ভাল মানুষরা কি মরে না রে ধীরাজ?
ধীরাজের সরলতা যেমন, তেমনি তার বিশ্বাসের জোর। বলে, মরবে না কেন? মরে। কষ্টও পায়। তবে আমরা বাইরে থেকে একটা লোককে দেখে কতটুকু বুঝি বল? এই জনাটা তো আর একটা মাত্র জন্ম নয়, অনেক জন্মের একটা যোগফল। কত জন্মে কত কী টেরাকো কাজ হয়েছে, এ জন্মে তার এফেক্ট পাচ্ছে মানুষ। আমরা যতটুকু দেখি তার এপারে ওধারে অনেক অজানা জিনিস রয়ে গেছে। জন্মের আগেও জীবন, মৃত্যুর পরেও জীবন। আমরা সংসারী মানুষ, স্বার্থপর ছোট মানুষ সব, আমাদের কাছে দুটো দরজাই বন্ধ। যারা জ্ঞানী-গুণী মহাপুরুষ ওই দুই দরজা তাদের কাছে ভোলা। তারা অবারিত দেখতে পায়, জন্ম-জন্মান্তর পেরিয়ে মানুষ চলেছে।
ভীষণ সরল মন, পেঁয়ো চাষাভুষোর মতো এই সব কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় প্রীতমের। খানিকটা বিশ্বাস আজকাল করেও সে। তবু বলে, শরীর ছাড়া কি বাঁচা যায়? আমি যে ভাবতেই পারি না। শরীর ছাড়া কি আমি বা তুই জন্মের আগেও ছিলাম, মরার পরেও থাকব?
ধীরাজ তেমনি অকপটে বলে, ছিলাম না? তা হলে আছি কী করে? আর আছি যখন, থাকতেও তো তখন হবেই।
ধূপকাঠির ঝাঁঝালো আতরের গন্ধটা আজ ভারী মিঠে লাগে তার। চুপ করে বহুক্ষণ বসে থাকে প্রীতম। সরল হওয়ার চেষ্টা করে, বিশ্বাসী হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এক ধরনের সচ্ছল শহুরে জীবনের বুদ্ধি ও যুক্তিগ্রাহ্য গ্রহণ-বর্জনের রীতিতে অভ্যস্ত বলে পাশাপাশি মনের মধ্যে সন্দেহের কাঁটাও ফুটে থাকে। বিশ্বাস কি এত সোজা?
প্রীতম বলে, আমার ঠিক তোর মতো হতে ইচ্ছে করে। একটু টানাটানির সংসার থাকবে। ঘরে তৈরি জিনিস সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে দোরে দোরে বেড়াব। আনন্দই আলাদা।
দুর ব্যাটা, আমার জীবনটা কি সুখের? সকাল থেকে রাত অবধি বাড়ি বাড়ি, দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানো, ওর মধ্যে কোনও আনন্দ নেই।
আমার যে বড় বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে রে ধীরাজ।
আমারও করে। কিন্তু আমার তো হবে না। জন্ম বয়সে কর্ম করেছিলাম একবার মাকে নিয়ে কামাখ্যা ঘুরে। এখন একেবারে কুয়োর ব্যাং। তোমার মতো লেখাপড়া শিখলাম না, চাকরি করলাম না।
চাকরি কি বেশি সুখের ব্যাপার নাকি? আমিই বরং রেগেমেগে কতবার চাকরি ছাড়ার কথা ভেবেছি।
তবুও আমাদের দিন আনি দিন খাই অবস্থার চেয়ে তো ভাল।
প্রীতম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
ধীরাজ বিস্ময়ের চোখে চেয়ে থাকে তার দিকে। বলে, তুমি মাঝে মাঝে এমন সব দুঃখের কথা বলো যা শুনলে আমার অবাক লাগে। নিঃসঙ্গতা, ন কমিউনিকেশন, মৃত্যুভয় এসব আমাদের কাছে কেতাবি ব্যাপার বুঝলে? তোমার হয়তো ছাইরঙা আকাশ দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়, আমার কিছুই হয় না। তুমি হলে খুব সূক্ষ্ম অনুভুতির মানুষ। আর আমাদের সব মোটা দাগের ব্যাপার।
সূক্ষ্ম অনুভূতির নিকুচি করি। তোর মতো দায়ে পড়ে সংসারের ঘানিতে পেষাই হয়ে বেরোলে আমি বেশ একখানা ঝরঝরে মানুষ হতাম।
যাঃ, কী যে বলো!
