সেবার মাসির বাড়ি এলাহাবাদ থেকে বহুকাল বাদে দু’মাসের জন্য মা-বাবার কাছে এসে ছিল চিত্রলেখা। এমনিতেই চিত্রা দেখতে সুন্দর, তার ওপর মাসির কাছে সে একদম মেমসাহেবি কেতায়। থাকে। দিঘল, ফর্সা যৌবনাক্রান্ত ঢলঢলে কিশোরী। বব চুল, দারুণ সব পোশাক, চলাফেরার কায়দাই অন্যরকম। কাউকেই মানুষ বলে গ্রাহ্য করে না তেমন। সে এই জায়গায় পা দিতেই চারদিকে যেন চাপা শোরগোল পড়ে গেল। শুভঙ্করকে সেই সময় পরপর কয়েকদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াল তৃষা। গেল নদীর ধারে সপরিবারে পিকনিক করতে, সঙ্গে শুভঙ্কর। চিত্রলেখাকে শুভঙ্করের সঙ্গেই একদিন পাঠাল কলকাতা দেখতে। গেঁয়ো জায়গার কাঁচা ছেলের মাথা কঁহাতক ঠিক থাকে? ততদিনে শুভঙ্কর হয়ে গেছে তৃষার একান্ত বাধ্য, ভীষণ রকমের পোষমানা। সুতরাং নদীর ধারে কাঠা পাঁচেক সস্তা জমি কিনে পাঠশালাকে একটা দানপত্র লিখে দিয়ে তৃষার পক্ষে ঘরের কোণে ঘোগের বাসা তুলে দিতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। পাঠশালা নিয়ে স্বয়ং শুভঙ্কর তখন তুষার পক্ষে জান দিতে প্রস্তুত। পাঠশালা নদীর ধারে উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তৃষা জায়গাটা ঘিরে ফেলল দেয়াল দিয়ে। চিত্রলেখা এলাহাবাদে ফিরে যাওয়ার আগে একদিন তৃষাকে বলল, ওই বুদ্ধ ছেলেটার সঙ্গে তোমাদেব এত মাখামাখি কেন? তৃষা কিছু বলেনি। চিত্রলেখা এলাহাবাদে ফিরে যাওয়ার পর থেকেই শুভঙ্কর তৃষাকে মা বলে ডাকতে থাকে। রোজ আসত। দেখা করত। এলাহাবাদে চিঠিপত্রও লিখত বলে শুনেছে তুষা। শুভঙ্করকে আর তেমন খাতির করত না সে, তবে চটাতও না। চিত্রলেখার প্রেমে পড়েই কি না কে জানে, ক্রমে ক্রমে শুভঙ্করের সেই দীপ্ত তেজ। আস্তে আস্তে নিভে আসছিল। মাস ছয়েক বাদে আসানসোলে একটা চাকরি পেয়ে সে চলে যায়। এলে তৃষার সঙ্গে দেখা করে যায়, মা বলে এখনও ডাকে। কিন্তু পুরোটাই নখদন্তহীন হয়ে গেছে শুভঙ্কর।
পাঠশালার মাঠের নরম শিশিরে সিক্ত ঘাসের জমিতে পা দিয়ে চারদিকের মনোরম নির্জনতা দেখতে দেখতে তৃষা ভাবে, এতটা সরল নয় এই জমিটুকুর ইতিহাস।
একটা শিমুল গাছের নীচে হাত দেডেক গভীর গর্তের ধারে তিনটে ঝিম-ধরা মুরগিকে শাবলের ঘায়ে এক এক করে মারল লক্ষ্মণ! এই মুরগি মারার ব্যাপারটা সবসময়ে আজকাল তৃষা নিজেই তদারক করে। এর আগে লক্ষ্মণ বহুবার ঝিমুনি মুরগি নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে এসেছে। লোকে খেয়ে অসুখে পড়লে তৃষার বদনাম হবে।
মুরগি তিনটের মৃতদেহ দুর থেকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে দেখে তৃষা। রক্ত, ছেঁড়া পালক, ঘাড় গোঁজা ওই অসহায় মৃত্যুর দৃশ্য দেখে তার ভিতরটা একটুও নাড়া খায় না। এইসব দুর্বলতা নেই বলে সে খুশি।
লক্ষ্মণ পা দিয়ে ঠেলে মুরগি তিনটেকে গর্তের মধ্যে ফেলে মাটি চাপা দেয়। কবর হয়ে গেল। তৃষা গিয়ে চটি পরা পায়ে আলগা মাটি চেপে দেয় আরও একটু।
এমন সময় লক্ষ্মণ চাপা স্বরে হঠাৎ বলে ওঠে, বাবু ওই আসছে, মা।
তৃষা শুনল কিন্তু পথের দিকে তাকাল না। অন্য বউরা হলে তাকাত। কিন্তু তার আর শ্রীনাথের সম্পর্ক ততটা সরল নেই আর। শ্রীনাথ আসছে আসুক। তা কী?
