দোতলার চাতালে উঠে বোস একবার নিজের বুকে হাত রাখে। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে হা করে দম নেয়।
সদর দরজা খোলাই ছিল। ড্রয়িংরুমে ঢুকে বোস সাহেব মুখ ফিরিয়ে বলে, আমার ঘরে গিয়ে বসুন। আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি।
বোস সাহেবের ঘরটা দীননাথের অচেনা নয়। করিডোরের শেষে বাঁ-হাতি ঘরটা। আগে ডান দিকে মণিদীপার ঘর। বোস সাহেব বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই দীপনাথ মণিদীপার ঘরের বন্ধ দরজার নব ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকল। তারপর আস্তে বন্ধ করে দিল দরজাটা।
মণিদীপা একদৃষ্টে দরজার দিকে চেয়ে ছিল। তাকে দেখে একটুও চমকাল না। কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত বিহুল দিশেহারা দৃষ্টি। যেন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। যেন পৃথিবীর কোনও কিছুই সত্য বলে মনে হচ্ছে না। চুল এলো, মুখ শুকনো, তবু ভারী করুণ আর সুন্দর আর অসহায় এই জেদি মেয়েটিকে দেখে আজ শঙ্খের মতো আর্তনাদ করে ওঠে দীপনাথের হৃদয়। কী বলবে তা ভুলে গেল সে। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
এক-একটা পাগলা মুহূর্ত আসে মানুষের জীবনে যখন অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা থাকে না। দীপনাথের ঠিক সেই অবস্থা। পায়ের নীচে মৃদু ভূমিকম্প উঠল চৌদুনে। বোস সাহেব তার বউযের সঙ্গে দীননাথের মিলন চাইছে। এর চেয়ে সুখবর আর কী হতে পারে?
দীপনাথ নয়, তার ভিতরকার পাগলটা বিনা ভূমিকায় বলল, আমার সঙ্গে যাবে মণিদীপা?
মণিদীপা তেমনি বিহুলভাবে চেয়ে আছে।
দীপনাথ হাত বাড়িয়ে বলল, এসো। চলো যাই।
এ সমস্তই বলল দীপনাথ। কিন্তু, তীব্র শ্বাসের কষ্ট আর অসহনীয় আবেগের তাড়নায় তার কোনও কথাই মণিদীপার কানে পৌঁছল না। প্রায় ফিসফিসানির মতো তার নিজের শ্বাসবায়ুর সঙ্গে মিশে গেল মাত্র।
মণিদীপা বলল, ক’দিন ধরে ও যে কী পাগলামি শুরু করেছে।
দীননাথ আবেগের পাহাড়চূড়া থেকে নেমে এল। ভীষণ লজ্জা। ভীষণ গ্লানি। গলা যত দূর সম্ভব নরম করে এবং স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে সে বলে, কে পাগলামি করছে?
আপনাদের বোস সাহেব। কী বলছে?
যা বলছে তা আপনাকে বলা যায় না।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমাকেও আজ কিছু অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছেন।
কিসের প্রস্তাব?
তাও আপনাকে বলা যায় না।
মণিদীপা করুণ মুখ করে বলে, তা হলে সেই কথাই। আমাকেও বলেছে, আপনাকেও বলেছে।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, হয়তো সেই উদ্দেশ্যেই আজ উনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।
মণিদীপার মাজা রংও রাঙা হল এ কথায়। সে বলল, ছিঃ ছিঃ। ও কোথায় গেল?
বাথরুমে।–দীপনাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, বাথরুমে উনি একটু সময় নেবেন বলে মনে হচ্ছে।
কেন? আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর জন্য সময় দিতে?
