বিলু ধমক দিয়ে বলে, আমার খিদে নেই, নিড নেই। আমি অন্য কোনও কারণে টায়ার্ড। আমার কাছে সবটাই ভীষণ মিনিংলেস হয়ে যাচ্ছে।
কোনটা?
সবকিছু। চাকরি, সংসার, ইভন বেঁচে থাকা।
দেন ফল ইন লাভ উইথ মি।
লাভ কী? তুমি তো কদিন বাদেই টোপর মাথায় দিয়ে ছাঁদনাতলায় গিয়ে বসবে।
নাও হতে পারে সেটা। আমি অনেক ভেবে দেখলাম ইট বেটার বি ইউ।
এ কথা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে বিলু। তারপর আচ্ছন্ন এক মুখ তুলে বলে, শুনে একটুও আনন্দ হল না, কেঁপে উঠলাম না, নতুন কিছু মনে হল না তো অরুণ!
তুমি ভীষণ ফ্রিজিড হয়ে যাচ্ছ। রাউজ, রাউজ ইয়োরসেলফ।
আমি ভীষণ টায়ার্ড। কিন্তু সেটা শরীরের ক্লান্তি নয়। মনটাই কেমন ব্ল্যাংক।
চলো, আজ তোমাকে আমার অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যাব।
তোমার বদমাইশির অ্যাপার্টমেন্টে আমি আর যেতে রাজি নই।
মোটেই বদমাইশি নয়। বিয়ে করে ঘর বাঁধব বলে এক কাড়ি টাকায় কেনা ফ্ল্যাট। ইয়ারকি কোরো না! চলো।
প্রতিরোধ্য অরুণকে ঠকাবে কী করে বিলু? তাছাড়া এই যে ক্লান্তি, এই যে ফাঁকা মন এর জন্যও একটা ঝকানি দরকার। হয়তো অরুণ ঠিকই বলছে। কে জানে!
ইচ্ছে-অনিচ্ছের মাঝামাঝি দোল খায় বিলু। আর সেই দ্বিধার রন্ধ্রপথে অরুণ তার পথ করে নেয়। সেই সাজানো সুন্দর ঈর্ষণীয় তিন ঘরের ফাঁকা পড়ে থাকা ফ্ল্যাটে নিজেকে বিসর্জন দেয় বিলু।
কিন্তু যখন একটু রাতে ভবানীপুরের বাসায় তাকে পৌঁছে দেয় অরুণ, তখন গলিপথটুকু একা হেঁটে আসতে আসতে সে টের পায়, ভূতের মতো তার ঘাড়ে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে সেই ক্লান্তি, সেই অবসাদ।
বহুদিন প্রীতমকে চিঠি লেখেনি সরাসরি। বাড়ির অন্য লোককে লিখেছে। আজ কী ভেবে রাতে বিলু একটা ইনল্যান্ডে প্রীতমকে লিখল, ভাবছি কিছুদিন ছুটি নিয়ে তোমার কাছে যাব। এখানে ভাল লাগছে না। তুমি কেমন আছ?…
৬৭. চিত্রার বিয়ে কেমন হল
চিত্রার বিয়ে কেমন হল, জামাই পছন্দ হল কি না তা তো বললে না একবারও।-এলাহাবাদ থেকে বেনারসের ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর এ কথা জিজ্ঞেস করল তৃষা।
শ্রীনাথ জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে ছিল। একটু আনমনা। জীবনে সে কলকাতা ছেড়ে এতদূর আসেনি। অথচ আসার পর নতুন রকমের কিছুও বোধ হচ্ছে না। গোটা দেশটা, গোটা পৃথিবীটাই বোধহয় মোটামুটি একঘেয়ে রকমের। তবু নতুন কিছু বোধ করার খুব চেষ্টা করছিল সে। তৃষার প্রশ্ন শুনে মুখ ঘুরিয়ে বলল, জামাইয়ের মুখে পক্সের দাগ আছে, না?
একটু আছে। খুব বেশি নয়। তেমন চোখে পড়ে না।
কিসের ব্যাবসা ওদের?
কতবার তো বললাম, আবগারি।
আবগারি মানে গাঁজা আফিং এসব নাকি?
হ্যাঁ। তবে চার পুরুষের ব্যাবসা। অনেক টাকা। কত বনেদি নিজের চোখেই তো দেখলে।
হ্যাঁ, অনেক টাকা। টাকা না হলে তোমার মন সহজে ভেজাতে পারত না।
টাকা জিনিসটা কি খুব ফ্যালনা? ছেলের বিদ্যেও তো কম নেই!
