এ সবই সজল জানে। নিতাই একদিন তাকে খুব গুমোর করে বলেছিল, তোমার যদি কাউকে বাণ মারার থাকে তো আমায় বোলো। মেরে দেব।
সজল সঙ্গে সঙ্গে আলটপকা বলে ফেলেছিল, আছে। মারবে?
বলো। ঠিক মেরে দেব। লোকটা কে?
লোভী মুখে সজল বলেছিল, বাবা।
শুনে নিতাই খুব গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ছিঃ ছিঃ। দাঁড়াও, বাবাকে বলে দেব।
তখন খুব নিতাইয়ের হাতে-পায়ে ধরেছিল সজল।
এখন নিতাইয়ের ঝোপড়ায় সে একা পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে ছুরি ক’টা হাতে তুলে নেয় এবং মন দিয়ে ছকটা দেখতে থাকে। মংলু, লক্ষ্মণ, বামুনদি, বৃন্দা সকলেরই বিশ্বাস খ্যাপা নিতাই মারণ উচাটন বশীকরণ জানে। আবার মদনকাকা বলে, ওটা একটা ফ্রড। পাঠশালা নিয়ে গণ্ডগোলের সময় খ্যাপা নিতাইয়ের কুকুর ইস্পাত একটা ছেলেকে কামড়ে দিয়েছিল। কোথায় তার জন্য ক্ষমা চাইবে, বরং উলটে সেই ছেলেটার ওপর গিয়ে তম্বি করে এল। ফলে শুভঙ্করদা খুব মেরেছিল নিতাইকে। তারপর সেই রাতেই খ্যাপা নিতাই শুভঙ্করদাকে বশীকরণ বাণ মারে। বাণের গুণ কিছু আছেই। নইলে তারপর থেকেই শুভঙ্করদা ওরকম অন্য মানুষ হয়ে গেল কেন?
বাণ মারা না জানলেও সজল আপনমনে ছুরিগুলো ছকটার মধ্যে সজোরে ছুড়ে ছুড়ে গাঁথতে লাগল। আপনমনে বলতে লাগল, মর, মর, এ বাড়ির সবাই মরে যা।
দূর থেকে খুব চেঁচিয়ে ভীষণ রাগের গলায় বাবা ডাকছে, সজল! এই সজল!
সজল নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। এ ডাককে অগ্রাহ্য করতে খুব একটা সাহস পায় না সে। ইচ্ছে করছিল দৌড়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু এখন এই দুর্বল বুকে অতটা দম নেই।
সে একটা ছুরি প্যান্টের পকেটে নিয়ে উঠে পড়ে।
বেরিয়ে দুর থেকেই দেখতে পায়, বাবা ভাবন-ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। গালে দাড়ি কামানোর সাবানের ফেনা, হাতে ভোলা জার্মান ক্ষুর। দৃশ্যটা দেখেই সে বুঝতে পারে, কেন তাকে এই তলব।
জড়ানো পায়ে ধীরে ধীরে কাছে যেতেই শ্রীনাথ গলা ফাটিয়ে বলে ওঠে, কে আমার ঘরে ঢুকেছিল?
সজল জবাব দিতে পারে না। বুক ধুকপুক করছে।
কে আমার ক্ষুরে হাত দিয়েছিল?
সজল চুপ করে থাকে। মিথ্যে কথা বলতে পারে বটে, কিন্তু ওই বিকট রাগের মুখে সেটুকুও সাহস হয় না।
বলো, কে হাত দিয়েছিল?
