প্রীতমের চোখ জলে ভরে এল। হঠাৎ বিশীর্ণ হাতে মরমের গাল ছুঁয়ে বলল, তুই কেন খারাপ হয়ে গেলি রে, মরম?
মরম এ কথায় চুপ করে থাকে। মুখের ওপর এত সরলভাবে এই প্রশ্ন কেউ তাকে করেনি।
প্রীতম আবার তাড়া দেয়, বল কে খারাপ হয়ে গেলি!
তুমি একটু বিশ্রাম করো না, দাদা!
না, তুই আগে বল।
খারাপ হয়ে গেলাম, কী করব বলো। তবে তোমাকে ছুঁয়ে বলছি, আবার ভাল হয়ে যাব। একটু একটু হচ্ছিও তো!
তোর কি খুব টাকার দরকার?
কেন, তুমি দেবে?
দেব। কেন দেব না?
তুমি যে কী বলো তার ঠিক নেই। তোমার টাকা নিয়ে কি আমার চিরকাল চলবে? নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে না?
তুই শতমের সঙ্গে ব্যাবসা করিস না কেন?
মেজদা আমাকে বিশ্বাস করে না বোধহয়।
কেন করে না?
একবার কিছু টাকা নষ্ট করেছিলাম।
তা হলে তুই আলাদা ব্যাবসা কর। আমি টাকা দেব।
মরম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ব্যাবসা তো একটা করছিলাম। কিন্তু বাবা বা মেজদার পছন্দ নয়। অবশ্য ভদ্রলোকের ব্যাবসাও নয় সেটা।
কিসের ব্যাবসা?
নেপালের বর্ডার থেকে স্মাগলিং।
প্রীতম অস্থিরতা বোধ করে আবার মাথা নেড়ে বলে, খবরদার না। ধরা পড়লে শেষ হয়ে যাবি।
মরম হেসে বলে, পুলিশ-টুলিশের ভয় নেই। ভয় স্মাগলিং গ্রুপের কিছু মস্তান ছেলেকে। প্রায়ই গ্রুপে গ্রুপে লেগে যায়। অনবরত মারপিট হয়।
আর খুন?
অনেক। রোজ একটা-দুটো স্ট্রে খুন হচ্ছে, দেখছ না?
হাতে পেলে তোকেও মারবে?
মরম হাসে, মারবে। কতগুলো পাড়ায় আমি যাই না।
তুই কাউকে মেরেছিস?
খুন? না, কাউকে না। তবে হাত-ফাত ভেঙেছি অনেক।
তোর রিভলভার আছে?
মরম একটু চুপ করে থেকে বলে, ওয়ান শট একটা জাপানি জিনিস কিনেছিলাম। দিয়ে দিয়েছি। তুমি রাতদুপুরে এসব নিয়ে এত ভেবো না তো!
প্রীতম সে কথায় কান না দিয়ে বলে, তুই কখনও মার খেয়েছিস?
অনেক। কয়েকবার খুন হতে হতে বেঁচে গেছি।
তোর অপমান লাগে না?
অপমান! না। সেসব নয়। মারের মধ্যে অপমানের কী আছে? মার খেয়েছি, উলটে মেরেছি।
আমি কাউকে কখনও মারিনি। জীবনে একবার ছাড়া দু’বার মার খাইনি।
তুমি ছিলে গুড বয়।
ওই যে রাস্তার শেষে বড় রাস্তার ড্রেন! ওখানে একবার মেজদা খুব মেরেছিল।
মেজদা মানে দীপুদা নাকি?
হ্যাঁ, সেই ছোটবেলায়।
দীপুদা একসময়ে শিলিগুড়ির মস্তান ছিল।
খুব মস্তান। কিন্তু আমাকে ভালবাসত খুব। আজও বাসে। মেজদার সেই মার আজও আমার শরীরে লেগে আছে। কিন্তু তাতে আমার খুব উপকার হয়েছিল। জড়তা, লজ্জা, সংকোচ সব কেটে গিয়েছিল।
মরা হাসতেই থাকে, আমরা অন্যরকম, মার খেয়ে কিছুই হয়নি।
তুই খারাপ হয়ে গেছিস।
তোমার কি সেজন্য মন খারাপ?
সেজন্যও। সব কিছুর জন্য। বেঁচে থাকার ওপর ঘেন্না এসে যায়। তোরা আমাকে বাঁচতে দিবি না।
ক্লান্ত প্রীতম বালিশে মাথা বাখলে মরম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, একটা চাকরি হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখো।
তোকে কে চাকরি দেবে? ভাল করে লেখাপড়াই করলি না।
প্রীতম চোখ বুজে গভীর কবে শ্বাস নেয়। বুকে দহন, মাথায় অস্থিরতা। পৃথিবী ঘুরে যাচ্ছে, ফেঁটা ফোটা সময় পড়ছে টুপ টাপ করে করে। কারও জন্য কিছু করা হল না এই জীবনে।
মরম!