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, না। আমার সন্দেহ, উনি কোনও অসুখে ভুগছেন। ওঁর খুব তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো উচিত। এর আগেও একদিন বলেছিলাম, উনি তখন পাত্তা দেননি।
মণিদীপা মাথা নাড়ে। একটু ভেবে বলে, এরকম একটা সন্দেহ আমারও হচ্ছিল।
বিয়ের সময় ও ছিল দারুণ শক্ত সমর্থ মানুষ। এখন কেমন ফ্যাটি, উইক। অসম্ভব স্ট্রেনও যাচ্ছে।
দীপনাথ বলে, হ্যাঁ। উনি কাজ ভালবাসেন। তা ছাড়া একটা প্রায় অসামাজিক লাভ অ্যাফেয়ারে পড়ে যাওয়ায় স্ট্রেনটা বেড়েছে।
মণিদীপা খুব ম্লান হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর যখন মুখ তোলে সেই মুখ দেখে পাষণ্ডেরও মায়া হওয়ার কথা। আস্তে করে বলে, এটা আমার ডিফিট, তাই না?
দীপনাথ অবাক হয়ে বলে, কোনটা?
এই যে বোস সাহেব তার কাজিনের সঙ্গে প্রেম করছে এর মানে তো এই দাঁড়ায় যে, আই হ্যাভ ফেইলড টু অ্যাট্রাক্ট হিম।
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, তাই দাঁড়ায়।
আমি তা হলে ডিফিটেড?
খানিকটা। তবে লড়াই তো এখনও চলতে পারে।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলে, না। লড়াই শেষ। আমি হেরো।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, আপনি ঠিক হারেননি।
তবে কি জিতেছি?
তাও নয়। আপনি আসলে যুদ্ধটাই মন দিয়ে করেননি যে।
আমার কী করার ছিল?
লোকটাকে আর-একটু বাজিয়ে দেখতে পারতেন।
লাভ নেই। বাজালে ফাঁকা আওয়াজ বেরোবে। ওর কোনও ডেথ ছিল না কখনও।
আপনি কি ডেপথওয়ালা লোককেই চেয়েছিলেন?
মণিদীপা অবাক হয়ে বলে, কে না চায়?
আপনাকে দেখে কিন্তু তা মনে হয় না।
তা হলে কী মনে হয়?
মনে হয়, আপনি ভালবাসেন প্লে-বয় টাইপ।
বাঃ! চমৎকার সব ধারণা আমার সম্পর্কে আপনাদের।
মানুষের ভুল হতেই পারে।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলে, ভুল নয়। একজন মহিলার প্রতি আপনাদের প্রিকনসিভড কিছু ধারণা ছিল। সেই ধারণাকে আপনারা ভাঙতে চান না। আর সেইটেই সব অশান্তির উৎস।
এই অবস্থাতেও দীপনাথ একটু হেসে বলে, আপনি বরাবর চমৎকার কথা বলেন।
আমার স্বভাবে আরও কিছু চমৎকার দিক ছিল। আপনি বা বোস সাহেব অন্ধ না হলে ঠিকই লক্ষ করতেন।
বিষণ্ণ দীপনাথ বলে, আমি তো চান্স পাইনি মণিদীপা। কিন্তু বোস সাহেব পেয়েছেন।
আপনিও অন্ধ। বোস সাহেবের কাছে আমাকে একটা ভ্যাম্পায়ার হিসেবে দাঁড় করাল কে?
আমি নই মণিদীপা।
কে আমার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নিতে বোস সাহেবকে পরামর্শ দিয়েছিল?
আপনি রেগে যাচ্ছেন। কিন্তু এটা রাগের সময় নয়। আমরা তিনজনই একটা বিশ্রী সিচুয়েশনের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। এই অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার।
মণিদীপা একবার শুধু দু’হাতের পাতায় মুখটা আড়াল করল। পরমুহূর্তেই আড়াল সরিয়ে সোজা দীপনাথের দিকে চেয়ে বলল, আপনি আমাকে কী করতে বলেন? বোস সাহেবের মন জয় করতে প্রেম-প্রেম খেলা শুরু করব?
