তবে কি বহু কোটি বছর পর মৃত্যুশাসিত এই পৃথিবীকে এসে স্পর্শ করল মৃত্যুহীনতার আলো? আর কখনও কেউ মরবে না? না মানুষ। না গাছপালা। না কীটপতঙ্গ।
ছোট বোন টিউশানিতে যাওয়ার সময় বলে গেল, আসছি দাদা।
ভারী আনন্দে প্রীতম বলল, আয়। তাড়াতাড়ি আসিস।
মা দুধ নিয়ে এল রোজকার মতো। প্রীতম মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল রোগা হাতে, মা!
কী রে? কাল রাতে নাকি ঘুমোসনি? মরম বলছিল।
প্রীতম কথার জবাব না দিয়ে আবার গম্ভীর গলায় ডাকে, মা।
মা এই ডাক বোঝে। গভীর হয়ে যায় চোখ, মুখে স্নিগ্ধতা নিবিড় হয়। মাথায় হাত রেখে বলে, চিন্তা করিস না। কাল বিলুর চিঠি এসেছে। ওরা ভাল আছে।
ভাল থাকবে। সবাই ভাল থাকবে।
দুধটা খেয়ে নে।
তুমি বোসো তো কাছে। খাইয়ে দাও।
মা বসে। খাইয়ে দেয়।
মা!
বলো।
ওই মাঠটায় তেজেনবাবুরা একবার দুর্গাপুজো করেছিল, মনে আছে?
হ্যাঁ। তারপর আর হয়নি। তুই তখন ছোট।
ওইখানে অষ্টমীর দিন একটা পাঁঠা বলি হয়েছিল।
হবে হয়তো।
হয়েছিল। ছোট্ট একটা পাঁঠা। হেঁচড়ে যখন হাড়িকাঠের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল ওঃ…জীবজন্তুরাও কঁদে, জানো?
তা আর কাদে না! খুব কাঁদে।
আমার বার বার মনে হচ্ছে, সেই পাঁঠাটা বোধ হয় আজও ওইখানে ঘাস ছিড়ে খাচ্ছে। ওই দেখো।
দূর পাগল! কী যে বলিস!
ভাবতে দোষ কী মা? তোমার কি ভাবতে ভাল লাগে না, যারা মরে গেছে, আসলে তারা কেউ মরেনি! অন্য একটা জায়গায় গিয়ে রয়েছে।
মরা মানে তো তাই-ই শুনি!
হ্যাঁ, তাই। মা, শতমের ঘর থেকে গীতাটা একটু নিয়ে এসো তো। তারপর আমার পাশে বসে শোনো। শুনবে?
ওমা! শুনব না? আমি কত বলি, কেউ একটু শোনায় না। বোস, নিয়ে আসি।
৬৬. গীতা পড়তে পড়তে
গীতা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে থামে প্রীতম, কোনও কোনও শ্লোক ব্যাখ্যা করে মাকে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু বেশিক্ষণ পারে না। হাঁফ ধরে আসে। অবসন্ন লাগে।
আজ থাক, আবার কাল পড়িস। বলে মা হাত থেকে ছোট্ট গীতাটা খসিয়ে নিয়ে চলে যায়।
প্রীতম চুপ করে বসে থাকে। বেলা বাড়ে। প্রীতমের ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। আনন্দের উৎস থেকে যে বান এসেছিল তা আস্তে আস্তে সরে যায়। কিন্তু তীরভূমিতে নতুন পলিমাটির স্তরও রেখে যায় সে। আনন্দের রেশ অনেকক্ষণ তার সঙ্গে থাকে পোষা বেড়ালের মতো।
সামনে চেয়ে ছিল প্রীতম। দেখার তেমন কিছু নেই। রাস্তার ওধারে মাঠ বাড়িঘর, অনেক কঁঠাল গাছের ভিড়। কিন্তু এই তুচ্ছ দৃশ্যের মধ্যে এক আনন্দের আলো খেলা করে আজ। সদর স্ট্রিটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রবি ঠাকুরের যেমন একদা হয়েছিল, তেমনই কিছু কি এ? একটা ডিম ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে এক বিস্ফারিত বিস্ময়?