তোর বাড়িতে একদিন নিয়ে যাবি?
তার আর কথা কী? কালই চলে। রিকশায় দশ মিনিটও নয়। তবে মাঝখানে সুভাষপল্লির রাস্তাটা একটু খারাপ, কঁকুনি-টাকুনি লাগতে পারে।
ঝাকুনিতে কিছু হবে না। যাব।
ধীরাজ খুব খুশি হয়ে বলে, বাড়ির এম• অবস্থা যে কাউকে যেতে বলতে লজ্জা করে। তুমি নিজে থেকে যেতে চাওয়ায় এত ভাল লাগল!
প্রীতম প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বলে, আজ ধূপকাঠি কীরকম বিক্রি হল?
উদাস হয়ে ধীরাজ বলে, বাঁধা গাহেক কিছু আছে, তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। বিক্রিবাটা ভাল নয়। প্রচণ্ড কম্পিটিশন। মালমশলার দামও চড়া।
অন্য কিছু ব্যাবসা করিস না কেন?
অনেক কিছু করার চেষ্টা কি আর করিনি? কয়লার দোকান দিলাম, চানাচুর বানালাম, আলুও বেচেছি, কিন্তু কোনওটাতেই মার্কেট পাওয়া গেল না। অল্প পুঁজির কারবার তো, চটপট রিটার্ন না পেলে পেটে গামছা বাঁধতে হয়। লগ্নীর টাকা পেট্টায় নমঃ হয়ে যায়। সবই তো বোঝে। তুমি কত বড় অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
প্রীতম ম্লান হাসল। ধীরাজের আয়-ব্যয়ের হিসেব কষতে বসলে সে নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে দেখবে ডেবিট-ক্রেডিটে অনেক ভুতুড়ে এন্ট্রি, অনেক অলৌকিক যোগ-বিয়োগ। সে জানে, ধীরাজের আয় মাসে দুশো টাকাও নয়। দুই মেয়ে, এক ছেলে, বউ, মা নিয়ে সংসার। প্রীতম মাথা নাড়ে, না, কোনও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের পক্ষেই সম্ভব নয় ওর ব্যালান্স শিট তৈরি করা। তার জন্য দরকার ম্যাজিক জানা।
ধীরাজ একটা শ্বাস ফেলে বলে, তবে সান্ত্বনা কী জানো, দুনিয়ায় আমার চেয়েও খারাপ অবস্থায় লাখ লাখ কোটি কোটি মানুষ বেঁচে আছে।
প্রীতম আনমনে মাথা নাড়ল। পৃথিবীতে কে কেমনভাবে বেঁচে আছে তা নিয়ে বহুকাল সে সত্যিকারের মাথা ঘামায়নি। দুঃখ-দুর্দশায় নাভিশ্বাস ওঠা এই দেশে যে সে নিজে সপরিবারে না খেয়ে মরবে না এবং মোটামুটি সুখেই থাকতে পারবে এটা বুঝেই তৃপ্ত ছিল। মাঝে মাঝে ভিখিরিকে ভিক্ষে দেওয়া, সমবেদনা বোধ করা এবং মানুষের জন্য কিছু করা উচিত বলে ভাবা, এ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না তার।
ধীরাজ চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ঝুম হয়ে বসে সে পৃথিবীর মানুষজন নিয়ে ভাবল। বুকের মধ্যে ভারী একটা চাপ কষ্ট। মরেই যদি যেতে হয় তবে দুনিয়ার আরও কিছু মানুষের সঙ্গে চেনা-জানা থোক। সারাজীবনে মাত্র গুটিকয় মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে, অথচ পৃথিবীতে কত কোটি কোটি মানুষ।
