রাত্রিবেলা শতম তার মাথায় জপ করতে এলে প্রীতম গম্ভীর মুখে বলে, তোর নামজপে কাজ হচ্ছে। আমি অন্যরকম ফিল করছি।
শান্ত হাসিমুখে শতম বলে, জপাৎ সিদ্ধিৰ্জপাৎ সিদ্ধিৰ্জপাৎ সিদ্ধি ন সংশয়ঃ।
মানছি।
তবে এই নাম নিজেই নাও না কেন?
এক জায়গায় মাথা মুড়োতেই হবে?
শতম গম্ভীর হয়ে বলে, এই যে তুমি এত অ্যাকাউন্টেন্সি শিখেছ, এই তুমিও তো একদিন এক দুই লিখতে জানতে না, অ আ ক খ জানতে না। কেউ হাত ধরে দাগা বুলিয়ে বুলিয়ে শিখিয়েছিল। তাই না? তখন তো সংশয় ছিল না। এখন জীবনের হিজিবিজি অনেক হিসেবনিকেশ জট পাকিয়েছে, কেউ যদি জট খুলতে শেখায় তবে আপত্তি কী?
প্রীতম চুপ করে চোখ বুজে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে আপন মনে বলে, জপাৎ সিদ্ধিৰ্জপাৎ সিদ্ধিৰ্জপাৎ সিদ্ধি ন সংশয়ঃ। শতম, ন সংশয়ঃ।
আনন্দের রেশটা রইল পরদিন সকালেও। ঘুম ভেঙে চারিদিকে আবছা ভোরের নরম আলোয় এক স্নিগ্ধ জগৎ দেখতে পায় সে। শরীরে জীবাণুদের কোলাহল নেই, একাকিত্বের বোধ নেই, মৃত্যুর বাঘ কোথাও ডাকেনি।
মরম! মরম! ওঠ, ওঠ।
ডাকছ দাদা?–বলে মরম উঠে পড়ে।
চল বাইরে। দেখ, কী সুন্দর ভোর! দরজা খুলে দে শিগগির।
খুলছি।–বলে মরম উঠে দরজা খোলে। প্রীতমের চেয়ারটা টেনে বের করে বারান্দায়।
বোসা দাদা।
প্রীতম বসে বলে, তুইও বোস। দেখ, চারদিকে চেয়ে দেখ।
মরম বারান্দার সিঁড়িতে বসে হাই তোলে। কথা বলে না। কিন্তু ঝুম হয়ে বসে সেও চেয়ে থাকে আকাশের দিকে।
প্রীতম মুগ্ধ সম্মোহিত চোখে চেয়ে থাকে। ভিতরে এক আনন্দের উৎস মুখ খুলে নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ হতে থাকে। কোথা থেকে আসে এত আনন্দ?
ভবানীপুরের বাসা, লাবু, বিলু, অরুণ, ভিতরের সেই বিছানা সব ছায়াছবির মতো চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যায়। কিন্তু কিছুই স্পর্শ করে না তাকে।
মরম, একটা রিকশা ডেকে আন! আমি একটু বেড়াতে যাব।
বেড়াতে যাবে? পারবে?
পারব। যা।
আমি সঙ্গে যাব কিন্তু।
যাবি।
মা যদি বকে?
বকবে না। দেরি করিস না, যা।
মরম যায় এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই রিকশা নিয়ে আসে।
বারান্দা থেকে প্রীতমকে ধরে ধরে নিয়ে রিকশায় তুলবে বলে হাত বাড়িয়েছিল মরম। প্রীতম হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে, পারব। আজ পারব।
শুধু রিকশায় উঠবার সময় একটু ভর দিতে হল। কিন্তু স্বচ্ছন্দেই উঠে বসতে পারল প্রীতম।
আমি বরং সাইকেলটা নিয়ে আসি দাদা। রিকশায় দু’জন উঠলে তোমার কষ্ট হবে। মরম বলে।
যা, নিয়ে আয়।— অন্যমনে বলে প্রীতম। জাগতিক কথাবার্তা তার ভাল লাগছে না। তার চেয়ে অনেক জরুরি হল বেরিয়ে পড়া। কী যে একটা কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে জগৎ জুড়ে! তার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
শিলিগুড়ির অতি পরিচিত হাকিমপাড়া ছাড়িয়ে তিলক ময়দান, রোড স্টেশন, সেবকের মোড় হয়ে মহানন্দার পাড়। পিছন থেকে মরম চেঁচিয়ে বলে, আরও যাবে বড়দা?
