লাবকে দেবে?
তৃষা কঠিন হওয়ার চেষ্টা করে বলে, ক্লাবের জন্য জমির কী দরকার?
আমরা ক্লাবের নিজস্ব বাড়ি করব।
না, ওসব হবে না। স্কুলবাড়ির একটা ঘরে এমনিতে ক্লাব খোলো, নিজস্ব জমি-টমির দরকার নেই।
সজল কাকুতি-মিনতি করল না। চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সামনে। ততক্ষণ তৃষা তার মুখের দিকে চাইতে সাহস পেল না।
নিজের সঙ্গে আজকাল এরকম লড়াই করছে তৃষা। অহর্নিশ। ভয় কাকে বলে সে এতকাল জানত না। এই পরিণত বয়সে সে নতুন ভয় পাওয়া শিখছে। তার এই অসময়ে এক দুপুরে এসে হাজির হল দীনাথ। মুখে চওড়া অপরাধী হাসি, হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট।
তোমার সঙ্গে কথা বলব না দীপু।
রাগ করেছ জানি। কিন্তু আমার অনেক কাজ ছিল।
ভাইঝির বিয়েটা কি কাজ নয়?
তোমারই তো দোষ। কেন এলাহাবাদে বিয়ে দিলে? এখানে দিলে আমরা সবাই থাকতে পারতাম।
উপায় ছিল না। চিত্রার মাসিই তো ওকে মানুষ করেছে। তার বড় ইচ্ছে, ওইখানেই বিয়ে হোক।
যাক হয়ে যে গেছে এই বেশ।
কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল, তুমি ওকে সম্প্রদান করো।
কে করল?
তোমার মেজদা। কিন্তু বাপকে নাকি সম্প্রদান করতে নেই।
ওসব কুসংস্কার ছাড়া তো। এখন দেখো এই শাড়িটা চিত্রাকে মানাবে কি না।
শাড়ি দেখে অবাক তৃষা বলে, এটার তো অনেক দাম! এ যে খাঁটি কাতান বেনারসি, পাটা জরির কাজ! এক কাড়ি দাম নিয়েছে নিশ্চয়ই।
আর এইটে।-বলে দীপনাথ তার ফোলিও ব্যাগ থেকে একটা গয়নার বাক্স বের করে। তাতে অন্তত আড়াই ভরির একটা মটরদানা হার।
কী পাকা যে হয়েছ দীপু!—তৃষা হাঁ করে চেয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ গয়নার বাক্স, শাড়ির প্যাকেট সব সরিয়ে রেখে আকুল গলায় বলে, শোনো দীপু, তোমার সঙ্গে আমার ভীষণ জরুরি দরকার।
ভাত-টাত খাওয়াবে তো! না কি আগেই প্যান্ডোরার বাক্স খুলে বসবে?