গরম জল করে মা যখন তাকে ধরে ধরে স্নানঘরে নিয়ে গেল তখনও তার মাথা আচ্ছন্ন হয়ে আছে, চোখে ঘোর। একটা জলচৌকিতে বসিয়ে মা তার গায়ে যখন কুসুম-গরম জল ঢেলে দিচ্ছে তখন সে স্পষ্টই অনুভব করে তার গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে অজস্র নিঝরিণী। ধুইয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন সমস্ত অসুখ। শরীরে আজ জীবাণুদের নিত্যকার কোলাহল নেই, মৃত্যুভয় নেই। পৃথিবীর দীন দরিদ্রতম ভিক্ষুক বা হতভাগ্যও মরার আগে কিছুক্ষণ সুখভোগ করে প্রকৃতির নিয়মে। তারও কি এই শেষ সুখ? হ্যাঁ, ভেবেচিন্তে তাই মনে হয়। হোক। এখনই যদি তার মৃত্যু হয় তবে তার কোনও দুঃখ নেই। অজানা পথ ধরে সে এক আনন্দধামে চলে যাবে। মৃত্যু যদি এ রকম হয় তবে কী সুন্দর!
ছেলেবেলার কয়েকজন বন্ধু প্রায়ই দেখা করতে আসে। বহুকাল এই সব বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে। মানসিকতারও বিশাল ফারাক ঘটেছে। এখন এরা আর বন্ধু নয়, চেনা মানুষ মাত্র। প্রথম প্রথম ওরা দেখা করতে এলে বলার মতো কথা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুরিয়ে যেত। মফসলের মানুষের সঙ্গে কলকাতার লোকের তফাত তো থাকবেই। কিন্তু প্রথম দিককার সেই দূরত্ব কমে এসেছে এখন। বন্ধুদের সঙ্গে বলার মতো কথা সে অনেক খুঁজে পায়।
আজ বিকেলে এল ধীরাজ। ধূপকাঠির একটা ব্যাবসা আছে তার। রবীন্দ্রনগরের শেষ প্রান্তে খুব দীনদরিদ্র একটা বাড়ি আছে তার। বউ, দুই মেয়ে আর মা নিয়ে সংসার। সবাই সারাদিন ধূপকাঠি তৈরি করে, ধীরাজ সাইকেলে করে তা বিক্রি করতে বেরোয়। খুবই কাহিল অবস্থা। দিন চলে না।
এই দীনহীন ধীরাজকে বড় ভাল লাগে প্রীতমের। একটা দেশলাই কেনার আগেও ধীরাজকে দু’বার চিন্তা করতে হয়। এই যে কষ্টের বেঁচে থাকা, তা আস্তে আস্তে ধীরাজের সব অহংবোধ শুষে নিয়ে ভারী নরম এক মানুষ করে তুলেছে তাকে।
আজ বিকেলে ধীরাজ আসতেই প্রীতম একেবারে বোকা গেঁয়ো মানুষের মতো সরলভাবে বলে উঠল, বুঝলি ধীরাজ, আমার আজ খুব আনন্দ হচ্ছে। ভীষণ আনন্দ।
সাইকেলটা বারান্দার নিচে দাঁড় করিয়ে উঠে এল ধীরাজ। সাইকেলের হ্যান্ডেলের দু’ধারে দুটি প্রকাণ্ড থলে ভরতি ধূপকাঠি! ধীরাজ কাছে এসে বসলেই তার গা থেকে বিচিত্র নানা আতর বা মশলার সুবাস পাওয়া যায়।
আনন্দের কথায় ধীরাজের মুখেও ভারী খুশির হাসি দেখা গেল। মুখোমুখি চেয়ারে বসে বলল, আনন্দ হচ্ছে? তার মানে তুমি সেরে উঠছ। এ খুব ভাল লক্ষণ।
সেরে উঠছি কি না সেটা কোনও পয়েন্ট নয় রে ধীরাজ! আজই যদি প্রাণটা বেরিয়ে যায় তা হলেও ক্ষতি নেই।
ধীরাজ সম্ভবত এ ধরনের আনন্দের খবর রাখে না। তবে শিক্ষিত ও সফল এই বন্ধুটির যাবতীয় কথাকেই সে মূল্য দেয়। শুধু এই মরার কথাটাকে সইতে পারে না। বলল, মরবে কেন? তুমি এত ভাল মানুষ, এত কিছু শিখেছ, জেনেছি, তুমি মরলে চলবে কেন? ভগবানের ওরকম অবিচার নেই।
