না। আপনি ওঁর সঙ্গে আর সে খেলা খেলতে পারেন না। সেটা আমি জানি।
তবে কি অন্য কারও সঙ্গে পারি?
সে কথা বলিনি। বিয়ের পর অনেক বছর কেটে গেলে তো আর নতুন করে রহস্যময়ী হওয়া যায় না। প্রেম জমাতে গেলে একটু রহস্য আর একটু দূরত্ব থাকা দরকার যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্ভব নয়।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী সম্ভব তা কি একজন কনডেমড ব্যাচেলারের কাছ থেকে জানতে হবে?
ব্যাচেলাররাও কিছু কিছু বোঝে।
বোস সাহেব আপনার পরামর্শে চলে বলে কি মণিদীপাও চলবে ভেবেছেন?
না। দীপনাথ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমি অত দুরাশা করিনি।
আপনার দুরাশা আর-একটু বেশি। আপনি বোধ হয় বোস সাহেবের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিতে চান।
দীপনাথ গাড়লের মতো চেয়ে থাকে। মুখে কোনও কথা আসে না।
মণিদীপা মৃদু একটু হেসে বলে, তুমি বোকা! বোকা! কেন বুঝতে চাইছ না যে, বোস সাহেব নয়, টাকা নয়, আমি যাকে ভালবাসি তাকেই চাই?
পিছনেই বন্ধ দরজা। দীপনাথ আস্তে তাতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। বলে, কাকে?
তোমাকে! তোমাকে! তোমাকে!
এলো চুল ঝাঁপিয়ে পড়ল চারধারে। তরঙ্গের মতো উঠে এল মণিদীপা। চোখে পাগলের মতো দৃষ্টি। ঠোঁটে সম্মোহন। দীপনাথ ভাবল, এই যৌবনজলতরঙ্গ রাধিবে কে?
তার পিঠে একটা, দুটো, তিনটে টোকা পড়ল। তারপর গলা খাঁকারির আওয়াজ।
চ্যাটার্জি! আই অ্যাম ওয়েটিং।
দীপনাথ তৎক্ষণাৎ ঘুরে দরজা খুলল। দরজার মাথা অবধি করাল বিশাল চেহারা নিয়ে বোস দাঁড়িয়ে। কিন্তু এক বৃদ্ধ, হতমান, রুগ্ন দৈত্য। তার না আছে নখ, না দাত, না হিংস্রতা।
আসুন, বোস সাহেব।
আর ইউ বিজি?
একটু। উই আর সরটিং আউট এ ফিউ থিংস।
দেন গো অ্যাহেড। আমি বরং আমার ঘরে…
না। এখানেই আসুন। এটা আপনার স্ত্রীর ঘর। আমি আউটসাইডার।
বোস একটু হাসে, কাঁধ তুলে ছেড়ে দেয়। তবে ঘরে ঢোকেও।
মণিদীপা হাত তিনেক দুরে থেমে আছে। নিস্তব্ধ তরঙ্গ। মুখ-চোখে অপমান ফাটো-ফাটো হয়ে আছে। থম ধরে আছে কান্না।
বোস মৃদু স্বরে বলে, আমি হয়তো ডিস্টার্ব করছি।
দীপনাথ তার হাসিমুখ তুলে বোস সাহেবের মুখের দিকে তাকায়। তারপর বলে, পাত্রী আমার পছন্দ নয় বোস সাহেব। পাত্রীরও পাত্র পছন্দ নয়।
বোস গম্ভীর হয়ে বলে, আই থট আদারওয়াইজ।
আপনি ভুল ভেবেছিলেন। মণিদীপা খুব গভীর মনের মানুষ পছন্দ করেন। আমার সেই গভীরতা নেই। আর আমি হুইমজিক্যালদের পছন্দ করি না। কিন্তু মণিদীপ হুইমজিক্যাল।
বোস দাঁড়াতে পারছে না। শরীরের ভিতরকার কোনও অপ্রতিহত দুর্বলতা কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। একটু আড়ষ্ট পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে বোস সাহেব মণিদীপার বিছানায় বসে। সাঁই সাঁই করে খানিক দম নিয়ে বলে, বেয়ারাকে একটু খাবার জল দিতে বলো তো দীপা।