আমি জানি না।—কোনওরকমে বলল সজল।
জানো না! জানো না!বলতে বলতে শ্রীনাথ বারান্দা থেকে দু’ ধাপ সিঁড়ি নেমে এসে প্রকাণ্ড একটা চড় আকাশ সমান তুলল।
উঠোনের দিক থেকে মা আসছে, টের পাচ্ছিল সজল। চড়টা পড়ার আগেই তৃষা একটু তফাত থেকে চেঁচিয়ে বলল, খবরদার! রোগা ছেলেটাকে মারবে না।
চড়টা পড়ল না। কেমন একটু নিভে গেল শ্রীনাথ। কোনও জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে ফিরে গেল ঘরে। তৃষা কলাঝোপ পর্যন্ত এসেছিল। তারপর আর এগিয়ে এল না।
সজল মার খেল না। বুঝতে পারল, মা-বাবার মধ্যে আবার একটা ঘোরালো ঝড় পাকিয়ে উঠছে বোধহয়। যদি কিছু হয় তবে সজল বাবাকে ছাড়বে না। যতই ভয় পাক সে, একদিন কিন্তু ঠিক প্রতিশোধ নিয়ে নেবে।
বাবা ঘরে গেল। মাও ফিরে গেল উঠোনে। একা সজল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শরীরে ভয়ের কাঁপুনি টের পেতে লাগল।
ভাবন-ঘর সম্পর্কে তার অগাধ কৌতূহল। ঘরে বই আছে, পুরনো দেরাজে আছে অনেক টুকিটাকি জিনিস, আছে ভাঙা দুরবিন, একটা বহু পুরনো ইঞ্জিনিয়ারিং টুল বক্স, আছে জমি-জরিপের যন্ত্রপাতি, মাপজোখ করার জন্য গোল চামড়ার খাপে ইস্পাতের লম্বা ফিতে, লোহা কাটার করাত, বৈদ্যুতিক তুরপুন, আরও কত কী। বেশিরভাগই জেঠুর জিনিস, এখন আর কেউ ব্যবহার করে না।
শ্রীনাথের শাসনের ভয় সত্ত্বেও মাঝে মাঝে সে চুরি করে ঢোকে সেই ঘরে। জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে। করাত দিয়ে লোহা কাটে, ডেসকের পায়া কাটে। জরিপের যন্ত্রপাতি বের করে বাগানটা মাপবার চেষ্টা করে। কাল সন্ধের কিছু আগে সে ঘরে ঢুকে বাবার ক্ষুর দিয়ে হাতের নরম লোম চেঁচেছিল। তারপর ধার পরীক্ষা করতে কয়েকটা ফুল গাছের ডাল কেটে দেখেছিল। গাছের কষে ক্ষুরটায় ছোপ ধরতেই সে ধার দেওয়ার চামড়ার টুকরোয় অনেকক্ষণ ঘষেছিল বটে, কিন্তু দাগ ওঠেনি।
এ বাড়ির মধ্যে ভাবন-ঘরটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। পুরনো জিনিস তো আছেই। তা ছাড়া চারদিকে নিবিড় সবুজ গাছপালার ঘেরাটোপের মধ্যে নিঃঝুম ঠান্ডা ঘরখানি। ভারী খোলামেলা। সারাদিন পাখির ডাক ঝরে পড়ে, সারাদিন নিবিড় হাওয়া খেলা করে, খুব স্পষ্ট শোনা যায় ট্রেনের আওয়াজ।
একদিন সে এই ঘরখানা দখল করে থাকবে।
মনে মনে সে জানে, বাবা এই সংসারে বেশিদিন থাকতে পারবে না। এসব জিনিসপত্র, বাড়িঘর সব মায়ের। বাবা বসে বসে খায়। বাবাকে দু চোখে দেখতে পারে না মা। আর মা যা চায় তাই হয়। মা বাবাকে ইচ্ছে করলেই বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে। দেবেও একদিন। মাকে সে বাবার অনেক খবর দেয়, যাতে মা চটে যায় লোকটার ওপর। অনেক কথা সে বানিয়েও বলে। মা সব কথা বিশ্বাস করে না, কখনও চুকলির জন্য বকে, কিন্তু তবু বাবার ওপর মা চটেও যায় ঠিকই।
সজল এসে পুকুরের ধারে দাঁড়ায়। কালো গভীর জলের দিকে চেয়ে থাকে। হাঁসগুলো উঠে গেছে। জল এখন নিথর। ভারী ভাল লাগে এই পুকুরের ধারটা। চারদিকে ঝোপঝাড়ে একটা বুনো গন্ধ উঠছে রোদের তাপে। এই পুকুরটার ধারে এসে দাঁড়ালে তার মনে হয়, কেউ তাকে ডাকছে, টানছে। নইলে আর কারও টান সে কখনও টের পায় না।
বাবা মা দিদিরা কাউকেই তেমন গভীরভাবে ভালবাসে না সে। মাকে একটু। আর কাউকে একবিন্দুও নয়। সবচেয়ে দুর আর পর হল বাবা।
