দীপনাথ বিজ্ঞের মতো হেসে বলে, আর এবার বোধ হয় আপনি আমাকে বাংগালোরের সঙ্গী করতে চাইবেন না।
না।–বোস শ্বাস ফেলে বলে, ইন ফ্যাক্ট দীপাকে যদি আপনি নেন তা হলে আপনার এবং আমার এক শহরেও বসবাস করা উচিত হবে না।
আর মিসেস বোস যদি কাউকে বিয়ে না করতে চান, তা হলে কী হবে?
বোস কাঁধ তুলে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, নাথিং।
কিন্তু উনি কাউকে বিয়ে করলেই তো আপনার সুবিধে।
বোস একবার তাকিয়েই দীপনাথের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে, তা কেন?
দীপনাথ চাপা ক্রুদ্ধ গলায় বলে, তা হলে আপনাকে মাসোহারার টাকাটা গুনতে হবে না।
বোস এ কথায় চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে বলে, শুধু তা-ই নয়।
তা হলে আর কী?
বোস উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে সামনে চেয়ে থেকে বলে, দীপা ছেলেমানুষ, ইমম্যাচিয়োর, রেস্টলেস, একস্ট্রাভ্যাগান্ড। একা থাকলে ও একদম শেষ হয়ে যাবে। আমি ওকে ট্যাকল করতে পারিনি বটে, কিন্তু আমার চেয়ে ইন্টিগ্রেডেড কোনও পুরুষ হয়তো পারবে।
পাত্রীর গার্জিয়ানের মতো কথা বলছেন না মিস্টার বোস। পাত্রপক্ষকে দোষের কথা শোনাতে নেই। শুধু গুণের কথা জানাতে হয়।
জিতানির ধোঁয়া গলায় লেগে বোস কিছুক্ষণ কাশে। কড়া ফরাসি সিগারেট, ধোঁয়া লাগতেই পারে। কেশে একটু ধরা গলায় বলে, আপনি বলেন খুব চমৎকার।
আপনি মিসেস বোসের জন্য এত চিন্তা করছেন কেন? ওঁর ভবিষ্যৎ ওঁকে ভাবতে দিন।
তা দিয়েছি। আমি কোনও ব্যাপারে ইন্টারফিয়ার করি না। আপনাকে কথাটা বলছি অন্য কাবণে।
কী কারণ?
আমি জানি, ইউ আর ইন লাভ উইথ হার, অ্যান্ড ভাইস ভার্সা।
এ কথায় দীপনাথের পায়ের তলার ভিত একটু নড়ে যায়। কিন্তু ল্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয়। তাই সে সামলে নেয়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আপনি হয়তো সত্যি কথাই বলছেন, ইয়েস, উই আর ইন লাভ।
বোস অবাক হয়ে বলে, ইউ অ্যাডমিট! কনগ্রাচুলেশনস।
থ্যাংকস। কিন্তু মুশকিল হল—
বোস সাগ্রহে একটু ঝুঁকে বলে, হ্যাঁ, মুশকিল হল—
মুশকিল হল, আমি মিসেস বোসকে ভালবাসি বলেই তার ভাল চাই।
বটে তো! তাতে মুশকিল কী?
মুশকিল হল, কীসে মিসেস বোসের ভাল হবে তা আমি এখনও ভেবে পাইনি।
ভালবাসার একটাই এইম থাকে চ্যাটার্জি, ভালবাসার লোকটাকে কজা করা।
ঠিক। তবে যদি তাতে তার ভাল না হয়!
ভাল হবে। তাতেই ওর ভাল হবে।
আপনাকে এ ব্যাপারে বড় বেশি উৎসাহী মনে হচ্ছে বোস সাহেব।
বোস একটু বিরক্ত হয়ে বলে, আমাকে সাহেব সাহেব করেন কেন বলুন তো!
