বিয়ে যদি কলকাতায় দিতে তবে আসত। এলাহাবাদ কি সোজা দূর? দীপু কাজের মানুষ।
এমনকী বাবা পর্যন্ত আসতে রাজি হলেন না। ছোট ছেলের কাছে গিয়ে বসে রইলেন। এসব সবাই লক্ষ করে।
বুড়ো মানুষটাকে টেনে এনে খামোখা কষ্ট দেওয়া।
তৃষা চুপ করে চেয়ে রইল সামনের দিকে।
শ্রীনাথ নরম সুরে বলল, তুমি অকারণে ভাবছ। চিত্রার বিয়ে খুব ভাল হয়েছে। আমি বহুকাল এমন ধুমধামের বিয়ে দেখিনি।
ধুমধাম তো মেজদির জন্য। কম করেও বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা ও নিজেই খরচ করেছে। আমাদের গায়ে আঁচ লাগতে দেয়নি।
শ্রীনাথ একটু অবাক হয়ে বলে, তাই নাকি? আমি ভাবলাম—
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, চিত্রার জন্য আমাদের কোনও দায়ই পোয়াতে হল না। ও যে আমার মেয়ে তা টেরও পেলাম না।
শ্রীনাথ গম্ভীর হয়ে বলে, সে তত তোমার জন্যে। আমি ওকে এলাহাবাদে রাখা পছন্দ করিনি। তৃষা ছোট্ট একটা ধমক দেয়, এখন ওসব কথা থাক।
ফাল্গুনের মাঝামাঝি এসব জায়গায় এখনও বেশ শীত আছে। খোলা জানালা দিয়ে হু-হু করে হাওয়া আসছে। শ্রীনাথ জানালাটা অর্ধেক নামিয়ে দিয়ে র্যাপারে নাক ঢেকে ঢুলতে থাকে।
প্রেসের বুড়ো মালিক কাশীতে বহুকাল আগে বাড়ি করে রেখে গেছেন। মালিকের ছেলের কাছে চাইতেই চাবি দিয়ে দিলেন, সঙ্গে বাড়ির দারোয়ানকে লেখা চিঠি।
কাশীতে এসে তাই কোনও অসুবিধেই হল না তাদের। দিন দুই ভারী অদ্ভুত সুন্দর কেটে গেল। বিশ্বনাথ গলিতে ঢুকে শতেক গলির ধাঁধায় ঘুরে বেড়ানো, দশাশ্বমেধ ঘাট, বাজার, রাবড়ি, বেনারসির কারখানা, জর্দা, কাশীর বিখ্যাত বেগুন সব মিলিয়ে রতনপুরের বদ্ধ জীবন থেকে বিচিত্র এক মুক্তি। এ কদিন তাদের সম্পর্কের জটিলতাগুলো বোঝা গেল না, সবাই হাসিখুশি রইল।
বেনারস থেকে রিজার্ভেশন না পেয়ে সরিৎ মোগলসরাই থেকে রিজার্ভেশন করিয়ে আনল। ফিরতেই হবে। চিত্রা আর তার বর দ্বিরাগমনে রতনপুর যাবে। তার আগেই পৌঁছনো দরকার।
যাওয়ার দিন সকালে উঠে গঙ্গাস্নান করে এসে তৃষা হঠাৎ শ্রীনাথকে বলল, কাশীতে একটা বাড়ি করবে?
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, কাশীতে?
ভারী ভাল জায়গা। বহু বাঙালির বাস।
শ্রীনাথ বলে, তা করতে পারো, যদি ইচ্ছে হয়।
আমার খুব ইচ্ছে। এর আগেরবার এসেই জায়গাটা এত পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। এখন যদি তোমার মত থাকে।
আমার মত!–শ্রীনাথ একটু বিরক্ত হয়ে বলে, সংসারে আবার আমার অনুমতির কথা উঠছে কবে থেকে?
তৃষা এই চিমটি গায়ে মাখল না। তার চোখ-মুখ অন্যরকম। একটা অদ্ভুত উদাসীন আনন্দ তাকে বাস্তবতা থেকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছে যেন। সে শান্ত স্বরে বলল, তোমার অনুমতির কথা ওঠে, কারণ তোমাকেও এখানে এসে থাকতে হবে।
আমি থাকব? একা?