সজল দাঁড়িয়ে ছিল পুকুরের ধারে। দু’ পকেটে চার-পাঁচটা ডিম। লম্বালম্বি একটা ডিমকে দু’ হাতের চাপে কিছুতেই ভাঙা যায় না, বলেছিল ছোটন নন্দী। এখন সে ডিম নিয়ে পরীক্ষাটা করছিল। তার শরীর ভাল নেই। জ্বর থেকে উঠে খুব একটা জোর পাচ্ছে না হাতে-পায়ে। তবু প্রাণপণে ডিমে চাপ দিয়ে দেখছিল, বাস্তবিকই ভাঙে না। ইলিপস বা উপবৃত্তে যে-কোনও চাপই কাটাকুটি হয়ে যায়, বিজ্ঞানের বইতে সে এমন কথা পড়েছে। তবু বইতে যা লেখা থাকে তার সবই তো সত্যি না হতে পারে! তাই সে পরীক্ষা করে দেখছিল। আসলে সকালে এক ঝুড়ি ডিম চোখের সামনে দেখলে আজকাল তার ভারী রাগ হয়। এত ডিমের কোনও মানেই হয় না। রোজ সকালে বিকেলে ডিম দেখলে কার না ইচ্ছে করে দু’-চারটে নষ্ট করতে?
ডিমগুলো হাতের চাপে ভাঙল না ঠিকই, তবে সজল একটার পর একটা ডিম বুড়ো একটা মহানিমের গায়ে ছুড়ে মারল। ফনাক করে ফেটে কুসম আর কাথ গড়িয়ে পড়ছে কাণ্ড বেয়ে। দু’-তিনটে কাক তাই দেখে লাফিয়ে কাছে এসে খা খা করতে থাকে। পুকুরে হাঁসগুলো ভ্যাক ভ্যাক করছিল, তাদের দিকেও একটা ডিম ছুড়ে দিল সে। ডিমটা ভাসল, ড়ুবল, ভাসল এবং ড়ুবে গেল।
তারপর হঠাৎই বাবাকে দেখতে পেল। উসকোখুসকো চুল, বাসি দাডি, তুসেব চাদর গায়ে বাবা বাড়ির ভিতরে ঢুকছে। সজল চট করে সরে আসে একটা গাছের আড়ালে। সাবধানে দেখে। কিছুই দেখার নেই অবশ্য। বাবা বাড়ি ফিরছে, এইমাত্র ঘটনা। এত বেলায় যখন ফিরল, তখন আজ আর অফিসে যাবে না। তার মানে সারাদিনের মতো একটা দুশ্চিন্তা, ভয় তার অস্বস্তি থাকবে সজলের। তাকে বাবা দু চোখে দেখতে পারে না।
ঘুরতে ঘুরতে সজল খ্যাপা নিতাইয়ের ঘরে এসে হানা দেয়। নিতাই নেই। ইস্পাতকে নিয়ে কোথায় গেছে। ঘরের দরজা হাঁ হাঁ করছে খোলা। চুরি যাওয়ার মতো কিছুই নিতাইয়ের নেই। তবু অনেক কিছু আছে। বাঁশের মাচানে একটা কম্বলের বিছানায় সে শোয়। মাথার কাছে একটা কুলুঙ্গিতে কালীমূর্তি তেল-সিঁদুরে বীভৎস নোংরা হয়ে আছে। মেঝের এক ধারে পঞ্চমুন্ডির আসন। সামনে মাটিতে একটা চক্র আঁকা। নিতাই কামাবের তৈরি কাঠের বাঁটওলা পাকা লোহার কয়েকটা ছুরি পড়ে আছে পাশে। নিতাই রোজ রাতে বিভিন্ন লোককে বাণ মারে। সবচেয়ে বেশি মারে তার বউ পুতুলরাণীকে উদ্দেশ্য করে।