মণিদীপা একবার বোস সাহেবের দিকে তাকায়। পালানোর এমন সুযোগ আর পাবে না। ত্বরিত পায়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
একটু বাদে বেয়ারা ট্রে-তে একটা অস্বচ্ছ কাচের গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢোকে। আর তখন করিডোরের প্রান্তে টেলিফোনে নির্ভুল ডায়ালের আওয়াজ পায় দীপনাথ।
মণিদীপা বলল, হ্যাল্লো! ডক্টর মুখার্জি আছেন? ইটস আর্জেন্ট! ভেরি আর্জেন্ট।
বোস সাহেব জলটা শেষ করে খালি গ্লাস হাতে নিয়ে শূন্য চোখে চেয়ে আছে।
দীপনাথ নিঃশব্দে দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে। শূন্য, সব শূন্য লাগে তার এ বাড়ির। আস্তে আস্তে সে সিঁড়ি ভেঙে নামে। আর ফিরে তাকায় না।
৬৫. শরীরে আবদ্ধ এই জীবন
শরীরে আবদ্ধ এই জীবন, তবু শীরেই কি শেষ? এই যে এক জায়গায় থেকেও চেতনা দিয়ে কত দূর পর্যন্ত স্পর্শ করছে প্রীতম, এ কি সত্য নয়? এক দরজা জন্ম, আর-এক দরজা মৃত্যু, এ ছাড়া আর কোনও ফাঁক-ফোকর নেই যা দিয়ে জানা যাবে এই অস্তিত্বের কারণ।
একা একা বড় অস্থির হয় মাঝে মাঝে প্রীতম। তার সব যন্ত্রণার উৎস হল কয়েকটি মানুষের প্রতি তার আকণ্ঠ ভালবাসা। লাবু, বিলু, মা, বাবা, পরিজন। কাউকেই ছেড়ে দেওয়া যায় না, কাউকেই ছেড়ে দেওয়া যায় না। তবু কেন এই নশ্বরতা? কেন ছেড়ে দিতে হয়? কেন ছেড়ে যেতে হবে?
মাঝরাতে এই অস্থিরতাবশে সে একদিন ড়ুকরে ওঠে, মরম! মরম!
জানলার পাশের বিছানা থেকে মরম তার ডাকে সাড়া দেয়, দাদা, ডাকছ?
ওঠ তো! ওঠ! আমার ভীষণ অস্থির লাগছে। মাকে ডাক, শতমকে ডাক! শিগগির!
মরম চকিতে ওঠে। কাছে এসে মশারি তুলে তাকে দু হাতে ধরে বলে, কী হয়েছে, দাদা?
বাতিটা জ্বালা। এত অন্ধকার সহ্য হচ্ছে না।
মরম টিউবলাইটটা জ্বেলে দিয়ে কাছে এসে বসে। তাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলে, ডাক্তারবাবুকে ডাকব?
ডাক্তার! ডাক্তার কী করবে? ডাক্তারের কাজ নয়। আমার মন বড় অস্থির।
আমি তোমাকে একটু হাওয়া করছি। শুয়ে থাকো।
শুতে পারছি না। শুলেই বুকে চাপ লেগে দম বন্ধ হয়ে আসছে।
দাঁড়াও।–বলে মরম উঠে গিয়ে টেবিল থেকে একটা অম্বলের ট্যাবলেট স্ট্রিপ থেকে ছিড়ে এনে হাতে দিয়ে বলে, এটা খেয়ে নাও। বোধহয় পেটে গ্যাস হচ্ছে তোমার।
প্রীতম ভাল ছেলের মতো ট্যাবলেটটা চিবোতে থাকে। বলে, তুই বসে থাক। আমার একা লাগছে।
মরম তাকে প্রায় বুকের সঙ্গে টেনে রেখে বলে, আমি আর ঘুমোব না।
হ্যাঁ রে, কলকাতার কোনও চিঠি এসেছে?
ও, তুমি লাবু আর বউদির কথা ভেবে অস্থির হয়েছ?
প্রীতম মাথা নাড়ে, না। শুধু ওরা নয়, আজকাল কেমন তোদের সকলের কথাই মনে হয় ভীষণ।
ভেবো না। আজই বউদির চিঠি এসেছে। সবাই ভাল আছে।