শ্রীনাথ মাথা নাড়ল, ভাল। আমাদের আন্দাজে খুবই ভাল পাত্র!
তোমার মেয়ের পছন্দ। কনভেন্টে পড়া, স্টাইলিস্ট মেয়ে যখন পছন্দ করেছে তখন বুঝতে হবে পাত্র ফ্যালনা নয়।
ফেলছে কে?
তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে খুশি হওনি। চিত্রা চলে যাওয়ার সময় একটু কাঁদলেও না।
কান্না না এলে কী করব?— বিরক্ত শ্রীনাথ বলে, আমার সহজে কান্না-টান্না পায় না।
চিত্রা দুঃখ পেয়েছে। ওকে তুমি ছোটবেলায় কী ভালটাই বাসতে!
শ্রীনাথ কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকে। তারপর বলে, দুঃখ পাওয়ার কিছু তো নেই। মাসির কাছে ছিল, শ্বশুরবাড়ি গেছে। আমার কাছে তো ছিল না, আমার কাছ থেকে চলেও যায়নি।
ওটা কোনও যুক্তি নয়। দূরে ছিল, তাতে কী? তবু তো তোমার মেয়েই ছিল। এখন গোত্র ছেড়ে অন্য বাড়ির মানুষ হয়ে গেল। মেয়েদের কাছে যে এটা কত বড় ঘটনা!
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, কী জানি! আমি তেমন দুঃখ-টুঃখ পাচ্ছি না। তবে ওর কথা যেমন মনে হত তেমনি মনে হবে। এলাহাবাদেই ছিল, সেখানেই রইল। দুঃখের যে কী আছে!
ওর বরের সঙ্গে তুমি একটাও কথা বলেনি।
বলিনি!—শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, না, মনে হচ্ছে বলেছি।
কী বলেছ?
ঠিক মনে নেই। তবে বিয়ের পরদিন সকালে ও একটা তোয়ালে খুঁজছিল বাথরুমে যাওয়ার জন্য! আমি একটা তোয়ালে বিছানা থেকে তুলে এনে দিয়েছিলাম। আর সেই সঙ্গে নীচতলার বাথরুমটাও দেখিয়ে দিয়েছিলাম, মনে আছে।
শুধু এইটুকু?
শ্রীনাথ লজ্জিত হয়ে বলে, দরকার না হলে গায়ে পড়ে কথা বলার কী আছে?
শত হলেও সে তোমার জামাই। ছেলের মতো।
জামাই কথাটা হঠাৎ খুব অদ্ভুত লাগল শ্রীনাথের কাছে। তার জামাই, ভারী নতুন কথা। একদা নিজের বিয়ের পর সে যখন জামাই হয়েছিল তখনও তার ভারী নতুন রকমের লাগত কথাটা।
ফার্স্ট ক্লাস কামরায় এতক্ষণ কোনও ভিড় ছিল না। কিন্তু ক্রমে একটি-দুটি স্টেশনে লোক উঠতে লাগল। লোকগুলোকে দেখেই মনে হয় বিনা টিকিটের যাত্রী।
লোক ওঠায় কথাবার্তা কমে গেল। উলটোদিকের সিটে জানালার পাশে বসা নিয়ে মঞ্জু, স্বপ্না আর সজল অনেকক্ষণ মৃদু স্বরে ঝগড়া করছে। অবশ্য সজলই জানালার ধার দখল করেছে শেষ। পর্যন্ত। এপাশে জানালা ধারে শ্রীনাথ, পাশে তৃষা। সরিৎ, বৃন্দা, মংলু আর নিতাই অন্য কামরায় আছে।
শ্রীনাথ বাইরের দিকে চেয়ে ছিল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে বলল, আমার মতামত বড় কথা নয়। আমি জানি, চিত্রার ভাল বিয়েই হয়েছে। এসব ব্যাপারে তোমার সহজে ভুল হবে না।
তৃষা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ একটু জ্বালাধরা গলায় বলল, চিত্রার বিয়েতে তোমার বাড়ির কেউ এল না। অন্তত দীপু আসবে বলে আশা করেছিলাম। কত করে চিঠি দিলাম, সরিৎ গিয়ে দু’দিন মেসবাড়ি থেকে ফিরে এল দেখা না পেয়ে। সে এলে সম্প্রদানটা তাকে দিয়েই করানোর ইচ্ছে ছিল।