আপনি যে ভীষণ সাহেব, বোস সাহেব।
বোস আবার কাঁধ ঝাকায়। তারপর বলে, আমিও ওর ভাল চাই। আমি জানি কীসে ওর ভাল হবে।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, পাত্রীর ভাল দেখলেই তো হবে না। পাত্রের ভাল হবে কি না সেটাও ভেবে দেখা দরকার।
আপনারও ভালই হবে। আপনাদের দু’জনেই দুজনকে ভালবাসেন, দেয়ার উইল বি নো প্রবলেম।
ভালবাসি বলেই প্রবলেম। ভালবাসা মানে ভাল-তে বাস করা।
মানছি। কিন্তু আপনার প্রবলেমটা ধরতে পারছি না।
কী করে বুঝবেন? আপনি তো কখনও কাউকে ভালবাসেননি বোস সাহেব! বুঝতে গেলে ভালবাসতে হয়।
বোস একটু গুম হয়ে থাকে।
দীপনাথ দেখে, গাড়ি বাঁক নিয়ে আলিপুরে ঢুকে যাচ্ছে।
বোস সাহেব একটা শ্বাস ফেলে বলে, ইউ আর বিয়িং এ বিট ডিসেপটিভ। হয়তো দীপার প্রতি আপনার অ্যাটাচমেন্টটা ফিজিক্যাল। মে বি ইউ ওয়ান্ট টু এক্সপ্লয়েট হার। মে বি ইউ হ্যাভ অলরেডি এক্সপ্লয়টেড হার।
দীপনাথের ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, কান জ্বালা করছে। তবু শুকনো হাসি হেসে সে বলে, যদি তাই করে থাকি তবু আপনার কিছু করার নেই বোস সাহেব। ইউ আর এ ম্যান উইদাউট ব্যাকবোন। আমার যদি স্ত্রী থাকত আর তার যদি পরপুরুষ জুটত, তবে আমি স্ত্রীকে ভালবাসি বা না বাসি সেই পরপুরুষের ঠ্যাং না ভেঙে ছাড়তাম না।
আপনি আমাকে আপনার ঠ্যাং ভাঙার জন্য ইনভাইট করছেন!
করছি। অ্যাট লিস্ট ইউ শুড ট্রাই।
বোস হেসে ওঠে।
গাড়ি এসে থামে ফ্ল্যাটের সামনে। দীপনাথ দেখতে পায় দোতলার বারান্দায় ম্লানমুখী মণিদীপা উদাস চোখে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুকটা কেঁপে ওঠে তার। ধড়াস ধড়াস করতে থাকে।
৬৪. এই ফ্ল্যাটে ঢুকতে আজ ভারী লজ্জা আর অস্বস্তি
এই ফ্ল্যাটে ঢুকতে আজ ভারী লজ্জা আর অস্বস্তি বোধ করে দীপনাথ। বহুকাল সে এরকম সংকটে পড়েনি। আজ তার পায়ের তলায় মৃদু ভূমিকম্প হয়ে চলেছে।
তারা গাড়ি থেকে নামতেই ওপরের বারান্দা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল মণিদীপা।
বোস সাহেব বাড়িতে ঢুকবার আগে একটু সময় নিল। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে মৃদু আন্তরিক স্বরে বলল, আপনি আজ একটু রেগে আছেন। আমার প্রোপোজাল হল, লেট আস হ্যাভ এ ফ্রাংক ডিসকাসন অ্যান্ড ট্রাই টু সেটল থিংস।
দীপনাথের আজ চাকরির ভয় নেই, কৃতজ্ঞতাবোধ নেই, সে মরিয়া। তাই চাপা গরগরে গলায় বলল, সবটাই তো আর একজিকিউটিভ মিটিং নয় বোস সাহেব।
বোস চিন্তিত মুখে দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, ইউ আর রিয়েলি অ্যারোগ্যান্ট। রিয়াল টাফ গাই। বাট লেট আস কিপ আওয়ার হেড টুডে।
দীপনাথ তেজের সঙ্গে বলল, দ্যাট ইজ ইয়োর হেডেক, নট মাইন। আপনি নিজের রিস্কে আমাকে এখানে এনেছেন। আমি কোনও কথা দিতে পারি না।
বোস সাহেবকে হঠাৎ খুব বিরক্ত আর ক্লান্ত দেখাল। মুখে-চোখে গভীর হতাশা। মৃদু স্বরে বলল, ঠিক আছে, আসুন।
বোস সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে উঠছে। পিছনে দীপনাথ। দীপনাথ দেখতে পেল বোস রেলিং-এ প্রয়োজনের চেয়েও একটু বেশি ভর দিচ্ছে। প্রতিটি সিঁড়িতে উঠতেই যেন বেশ কষ্ট হচ্ছে বোস সাহেবের। মস্ত লম্বা শরীরের আকৃতির সঙ্গে প্রকৃতির তানক তফাত। দীপনাথ টের পায়, বোস ভাল নেই। খুব তাড়াতাড়িই ওর ডাক্তার দেখানো উচিত।