হ্যাঁ। আরও একটু।
হিলকার্ট রোড ধরে জনবিরল পিচ রাস্তা বেয়ে বহু দূর চলে আসে রিকশা। কুসুম-রঙা রোদ উঠল পুবে। প্রীতম শুধু দৃশ্যাবলী দেখছে না। এই পৃথিবীর গভীরতায় আজ পরতে পরতে ড়ুবে যাচ্ছে সে। মিশে যাচ্ছে এই রোদ, হাওয়া, গাছপালা ও শূন্যের মধ্যে।
যখন প্রীতম ফিরে এল তখন বাইরের বাবান্দায় উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মা, বাবা আর ছবি। রূপম স্কুটারে বেরিয়েছে খবর করতে। বাইরের রাস্তায় খালি গায়ে দাড়িওয়ালা শতম বুকে হাত দিয়ে বিশাল চেহারা সটান সোজা দাঁড়িয়ে আছে।
মরম সাইকেল থেকে নামতে নামতে সভয়ে বলে, আমার দোষ নেই, বড়দা নিজেই গেল। আমি শুধু সঙ্গে–
মা ধমক দিয়ে বলে, তা আমাকে বলে যাবি তো! রোগা ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়েছিস। চিন্তায় আমার মধ্যে আর আমি নেই।
শতম শুধু প্রীতমের দিকে চেয়ে শান্ত মুখে একটু হাসল।
শরীর ভরে এমন দুর্বহ ক্লান্তি আগে ছিল না বিলুর। আজকাল সন্ধেবেলা যখন ফেরে তখন দম ফুরিয়ে যায় যেন। অনেকক্ষণ শুয়ে বসে বিশ্রাম না নিয়ে কোনও কাজে হাত দিতে পারে না।
প্রীতম যাওয়ার পর ফ্ল্যাটটাকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছে বিলু। প্রীতম যে ঘরে থাকত সেটা এখন লাবুর ঘর। বড় চৌকিতে লাবু আর অচলা শোয়। আলাদা ঘরে বিলু একা। রাত্রিবেলা তার একটানা নির্বিঘ্ন ঘুম দরকার বলেই এই ব্যবস্থা। লাবু বড় হাত-পা ছড়িয়ে শোয়, ছটফট করে ঘুমের মধ্যে, দাঁত কিড়মিড় তো আছেই, ওকে নিয়ে শুলে বিলুর ঘুমের অসুবিধে হয়।
বিদেশ থেকে ঘুরে এসে অরুণ তাকে একদিন বলেছে, বিলু। ইউ নিড সেক্স।
বোকা-বোকা কথা বোলো না।
মুশকিল হল, তুমি নিজেই জানো না যে, ইউ নিড সেক্স।
না অরুণ, ওসব নয়। আমি এমনিতেই টায়ার্ড। আমার দরকার অনেক ঘুম।
তোমার ম্যালনিউট্রিশনও হচ্ছে। ডাক্তার দেখাবে?
দূর! কথায় কথায় কেউ ডাক্তার দেখায়? আমার অসুখ কোথায়?
তোমার অসুখ হয়েছে, জানতি পারতিছ না।
ইয়ারকি কোরো না।
তুমি রোজ কী খাও বলো তো?
সবাই যা খায়।
এনাফ অফ প্রোটিন ভিটামিন?
অত জানি না। মাছ মাংস ডিম মাখন তো কম গিলছি না বাপু। প্রোটিন-ট্রোটিন কতটা কী যাচ্ছে ভিতরে কে জানে!
হজম হয়?
আমার কোনওকালে হজমের প্রবলেম নেই।
তা হলে কেন টায়ার্ড ও ফিলিং লোনলি?
কী করে বলব কেন টায়ার্ড। আর লোনলি ফিল করার মতো সময় পাই কোথায়?
ডাক্তার দেখাও। তবে আমার মতে ইউ নিড সেক্স, ব্রুটাল সেক্স।
তুমি এবার বাইরে গিয়ে অত্যন্ত অসভ্য হয়ে এসেছ।
সত্যি কথা বলব বিলু? তোমাদের পেটে খিদে আর মুখে লাজ আমার একদম পছন্দ নয়। সেইজন্য আমার বিদেশ বেশি ভাল লাগে, সেখানে প্রিটেনশন নেই। দে নিড ইট, দে ড়ু ইট।