বলো দাদা।
নিজের জন্য ছাড়া আমি কখনও কারও জন্য কিছু করিনি। সেজন্য আজ বড় দুঃখ হয়। পৃথিবীটা কী বিশাল! আমি কেবল ছোট হয়ে থেকেছি। তুই ছোট হোস না।
আচ্ছা, দাদা।
শতমকে ডেকে দে। ও আমার মাথায় জপ করলে আমি বেশ ভাল থাকি।
মরম ঘড়ি দেখে বলে, সেজদা তো রাত তিনটে থেকে ধ্যানে বসে যায়। এখন সাড়ে তিনটে। ডাকলে আবার ক্ষতি হবে না তো?
প্রীতম একটু হাসে, তা হলে তুই জপ করে দে।
আমি! আমি তো মন্ত্র নিইনি।
নিসনি কেন?
কেউ কখনও বলেনি নিতে।
মনকে যা ত্রাণ করে তাই মন্ত্র। আগে এসব নিয়ে ভেবে দেখিনি, এখন খুব ভাবি। এখন থেকে তুই আমার মাথায় জপ করে দিবি রোজ।
মন্ত্র নিয়ে নেব তা হলে?
নে। নিলে ক্ষতি কী? নিয়ে দেখ কী হয়।
নেব।
শতমকে ডাক।
মরম উঠে যায়।
একটু বাদেই শতম এসে নিঃশব্দে প্রীতমের শিয়রে বসে।
প্রীতম তন্দ্রার মধ্যে ওর দাড়িয়াল মুখের দিকে চেয়ে অস্ফুট গলায় বলে, বড় কষ্ট।
কেমন কষ্ট।
মনটা বড় খারাপ। সকলের জন্য বড় কষ্ট হচ্ছে।
জানি। কষ্টই তো ভাল। কষ্ট মানুষকে জাগিয়ে রাখে, চেষ্টাশীল রাখে। বড় বড় মানুষের জীবনী পড়ে দেখো, কী অমানুষিক কষ্ট গেছে তাদের।
আমি তো বড় মানুষ নই।
তুমি মস্ত মানুষ। সেটা আমরা জানি।
প্রীতম ক্ষীণ একটু হাসে। মাথা নাড়ে। বলে, না রে। না।
শতম তার অভ্যন্তরীণ নাম জপের স্রোত খুলে দিয়ে নিঃশব্দে প্রীতমের মাথা ছুঁয়ে বসে থাকে। শব্দের তড়িৎ প্রবাহিত হতে থাকে এক সত্তা থেকে অন্য সত্তায়। শব্দ দোলে, ঢেউ খায়, তরঙ্গে তরঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায় মহাসমুদ্রের দিকে। মহাজীবনের নিহিত সংকেতবার্তা বেজে যেতে থাকে চারদিকে। ত্রাতা ডাকে, অনাহত শব্দ ডাকে।
প্রীতম গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। শতমেরও বাইরের চেতনা নেই। নাসামূলে–মধ্যের গভীবতায় তেসরা তিল। যেখানে দ্বিদলে ফুটে ওঠে এক অবিস্মরণীয় সৌন্দর্যের ছবি। সে একত্র করার অস্ফুট গলায় বলে উঠতে থাকে, ঠাকুর…দয়ালদেশ… ওই তো ইটারনাল থ্রোন!
সকালে যখন বারান্দায় এসে বসে প্রীতম তখন ভোরবেলাটা তার এত অদ্ভুত লাগে! এ রকম অলৌকিক সুন্দর সকাল সে আর কখনও দেখেনি। এত গভীর, এত রহস্যময়, এত অফুরান।
শেষ শীতের টান এখনও বাতাসে রয়েছে। আর আছে উপচে পড়া রোদ। সামনে একটু ফাঁকা। জমি, বাড়ি-ঘর, আকাশ, এই দেখেই তো বড় হল প্রীতম। এই সেই একই শিলিগুড়ি। তবু কোখেকে এল এই অদ্ভুত এক সকাল। বার বার এক অসীম আনন্দের বাঁধা তারে কে আঙুল ঘেঁয়ায়! আর শিউরে শিউরে ওঠে সে। আজ কোনও পিছুটান টের পাচ্ছে না সে, কারও জন্য কিছু কষ্ট নেই। এ কেমন?