তৃষা মৃদু হেসে বলে, একা কেন? আমিও থাকব।
শ্রীনাথ হাঁ করে চেয়ে থেকে বলে, কাশীবাসী হতে চাও?
হলে দোষ কী? সংসারে তো তোমার আমার মিল হল না, যদি কাশীতে থেকে হয়।
মিল নিয়ে খুব মাথা ঘামাচ্ছ নাকি আজকাল?
তৃষা এলোচুলে গামছার ঝাপটা মেরে জল ঝরিয়ে কিছুক্ষণ জবাবটা এভাল। তারপর বলল, তুমি বোধহয় মিল চাও না!
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, আর মিল দিয়ে কী হবে? বয়স চলে গেছে, সময় চলে গেছে।
মিলের সঙ্গে বয়সের কী সম্পর্ক বললো তো! মিলটা কি কেবল কম বয়সের ব্যাপার?
তা নয়। বলছিলাম, মিল থাকলে জীবনটা এমন শয্যাকণ্টকী হয়ে উঠত না তৃষা। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আর মিল হওয়ার নয়। এখন মন পেকে গেছে, রুচি পেকে গেছে, অভ্যাস পেকে গেছে, এখন আর কেউ কারও জন্য নিজেকে বদলাতে পারব না। আর ছাড়কাট না করতে পারলে কি মি হয়?
আমার বিশ্বাস, এখানে এসে থাকলে আমরা দুজনেই বদলে যাব।
দরকার কী? রতনপুরে তোমার বিষয়-সম্পত্তি আছে, ছেলেপুলে আছে, সেসব ছেড়ে আসতেও পারবে না। খামোখা স্বপ্ন দেখা।
তোমার পিছুটান নেই?
না। আমি বহুকাল আগে থেকেই আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
তোমার যদি পিছুটান না থাকে তবে আমারও নেই।
নেই? হাসালে।
তৃষা শ্রীনাথের পাশে বসে ক্লান্ত স্বরে বলে, আমি সংসারে সবকিছু ঘেঁটে দেখেছি। আমি জানি ও থেকে আমার কিছু পাওয়ার নেই। একজনেরও মন পাইনি, কেউ আমার জন্য একটু দুঃখ করে না, আমাকে নিয়ে ভাবে না।
ছেলেমেয়েদের কথা বলছ?
তোমার কথাও।
শ্রীনাথ হাসিমুখে বলে, কারও ভালবাসাটাসা তো তুমি কোনওকালে চাওনি। টাকা চেয়েছ। ক্ষমতা চেয়েছ। প্রভুত্ব চেয়েছ। সব পেয়ে গেছ।
প্রভুত্ব! তাই বা পেলাম কোথায়? আমার পেটের ছেলে আমাকে মানে না, জানো?
শ্রীনাথ তৃষার দুর্দশার কথায় খুশি হচ্ছিল। হচ্ছে, হচ্ছে। কর্মের ফল ফলছে আস্তে আস্তে। সে বলল, সজল তোমাকে মানে না বুঝি? ঠিক আছে আমি শাসন করে দেব।
তৃষা করুণ করে একটু হাসে, ভারী আশ্চর্যের ব্যাপার, দুনিয়ায় সজল একমাত্র তোমাকেই মানে। কিন্তু তোমার ওকে শাসন করার দরকার নেই। শাসনে ওর ভিতরটা তো বদলাবে না।
ও কি তোমাকে ভয় পায় না?
ভয় পেতে বলিও না। কিন্তু আমাকে ঘেন্না করার মতো খারাপ কি আমি? ওকে কোনওদিন জিজ্ঞেস কোরো তো, কেন ও আমাকে ঘেন্না করে!
সজল তোমাকে ঘেন্না করে না। ভয় পায়।
ভয় কবে কেটে গেছে! তুমি জানো না। শুধু আমি জানি। হয়তো তুমিই আস্তে আস্তে ওর মধ্যে এই বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছ।
বিষ! শ্রীনাথের বুকে আচমকা খামচা দিয়ে ধরল এক ভয়। তাই তো! বিষের কথা সে ভুলে গিয়েছিল। প্রতিদিন তার খাবারে, তার জলে, তার শ্বাসবায়ুতে অল্প অল্প করে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে
